ছবি : আপন দেশ
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই একটু আলাদা। শুধু অ্যাকাডেমিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্কের জন্যও। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ধীরে ধীরে কংক্রিটের শহরে পরিণত হয়েছে, সেখানে জাহাঙ্গীরনগর এখনো বহু মানুষের কাছে ‘সবুজের বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবেই পরিচিত। এ পরিচয় কোনো প্রচারণার ফল নয়; এটি তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক অনন্য ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে। বিশাল জলাশয়, ছায়াঘেরা বৃক্ষরাজি, পাখির অভয়ারণ্য, মুক্ত বাতাস, বিস্তৃত সবুজ মাঠ-সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর যেন বাংলাদেশের ভেতরেই এক ছোট্ট পরিবেশ রাষ্ট্র।
আজকের পৃথিবীতে যখন উন্নয়ন আর পরিবেশকে প্রায়ই মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে মানুষ কি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই উন্নয়ন করতে পারে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে জাহাঙ্গীরনগরকে নতুন করে ভাবতে হয়।
জাহাঙ্গীরনগর শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানুষ, প্রাণী, পাখি, বৃক্ষ এবং জলাশয় মিলিয়ে গড়ে ওঠা এক পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। এ উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকৃতিকে আলাদা করে দেখা হয়, যেন প্রকৃতি উন্নয়নের প্রতিপক্ষ। অথচ জাহাঙ্গীরনগরের বাস্তবতা দেখায়, প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েও একটি প্রাণবন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
যদিও অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মিত ইমারতগুলো এ ছন্দে অনাকাঙ্খিত পতন ঘটিয়েছে। ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর শুরু হওয়া এ প্রকল্পের উদ্যোগী মন্ত্রণালয় হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়নে ছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। তৎকালীন দায়িত্বশীলগণ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন/বাস্তবায়ন না করে তড়িগড়ি করে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছেন। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ দৈনিক কাগজগুলোতে ছাপাতে আমরা সকলেই দেখেছি।
এ হতাশার মধ্যে আশার কথা হলো, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অব্যবস্থাপনা ও অপচয় রোধ কল্পে সাধ্যমত অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। বিশেষ করে মাস্টার প্ল্যানের দীর্ঘ দিনের দাবী পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আনন্দের সংবাদ হলো সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেছে (অর্থাৎ মাস্টার প্ল্যান সবুজ পাতায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে)। এ অর্জনের ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিরতিহীন দাবীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আবার প্রসঙ্গে ফেরা যাক।
জাহাঙ্গীরনগরের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যের জলাশয়গুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলো শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্যের অংশ নয়; এগুলো পুরো ক্যাম্পাসের প্রাণপ্রবাহ। শীত এলেই হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এসে ভিড় করে এ জলাভূমিতে। দূরদেশ থেকে উড়ে আসা পাখিদের জন্য জাহাঙ্গীরনগর যেন নিরাপদ আশ্রয়। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ শুধু এ পাখি দেখার জন্য ক্যাম্পাসে আসেন। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি শুধুই বিনোদনের বিষয় নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের আবেগিক সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সুযোগ।
বাংলাদেশে নগরায়নের চাপে যখন একের পর এক জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে, তখন জাহাঙ্গীরনগরের এ লেকগুলো পরিবেশগতভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ জলাশয় শুধু পানি ধারণ করে না; এটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাস তৈরি করে এবং পুরো এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখে। জাহাঙ্গীরনগরের ক্যাম্পাসে হাঁটলে এ সত্য আরও স্পষ্ট হয়। ঢাকার দূষিত, ক্লান্ত, কংক্রিটঘেরা পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এখানে এলে মানুষ যেন অন্য এক পৃথিবীর স্বাদ পায়।
ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, এখানকার শিক্ষার্থীরা পরিবেশ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। দেশের খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা যায় শিক্ষার্থীরা গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, জলাশয় রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করছে কিংবা মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছে। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা বারবার প্রমাণ করেছে, পরিবেশ শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। এ চেতনা জাহাঙ্গীরনগরের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে এখানে শিক্ষার্থীরা বহুবার প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় উন্নয়নের নামে গাছ কাটা হয়েছে, পরিকল্পনাহীন ভবন নির্মাণ হয়েছে, জলাশয়ের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রতিবাদ করেছে। এ প্রতিবাদ কেবল আবেগের নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ক্যাম্পাস রক্ষার লড়াই।
