ছবি: আপন দেশ
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-বাপাউবোর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আসন ‘মহাপরিচালক’ (ডিজি) পদটি অবশেষে স্বৈরাচারী মাফিয়াতন্ত্রের এক প্রকাশ্য দোসর ও ক্যাশিয়ারের দখলে চলে গেছে। সততা, যোগ্যতা আর গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে পদদলিত করে পাঁচ কোটি টাকার এক অবিশ্বাস্য লবিং ও নিয়োগ চুক্তির মিশন শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্ণেল (অব.) জাহিদ ফারুকের প্রধান ‘ক্যাশ কালেক্টর’ হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিন রিপনই বসছেন পাউবোর সর্বোচ্চ চেয়ারে। আর এ নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক ঘটনাটি ঘটেছে খোদ বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর অনাকাঙ্ক্ষিত আশকারায়। সুপারিশ কমিটি তারই হুকুম তামিল করেছেন। গত ৩০ জুলাই জাতীয় সংসদ কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে অত্যন্ত গোপনে ও ঝড়ের গতিতে রুহুল আমিনের ফাইলে সই করানো হয়েছে। আগামী ৬ জুলাই থেকে এ নিয়োগ কার্যকর হবে। প্রতিরোধ ঠেকাতে নেয়া হয়েছে কৌশল। নিয়োগ আদেশে বলা হয়েছে, চলতি এ দায়িত্বের মেয়াদ ৬ মাস। তবে নির্ধারিত ৬মাস পরে পরবর্তী আদেশে চলতি শব্দটি বাতিল করার নজির অতীতের রয়েছে।
বুধবার (০১ জুলাই) সকালে মন্ত্রণালয়ের এ আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের খবর পাউবোর সদর দফতরে ছড়িয়ে পড়ার পর সৎ, দক্ষ এবং দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে স্বৈরাচারের জাঁতাকলে নিগৃহীত ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চরম বঞ্চনা আর গভীর অন্ধকার স্তব্ধতা নেমে এসেছে পাউবোতে। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও পাউবো যে এখনও স্বৈরাচারের খুনি ও লুটেরা চক্রের ‘এটিএম বুথ’ হিসেবেই রয়ে গেছে, এ নিয়োগ তারই অকাট্য প্রমাণ।
স্বৈরাচারের মিশন সাকসেস: যোগ্য প্রকৌশলীরা যেভাবে চিড়েচ্যাপ্টা
পাউবোর একাধিক নির্ভরযোগ্য ও সংক্ষুব্ধ সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর হাত ধরে নতুন করে পুনর্বাসিত হতে যাচ্ছেন ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যতম প্রধান অর্থ জোগানদাতা ও টেন্ডার মাফিয়া প্রকৌশলী রুহুল আমিন রিপন। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ও নিখুঁত ছক কষে এ মাফিয়া চক্রকে পুনর্বাসনের মেকানিজম তৈরি করা হয়েছে। রুহুল আমিনের মসনদ যেন শতভাগ নিষ্কণ্টক হয়, সেজন্য পাউবোর বর্তমান বিতর্কিত ডিজি প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহ নিজেই পর্দার আড়ালে এক কুৎসিত খেলায় মেতেছিলেন।
রুহুল আমিনের চেয়ে যোগ্য, জ্যেষ্ঠ এবং বিএনপি মতাদর্শে বিশ্বাসী সৎ প্রকৌশলীদের সম্পূর্ণ গায়ের জোরে এডিজি (অতিরিক্ত মহাপরিচালক) পদ থেকে ডিমোশন বা পদাবনতি দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ফ্যাসিষ্ট আমলের বহু পুরনো ও আইনগতভাবে মিমাংসিত হয়ে যাওয়া নানা ভুয়া ইস্যুকে নতুন করে সামনে এনে সৎ প্রকৌশলীদের ওপর প্রশাসনিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে। যোগ্যদের ডানা ছেঁটে, ডিমোশনের জাঁতাকলে পিষে রুহুল আমিনের ফাইল তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নিপীড়ন সহ্য করা সৎ কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন এবার হয়তো যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে, কিন্তু দিনশেষে স্বৈরাচারের মিশনেরই সাকসেস হলো আর দেশপ্রেমিক প্রকৌশলীরা বঞ্চিতই রয়ে গেলেন।
