ছবি: এআই জেনারেট
শিরোনামের এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নানামুনির নানা মত থাকতে পারে, কিন্তু এটা মানতে হবে যে বাকশাল কায়েম করে শেখ মুজিব দেশে যে শাসন চালু করেছিলেন, সেই শ্বাসরুদ্ধকর শাসন থেকে গণতন্ত্রকে উন্মুক্ত করেন জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জিয়া, পরবর্তীকালে জেনারেল জিয়ার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা এলে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচিমুখ খুলে দেন। তাই তাকে গণতন্ত্রের প্রথম মুক্তিদাতা বলেছি। ১৯ জানুয়ারি,২০২৬ , তাঁর ৯০ তম জন্মদিন। তাকে জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই জাতির পক্ষ থেকে।তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
দ্বিতীয়বার গণতন্ত্র মুক্তির আলোয় নিয়ে আসেন নির্বাচিত সরকারের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত গণতন্ত্রক ধারাকে সংসদীয় শাসিত গণতন্ত্রে পুনর্বাসিত করেন।
শেখ হাসিনার ১৬ বছরের ফ্যাসিজমের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছে জনগণ। সেই কাতারে ১৬ বছরের রাজনৈতিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলনের সিংহাসনে ছিলো বিএনপি। তাদেরই হাত ধরে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিতাড়িত হন শেখ হাসিনা। হাসিনা-উত্তর বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্খা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে যেন সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্র মুক্তি পায়। প্রতিষ্ঠা পায় জনগণের কাঙ্খিত গণতন্ত্র। আগামি ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ (পড়ুন তেরোতম) জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেই নির্বাচনে বিএনপি যেন ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধানের নাজুক অন্যায়গুলো গণতন্ত্রের শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে, সেই রকম সংস্কার করে। আমরা চাই গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হোক।
তারেক রহমানের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি আমরা পড়েছি। সেখানে গণতান্ত্রিক সরকারের মিডিয়া সম্পর্কে তেমন কোনো কথা না থাকলেও, বোঝা যায় তিনি ধারণ করেছেন শহীদ জিয়ার ১৯, খালেদা জিয়ার ২৭ এবং তাঁর ৩১ দফা মিলেমিশে একটি গণমনন চেতনার রূপরেখা অর্জিত হয়েছে। অর্থাৎ জিয়ার মননজাত ও কর্মজাত ধারাই ধারণ করছেন তারেক রহমান। একই বলে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। এই ট্রাডিশনের বহন করে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হবে উত্তরাধিকার তৈরি করতে হয়। আমি বলতে চাই গণতন্ত্র রক্ষা ও অব্যাহত রাখতে হলে রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সৈনিক সৃষ্টি খুবই জরুরি।
২.
একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে সপরিবারে শেখ মুজিবকে হত্যা করে জিয়া ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু ইতিহাস তথ্য ও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি মুজিব হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং সামরিক আইনও জারি করেননি। তিনি শেখ মুজিবের হত্যাকারী নন। জাতিকে এই সত্য জানতে হবে, বুঝতে হবে। তিনি রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তিত পরিস্থিতির হাত ধরে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
একজন সামরিক নেতার হাতেই কাঙ্খিত গণতন্ত্রের বন্ধ দরোজা উন্মুক্ত হয়েছিলো। একজন সামরিক নেতার মনেও যে ন্যায় ও কল্যাণের রুপরেখা গণতন্ত্রের বীজ উপ্ত ছিলো, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? না, দেখি না। কারণ, সামরিক নেতা সম্পর্কে একটি বিধিবদ্ধ ধারণা আমরা পোষণ করি, যা অর্ধসত্য। তারাও যে আমাদের সমাজেরই অংশ, আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভাই-বন্ধু এটা ভুলে যাই।