বর্তমান প্রশাসন পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করে। বিশেষ করে নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন জাহাঙ্গীরনগরের পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছিল। কোথাও প্রয়োজন ছাড়া ভবন নির্মাণ হয়েছে, কোথাও শ্রেণিকক্ষ সংকট থাকা সত্ত্বেও অব্যবহৃত স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে। এসব অনিয়মের সমালোচনা আমি নিজেই করেছি। এটি ইতিবাচক, কারণ সমস্যা স্বীকার না করলে সমাধানের পথও তৈরি হয় না।
নতুন মাস্টারপ্ল্যানে পরিবেশ ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য আনার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন হতে চলেছে। দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও এটি মডেল হতে পারে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। নতুন বিভাগ হবে, আবাসন বাড়বে, গবেষণাগার তৈরি হবে, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে উঠবে-এসব ছাড়া আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভব নয়। কিন্তু উন্নয়ন যদি জলাশয় ধ্বংস করে, গাছ কেটে ফেলে, পাখির আবাস নষ্ট করে, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলেছে, সেটি হলো “ক্যারিং ক্যাপাসিটি’’ বা পরিবেশের ধারণক্ষমতা। প্রকৃতি একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত দূষণ বা চাপ সহ্য করতে পারে। সে সীমা অতিক্রম করলেই পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরনগরের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন হলের স্যুয়ারেজ লাইন সরাসরি লেকে গিয়ে পড়ার অভিযোগ উদ্বেগজনক। তবে ইতিবাচক দিক হলো, প্রশাসন বিষয়টি অস্বীকার না করে সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। মাষ্টার প্লান পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে এটি অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লেক পরিষ্কার করার সময়ও এমনভাবে কাজ করতে হয় যেন পাখির খাদ্যব্যবস্থা নষ্ট না হয়। অর্থাৎ জাহাঙ্গীরনগরের জলাশয় শুধুমাত্র পানি নয়; এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। শাপলা, ডাকউইড, ছোট মাছ, জলজ উদ্ভিদ-সব মিলিয়েই এ পরিবেশ পূর্ণতা পায়। এটি নিছক পরিচ্ছন্নতার প্রকল্প নয়; বরং একটি ইকোসিস্টেম সংরক্ষণের কাজ।
বাংলাদেশে পরিবেশ নিয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা প্রকৃতিকে প্রায়ই অলংকার হিসেবে দেখি, সম্পদ হিসেবে নয়। শহরের মানুষ পার্কে গিয়ে ছবি তোলে, কিন্তু গাছ কাটার বিরুদ্ধে কথা বলে না। নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করে, কিন্তু নদী দখলের বিরুদ্ধে নীরব থাকে। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা এ জায়গাটিতে ব্যতিক্রম। তারা বুঝতে পেরেছে, প্রকৃতি হারিয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মাও হারিয়ে যাবে।
জাহাঙ্গীরনগরের পরিবেশ শুধু নান্দনিক নয়; এটি মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়ছে। গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, প্রকৃতির সংস্পর্শ মানুষের মানসিক প্রশান্তি বাড়ায়। জাহাঙ্গীরনগরের মতো সবুজ ক্যাম্পাস তাই শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের মানসিক আশ্রয়ও। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেয়ার জায়গা নয়; এটি মানুষ গড়ে তোলার জায়গা। সেই মানুষ গঠনের ক্ষেত্রে পরিবেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গবেষকদের পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ জাহাঙ্গীরনগরকে ঘিরে পরিবেশ গবেষণার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে জলাভূমি সংরক্ষণ, নগর জীববৈচিত্র্য, জলদূষণ, পরিযায়ী পাখি, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো-এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি এ গবেষণাগুলোকে নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে জাহাঙ্গীরনগর শুধু একটি ক্যাম্পাস হিসেবেই নয়, পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জাতীয় মডেল হিসেবেও পরিচিত হতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর আমাদের শেখায়-প্রকৃতি ও শিক্ষা একে-অপরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলেই শিক্ষা আরও মানবিক ও পরিপূর্ণ হয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন সেখানে শুধু প্রযুক্তি বা অবকাঠামো নয়, মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কও গুরুত্ব পায়।
ক্যাম্পাস পরিবেশের প্রতি অংশীজনদের এ অঙ্গীকার এক নৈতিক বাধ্যবাধকতার উপলব্দিতে গাঁথা। পরিবেশ নীতিবিদের একাংশের মতবাদের সাথে তাদের এ উপলব্ধি অনুবর্তী। এ নীতিবিদগণ বলেন, ‘স্বতঃমূল্য’ কর্তব্য নির্দেশ করে। প্রাণী জগত ও প্রাণহীন জড় জগতের স্বতঃমূল্য রয়েছে। তাই মানুষের প্রতি স্বতঃমূল্যের কারনে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। একইভাবে মানুষের বাইরে যা কিছু আছে সেগুলোর প্রতিও স্বতঃমূল্যের কারনে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। এ বিবেচনায় জাহাঙ্গীনগরের অংশীজনগণ পরিবেশ সচেতন এক নৈতিকভাবে আলোচিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন।
আজকের বাংলাদেশে জাহাঙ্গীরনগরের মতো ক্যাম্পাস শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক পরিবেশগত আশা। তাই এ সবুজ ভূখ-কে রক্ষা করা মানে শুধু কিছু গাছ বা লেক রক্ষা করা নয়; বরং বাংলাদেশের মানবিক ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তাই কেবল জ্ঞানের কেন্দ্র নয়, এটি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক জীবন্ত পাঠশালা। এ পাঠশালার সবুজ যেন টিকে থাকে-এটাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
লেখক : উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আপন দেশ/এনএম
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