পানির নিচে ২৫০০ কোটির নিখুঁত ডাকাতি: রুহুল আমিনের দুর্নীতির প্রোফাইল
কেন রুহুল আমিনকে ডিজি বানানোর এ সিদ্ধান্ত পাউবোর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল এবং একটি চরম অপরাধমূলক পদক্ষেপ, তার খতিয়ান লুকিয়ে আছে এডিবি ও নেদারল্যান্ডস সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘ফেমিপ’ মেগা প্রকল্পে। ২৫০০ কোটি টাকার এ মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ছিলেন স্বয়ং রুহুল আমিন। নদী শাসনের কাজ যেহেতু পানির নিচে থাকে এবং তা বাইরে থেকে দেখার কোনো সুযোগ নেই, তাই এটিকে নিজের লুটপাটের প্রধান চারণভূমিতে পরিণত করেছিলেন তিনি। নকশা অনুযায়ী জিও-ব্যাগে নির্ধারিত ২৫০ কেজি বালু থাকার কথা থাকলেও ঠিকাদারদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে নামমাত্র বালু ও সাধারণ মাটির মিশিয়ে ব্যাগ ভরা হতো।
আরও পড়ুন<<>> শেখ রেহানার আফজাল এখন শেখ রবির রেলের ডিজি
পদ্মা ও যমুনা নদীতে প্রতিদিন বাস্তবে যেখানে ১০ হাজার ব্যাগ ফেলা হতো, সেখানে সাইট ইঞ্জিনিয়ারদের ম্যানেজ করে কাগজে-কলমে ও মেজারমেন্ট বুকে দেখানো হতো ২৫ হাজার ব্যাগ। দৈনিক এ অতিরিক্ত ১৫ হাজার ব্যাগের সম্পূর্ণ ভুয়া বিলের টাকা ঠিকাদার ও পিডি রুহুল আমিন সিন্ডিকেট সরাসরি সাবাড় করেছে। এছাড়া নদীর তীর প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি ৪ ইঞ্চি পুরুত্বের সিসি ব্লক বাস্তবে ৩ থেকে ৩.৫ ইঞ্চি করে তৈরি করে লাখ লাখ ব্লকের চুরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য তথ্যপ্রমাণ ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে।
ডিজাইন রিভিশন ফাঁদ: বৈদেশিক তহবিল বাতিলের শঙ্কা
রুহুল আমিনের দুর্নীতির আরেকটি বড় অস্ত্র ছিল 'ডিজাইন রিভিশন' বা কৃত্রিম কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে মাঝপথে প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করা। মাঠপর্যায়ে কাজ চলাকালীন হঠাৎ নকশা পরিবর্তন করে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পকে এক লাফে ১ হাজার কোটিতে উন্নীত করে শত শত কোটি টাকার ভুয়া বিল তুলে নেয়া হয়েছে। নয় বছরের দীর্ঘ ফ্রেমওয়ার্কের প্রথম ধাপে ইচ্ছাকৃতভাবে কাজের গতি ধীর রাখা হতো এবং একদম শেষ সময়ে এসে ‘জরুরি ভাঙন রোধ’-এর দোহাই দিয়ে ২য় ও ৩য় ধাপের কাজকে মাত্র দেড় থেকে দুই বছরের সংক্ষিপ্ত উইন্ডোতে নিয়ে আসা হতো।
উদ্দেশ্য ছিল একটাই- দাতা সংস্থা এডিবির বিশাল ফান্ড এককালীন ছাড় করিয়ে দ্রুত ভুয়া কাজের ভাউচার ও মেজারমেন্ট বুকে নিজে স্বাক্ষর দিয়ে বিল আউট করা। কাজের মান ও অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে দাতা সংস্থা এডিবির অডিট টিমের গুরুতর আপত্তিগুলো তিনি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া কারিগরি জবাবের মাধ্যমে ধামাচাপা দেন। এমন একজন বিতর্কিত দুর্নীতিবাজকে ডিজি পদে বসানোর এ ভুল সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুরোপুরি ধূলিসাৎ করবে । ভবিষ্যতে পাউবোতে সমস্ত বৈদেশিক অনুদান ও ঋণ প্রাপ্তি বন্ধ করে দিতে পারে।
প্রতিমন্ত্রীর ‘ক্যাশ কালেক্টর’ ও টেন্ডার মাফিয়া
লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা সেন্ট্রাল জোনের প্রধান প্রকৌশলী থাকাকালীন রুহুল আমিন নিজেকে আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক হিসেবে জাহির করতেন। তিনি সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং সাবেক সিনিয়র সচিব নাজমুল হাসানের সঙ্গে মিলে পাউবোতে একটি ‘লুটপাট ট্রায়ো’ বা ত্রিমুখী মাফিয়া সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ পাইয়ে দিতে তিনি টেন্ডার সিন্ডিকেট এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং অর্জিত ঘুষের টাকার সিংহভাগ প্রতিমন্ত্রীর ফান্ডে নিয়মিত পৌঁছে দিতেন।