কি করে দেশের আপামর জনগণের মন জয় করেছিলেন শহীদ জিয়া সেটা জানা জরুরি। কেন না, সামরিক বাহিনীর মনে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের রূপ ও রূপায়ন ক্ষুদিত ছিলো না। না, তিনি আপামর জনগণের মন জয় করেননি, জয় করেছিলেন দেশের উৎপাদক শ্রেণির মন। কি ভাবে তা আমরা জানি। তিনি ক্ষমতায় সিংহাসনে বসে থাকেননি। ছুটে গেছের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের অগণন মানুষের কাছে,--- তাদের দুঃখ-দুদর্শার কথা জানতে, বুঝতে, শিখতে। তাদের সমস্যা আর সম্ভাবনার বিষয়গুলো সম্যক উপলব্ধি করতে। সেখানেই তিনি লাভবান হয়েছিলেন লোকজ্ঞান অর্জন করে। জনগণের মন-পাঠ করে তিনি বুঝেছিলেন কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে আমাদের। সেই জ্ঞানই ছিলো তার গণতন্ত্রের প্রতি একচ্ছত্র ভালোবাসার নৈতিক সাহস ও বল। এভাবেই তিনি লাভ করেছিলেন উৎপাদক মানুষের ভালোবাসা।
এই ভালোবাসাই তাকে মানুষের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আরও পড়ুন<> শায়রুল কবির খানের লেখা<> জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী দর্শন
তিনি যে চাষাবাদ ও চাষীদের জন্য ভরা বর্ষার নদীর পানি ধরে রেখে তা শুকনো মওসুমে সেচের ব্যবস্থা আইডিয়া দিয়েছিলেন তা আগে কেউ ভাবেননি। শুকনো মওসুমে খাল খনন করে , খরাকে না বলেছিলেন, তাই আজ আমাদের ফসল উৎপাদনের নতুন প্রগতির সৃষ্টি করেছে। কৃষকের ধারণাকে পাল্টে দিয়েছিলেন তিনি এই বলে যে, তোমার বাড়ির আশ-পাশের বা সামনের খাল খনন করো, বিল-ঝিল খনন করে পানি ধরে রাখো। পানির ফসল মাছ আর জমির ফসল ধানের উৎপাদন বাড়াও। আপৎকালে তাই কাজে দেবে।
আর কৃষকের ছেলেমেয়েদের জন্য সৃষ্টি করেছিলেন বিদ্যালয় ও যাতায়াতের পথ, হালট ও পাকা সড়ক। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে শিশুদের বর্ণ পরিচয় শেখাতেন । যে সব গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো না, সে সব গ্রামের বালক-বালিকারা পেলো স্কুল, খেলার মাঠ আর নবজীবনের কল্লোল শুনতে পেলো তারা। পাঠ্যপুস্তকে তো তাঁর দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণার কোনো বয়ান ছিলো না। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি ছিলো গ্রামে-গঞ্জের স্কুলের ভেতরে, শিক্ষার্থীদের অন্তরে, অন্তরে। কারণ তারা দেখেছে সচক্ষে এই কাজ করেছেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। তিনি চোখের আড়াল হয়েছিলেন ঘাতকের হাতে নিহত হয়ে, কিন্তু মানুষের মন থেকে আড়াল করতে পারেননি তাঁকে কেউ।
প্রতিবছরই তাঁর জন্মদিনে ও মৃত্যুদিনে তাঁকে নিয়ে মানুষ কথা বলে।
কেন বলে?
কারণ তিনি কিছু কাজ করে গেছেন যার দরুণ তাঁকে নিয়ে আমরা আলোচনা করি, করতে বাধ্য হই। গর্বিত হই। এই বাধ্য ওগর্তি হওয়ার পেছনে আছে আরো কিছু কারণ।
তিনি আমাদের আত্মপরিচয়কে এমন এক দৃঢ় ও আত্মমর্য়াদাপূর্ণ ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন, যা প্রকৃত সত্যকে উদ্ভাসিত করে। আমাদের নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় বাঙালি বলে বহুকাল থেকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে আরো বহু নৃ-গোষ্ঠী এই বাংলাদেশে বাস করছে। তারা তো জাতিগত পরিচয়ে বাঙালি নয়, তারা চাকমা, মারমা, হাজং বম, কুকি, ত্রিপুরা, তৈচঞ্জঙা, , সাঁওতাল , মুরমু, গারো নামের মানবগোষ্ঠী। আমরা যদি বাঙ থেকে বাঙালি হই তাহলে তারা কী বাঙালি পরিচয় দিতে পারবে? দিলেও তা কেন দেবে?তারা তো গারো কুকি, মারমা, হাজং বা ত্রিপুরা,,গারো, চাকমা ইত্যাদি নৃগোষ্ঠীর মানুষ। এই বিচিত্র মানবগোষ্ঠীকে আমরা যতই ক্ষুদ্র বলে চিহ্নিত করি না কেন, তাদেরই আত্মপরিচয়কে উঁচুতে নিয়ে আসাটাই দেশের রাষ্ট্রনায়কের কাজ। সেই পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ জিয়া আমাদের সমগ্র মানবগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে চিহ্নিত করলেন বাংলাদেশি বলে।
