ছবি: আপন দেশ
২০১১ সালের ৬ জুলাইয়ের সেই সকালটি আজও আমার চোখে ভাসে। সেদিন সকালে বিরোধী দলের ডাকা হরতালের সমর্থনে আমরা সংসদ ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে একটি মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য সৈয়দা আশরাফি পাপিয়া, শাম্মী আক্তার, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজামসহ বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী।
আমি সবসময়ই বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধীদলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করার অধিকার থাকবে। কিন্তু সেদিন কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। পুলিশ আমাদের মিছিল আটকে দেয়। তাদের সাথে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এরপর কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই পুলিশ সদস্যরা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করে।
তৎকালীন পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ও সহকারী কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের নেতৃত্বে পুলিশ মুহূর্তের মধ্যে এমন এক নির্মম হামলা চালায়, যা আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলতে পারব না।
আমি তখন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য। কিন্তু সেদিন আমার পরিচয়, আমার সাংবিধানিক মর্যাদা—কোনোটিই আমাকে রক্ষা করতে পারেনি। আমাকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করা হয়। টেনে-হিঁচড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। আমার গেঞ্জি ছিঁড়ে যায়। মাথায় আঘাত লাগে। একসময় আমি খেয়াল করি, আমার মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে। সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারি না।
আমার মাথা থেকে রক্ত বের হতে দেখে নারী সংসদ সদস্যরা আমাকে নিয়ে ন্যাম ভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও রেহাই ছিল না। পুলিশ আবার ধাওয়া করে। আত্মরক্ষার জন্য আমি দৌড়ে ন্যাম ভবনের দিকে যাই। তারাও পিছু নেয়। সেখানেও হামলা চালানো হয়। আমাকে চ্যাংদোলা করে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। প্রচণ্ড আঘাতে আমি একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে চিকিৎসকেরা আমার মাথায় ১১টি সেলাই দেন।

সেদিন শুধু আমাকে আঘাত করা হয়নি, সেদিন বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আঘাত করা হয়েছিল। একজন সংসদ সদস্য, একজন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ যদি দিনের আলোয় সংসদ ভবনের সামনে এমন নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী ছিল— তা সহজেই অনুমান করা যায়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল, এই ঘটনার পরও কার্যকর কোনো আইনি প্রতিকার পাইনি। যে রাষ্ট্রের পুলিশই নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত, সেই রাষ্ট্রের কাছেই বিচার চাইতে হয়েছিল। বিচার আর পাওয়া হয়নি।
সেদিন আমি উপলব্ধি করেছিলাম, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত করছে, যেখানে আইন নয়, ক্ষমতাই শেষ কথা। পুলিশ জনগণের নিরাপত্তার বাহিনী থেকে ক্রমশ রাজনৈতিক দমন-পীড়নের যন্ত্রে রূপান্তরিত হচ্ছিল। বিরোধী মত, ভিন্ন কণ্ঠ, সমালোচনা—সবকিছুকে শক্তি প্রয়োগ করে দমিয়ে রাখার একটি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করেছিল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকার।
পরবর্তী বছরগুলো যেন সেই উপলব্ধিকেই সত্য প্রমাণ করেছে। একের পর এক বিরোধী দলের কর্মসূচিতে হামলা হয়েছে। অসংখ্য নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। গুম, নির্যাতন, হয়রানি, রাজনৈতিক মামলার অভিযোগ দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়াই তাদের শাসনের অন্যতম কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষের আস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আমার উপর ঘটে যাওয়া ২০১১ সালের সেই ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সেটি একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সূচনা। এরপর বছরের পর বছর ধরে যে দমন-পীড়নের ধারাবাহিকতা দেশ দেখেছে, তার বীজ আমি সেই দিনই প্রত্যক্ষ করেছিলাম। তবুও ইতিহাসের একটি নিজস্ব নিয়ম আছে।
কোনো রাষ্ট্রই অনন্তকাল মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করে রাখতে পারে না। অন্যায় যত দীর্ঘ হয়, প্রতিরোধও তত গভীর হয়। ভয় যত বাড়ে, একসময় মানুষ ভয়কে অতিক্রম করতেও শেখে। ২০২৪ সালের জুলাই সেই দীর্ঘ প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক পরিণতি হয়ে আসে।
২৪ এর জুলাইয়ে আমি নতুন প্রজন্মের সাহস দেখেছি। দেখেছি এমন সব তরুণকে, যারা নিজের ভবিষ্যতের চেয়েও বড় করে দেশের ভবিষ্যৎকে ভাবতে শিখেছে। দেখেছি মানুষ ভয়কে অস্বীকার করে রাজপথে নেমে এসেছে। অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে। অসংখ্য তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ। প্রতিটি মৃত্যুই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক একটি ভারী অধ্যায়।

আমি যখন ২০১১ সালের সেই রক্তাক্ত সকালটির কথা ভাবি, তখন মনে হয় ইতিহাস কখনো বিচ্ছিন্ন নয়। একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটি ঘটনা জড়িয়ে থাকে। সেদিন সংসদ ভবনের সামনে যে লাঠির আঘাত নেমে এসেছিল, তার প্রতিধ্বনি বহু বছর ধরে দেশের রাজপথে শোনা গেছে। একের পর এক আন্দোলনে আমাদের নেতাকর্মীরা বারবার এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, রাজপথে রক্তাক্ত হয়েছে তবুও তাদের প্রতিবাদ থামায়নি। আর সেই দীর্ঘ যাত্রার শেষ অধ্যায় রচিত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে, যখন মানুষ পরিবর্তনের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে আসে।
আজও আমার শরীরের সেই ক্ষতচিহ্ন আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়- গণতন্ত্রের মূল্য কত বড়, আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার কত ভয়াবহ হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম, কিন্তু আমার বিশ্বাস, এটি কেবল ব্যক্তি মানুষের গল্প নয়, এটি আমাদের সকলের সম্মিলিত সময়ের স্মৃতি।
সেদিন আমাদের ওপর হামলার পর আমার নেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশনেত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই হামলা স্বৈরাচার পতনের বীজ বপন করলো। তার সেই কথার সত্যতা আমরা ঠিকই দেখতে পেয়েছি। আমাদের নেত্রী অসম্ভব নির্যাতনের মধ্যেও গণতন্ত্রের এই লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন এবং স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশেই তিনি তার শেষদিনগুলো কাটাতে পেরেছেন।
ইতিহাসের বিচার শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই হয়। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের দিকে তাকাতে চাই- এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো নাগরিককে, কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে, কোনো সংসদ সদস্যকে তার মত প্রকাশের জন্য আর কখনো সেই ৬ জুলাইয়ের মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
লেখক: রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৬ বারের এমপি
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