আরও পড়ুন<<>> ১৩ হাজার কোটি টাকা চুরি করেও রেলে আফজালের ডিজিগিরি!
পাউবোর কোনো কর্মকর্তা রুহুল আমিনের নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে তাকে ‘বিএনপি-জামায়াত’ ট্যাগ দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি বা নানাভাবে হেনস্তা করা হতো। মূলত স্বৈরসরকারের নির্বাচনী ফান্ড জোগাতে তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এটিএম বুথের মতো ব্যবহার করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এ তরী পার হতে তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের ওপর ভর করেছিলেন। অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে ওই মিশনও সফল হয়েছেন।
নিয়োগ বাতিলসহ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি
নদী ভাঙন কবলিত অসহায় মানুষের টেকসই বাঁধের টাকা নদীগর্ভে ভুয়া মালামাল দেখানোর মাধ্যমে লোপাটকারী এ সিন্ডিকেট প্রধান যদি টাকার বিনিময়ে এবং বর্তমান পানিমন্ত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত আনুকূল্যে শেষ পর্যন্ত মহাপরিচালক (ডিজি) পদে বসেন, তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও নৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের হাজার হাজার কোটি টাকা সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে। পাউবোর উচ্চপদের দুই কর্মকর্তা তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতিমন্ত্রীর কালেক্টর রুহুল আমিন কোনোভাবেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজি পদের যোগ্য নন। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে যারা নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের অবদমিত রেখে এ দুর্নীতিবাজকে পুনর্বাসন করা হলে পাউবোর অস্তিত্ব বলতে আর কিছু থাকবে না। দেশ ও জনগণের স্বার্থে এ ভুল সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত।

নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এ বিষয়ে বলেন, নাদী শাসনে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের সুযোগ রয়েছে। কারণ পানির নিচে প্রকল্প। এ কারণে সৎ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাকে এ গুরু দায়িত্ব দেয়া উচিৎ। এতে সততার প্রতিযোগিতা বাড়ে। আর তার ব্যত্যয় ঘটলে ফলও বিপরীত হয়। অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকর্তাকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিযুক্ত করল সেটা তারাই ভালো জানেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী রুহুল আমিনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে (০১৭১১*****৭২০) একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। অফিসের নম্বরে দেড় ঘণ্টা পরপর চার দফায় যোগাযোগ করা হলে ওপার থেকে জানানো হয়, ‘স্যার ব্যস্ত আছেন, পরে কল দিন।’
অন্যদিকে, লবিং ও যোগ্যদের ডিমোশন দেয়ার নেপথ্য কারিগর বর্তমান ডিজি প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহ বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পড়েছে রুহুল আমিনের দীর্ঘদিনের দুর্নীতির ফাইল। এ মাফিয়া চক্রের পরবর্তী কীর্তি ও থলের বিড়াল নিয়ে আসছে আগামী পর্ব...
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