ভাষাগত পরিচয় সাধারণত হয় না। যেমন ইংরেজি মাতৃভাষা বলে ইংল্যান্ডের লোকেরা ইরেজ। এক ব্রিটেনেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন জাতিগত পরিচয়। ইংলিশ, স্কটিশ, আইরিশ ও ওয়েলস---এরা সবাই আত্মপরিচয়ে জাতিতে ব্রিটিশ। আমেরিকান, অস্টেলিয়ান, নিউজিল্যান্ডবাসীর মাতৃভাষাও ইংরেজি। কিন্তু জাতিসত্তাগত ভাবে তারা দেশের নামে পরিচয় সমৃদ্ধ করেছে। আলজেরিয়ার মানুষের ভাষা ফরাসি, কিন্তু তারা জাতি পরিচয়ে আলজেরিয়ান। গোটা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষিক হলেও, তারা জাতিগত পরিচয়ে নিজ নিজ দেশের গন্ডিতে বা সীমান্তের রূপরেখা নিয়ে পরিচিত।তাদেরকে বহির্বিশ্বের মানুষেরা ইস্প্যানিওল বা হিস্প্যানিক হিসেবে চেনে।
আমরা বাঙালি নই পুরোপুরি, আমরা বাংলাদেশি আত্ম পরিচয়ে। এই আত্মপরিচয়ের পতাকা তুলে দিয়েছেন উঁচুতে, আকাশে শহীদ জিয়াউর রহমান। তিনি চলে গেছেন এই সত্যের পরও কিন্তু জাতিগত সত্তার যে বিনির্মাণ রয়ে গেছে আমাদের স্বাধীনতার পতাকার মতোই পতপত করে উড়ছে------- আমরা বাংলাদেশি।
আরো বহু পরিচয়ে তাঁকে তুলে ধরা যায়, এই ক্ষুদ্র পরিসরে তা না দিলেও ক্ষতি নেই। কারণ আমরা বহন করছি সমগ্র সত্ত্বায় শহীদ জিয়াকে। আজকে তাঁর ৯০তম জন্মদিনে তাঁকে জানাই আমাদের স্যালুট, টুপি খোলা লাল সালাম।
পাদটীকা
শহীদ জিয়ার কয়েকটি চিন্তার ফসল উল্লেখ করতে চাই।
ক. তিনি সেক্যুলার ছিলেন না। তাঁর চিন্তায় ছিলো ধর্ম অবশ্যই রাজনীতিতে থাকবে।
তিনি লিখেছেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে। সেই লেখায় উল্লেখ করেছেন “আমাদের দর্শনের মধ্যে ধর্মীয় দর্শনও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। খালি ইহজগতের কথা ভাবলেই চলবে না---- পরলোকের কথাও ভাবতে হবে। সুতারাং আমরা মানুষকে যে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন দিতে চাচ্ছি তাতে তিন ধরনের খোরাক আছে। যেমন:
১. ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্যে, অন্নের সংস্থানের জন্যে উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান।
২.স্বাবলম্বী জীবন যাপনের জন্যে অনুপ্রেরণা
৩.পারলৌকিক জীবনের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে আত্মার শান্তি অর্জনের প্রচেষ্টা।
তিনি চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে বিপ্লব সাধন হোক।
১. জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করা
২. কৃষি সংস্কার
৩.শিক্ষা সংস্কার
৪.পরিবার পরিকল্পনা
৫.শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুতায়ন
৬. সমাজ সংস্কার
৭.প্রশাসনিক সংস্কার
৮.ধর্ম
৯. আইন সংস্কার
১০. শ্রম আইন সংস্কার
১১.নারীপুরুষ নির্বিশেষে জনশক্তি উন্নয়ন
১২. খনিজ তথা সকল প্রাকৃতিক সম্পদ আহর১৩.সংস্কৃতির বিকাশ সাধন
এগুলি হলো আমাদের বৈপলবিক কর্মসূচির মূল বিষয়। কোন স্বপ্নের কোন লক্ষ্যের জন্যে এ-বিপ্লব---- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মানুষের এই পাঁচটি মেওলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে শোষণমুক্ত সমাজ-ব্যবস্থা কায়েমই হলো আমাদের স্বপ্ন,--- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মৌল লক্ষ্য।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক শিক্ষক ছিলেন শহীদ জিয়া। তারেক রহমানের এক লেখায় সেই সত্যই উঠে এসেছে। লেখার শিরোনাম ‘আমার শিক্ষক’। কিভাবে তিনি ছাত্রত্ব গ্রহণ করেছেন, তারেকের এই লেখা পড়লেই তা জানা যাবে।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































