ছবি: এআই জেনারেট
একটি জাতির মূল পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার ভাষায়। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার যে রূপ দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক মতদ্বৈততা কিংবা সামাজিক বিতর্কের নামে যে নোংরা শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা মেনে নেয়া যায় না। বিশেষ করে সমাজের উচ্চ শিক্ষিত ও সুশীল সমাজের মুখ থেকে যখন এসব ভাষা বের হয়, তখন সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে।
সাধারণত আমরা মনে করি, ভাষার বিকৃতি বা অশালীন শব্দ কেবল প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা ব্যবহার করে। অনেকে একে 'বস্তিবাসী'র ভাষা বলে অবহেলা করতেন। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত, সমাজ সংস্কারক ও সাংস্কৃতিক আইডলরাই আজ চরম নোংরা ভাষা ব্যবহার করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের লিখনীর মাধ্যমে এখন উঠে এসেছে ঘৃণা, যৌন ইঙ্গিত ও অপমানের কুৎসিত অভিধান। এ অধঃপতন কেবল ভাষার নয়, এটি আসলে আমাদের সামগ্রিক নৈতিকতার অবক্ষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ যুগে ভাষার কোনো সীমান্ত নেই। একজন লেখক বা শিল্পী যখন একটি অশালীন শব্দ উচ্চারণ করেন, তা মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে সম্প্রতি কিছু বিশিষ্ট মানুষের বক্তব্য আমাদের গভীরভাবে হতাশ করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক যখন একজন প্রাক্তনপ্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দেন, তখন শিক্ষকের মর্যাদা আর কোথায় থাকে? একইভাবে, জনপ্রিয় সংস্কৃতি কর্মী মেহের আফরোজ শাওনের মতো ব্যক্তিত্ব যখন একটি গণআন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিব্রতকর শব্দ ব্যবহার করেন, তখন নতুন প্রজন্ম কী শিখবে?
বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ভাষার এক চূড়ান্ত অন্ধকার রূপ সামনে এসেছে। ওই ঐতিহাসিক সময়ে একপক্ষ অন্যপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘শাউ..’, ‘মাউ..’, ‘চু..লিং’, কিংবা ‘পং’ এর মতো চরম অবমাননাকর ও সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিতবাহী শব্দগুলো যত্রতত্র ব্যবহার করেছে। আবার এ গণঅভ্যুত্থানের বিপরীত পক্ষে যারা অবস্থান করছেন, তারা পাল্টাপাল্টি ট্রোল হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে ‘জুলাই #CDI’ এর মতো কুরুচিপূর্ণ হ্যাশট্যাগ ও শব্দবন্ধ। যে শব্দগুলো একসময় কেবল নিষিদ্ধপল্লির অন্ধকার গলিতে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ তা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে শোভা পাচ্ছে ফেসবুকের টাইমলাইনে, ইউটিউবারদের কনটেন্টে কিংবা টকশোর টেবিলে। দুঃখের বিষয় হলো, নারী বা পুরুষ কোনো পক্ষই আজ এ অশ্রাব্য শব্দগুলো ব্যবহারে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করছেন না।
মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার ‘সোশ্যাল লার্নিং থিওরি’ স্পষ্ট করে বলে যে, শিশুরা বড়দের আচরণ দেখে শেখে। অনুজরা সবসময় অগ্রজদের অনুসরণ করে। আমাদের আইডল বা রোল মডেলরাই যদি জনপরিসরে ধর্ষণ, নারীর শরীর কিংবা যৌন সহিংসতাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেন, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এ ভাষাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেবে। অগ্রজদের এ মানসিক অধঃপতন অনুজদের সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তারা ভাবছে, লাইক আর শেয়ার পাওয়াই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। ফলে শালীনতার চেয়ে সস্তা বিতর্কই এখন জনপ্রিয়তার সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো নোংরা পোস্ট বা কুরুচিপূর্ণ ভিডিও দিলেই তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে লাইক-কমেন্টের বন্যা। পক্ষে-বিপক্ষের এ তুমুল লড়াইয়ে পোস্টটি দ্রুত ভাইরাল হচ্ছে। এ কুৎসিত প্রতিযোগিতায় একশ্রেণীর ভিউ ব্যবসায়ী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পকেটে হয়তো লাখ লাখ টাকা ঢুকছে, কিন্তু তারা ভেবে দেখছেন না এর বিনিময়ে সমাজ কত বড় মূল্য দিচ্ছে। এ ভিউ ব্যবসায়ীদের নিজেদের সন্তানরাই আজ অবলীলায় ঘরে-বাইরে সে অশ্রাব্য ভাষা ও বিকৃত শব্দগুলো শিখছে। যার জেরে পুরো সমাজ ব্যবস্থা দ্রুত এক অতল অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নোংরা ভাষার এ মহামারী আজ যেকোনো মাদকের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাদক একটি নির্দিষ্ট মানুষের শরীর ও পরিবার ধ্বংস করে, কিন্তু এ ‘ভাষা-সন্ত্রাস’ লাখ লাখ কিশোর-কিশোরীর মগজে ঢুকে পুরো একটি প্রজন্মের রুচিবোধ ও নৈতিক মেরুদণ্ডকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
‘শব্দকে খুব সাবধানে ব্যবহার করা উচিত। কারণ এটি মানুষের মানসিকতা এবং সংস্কৃতিকে প্রকাশ করে। তুমি যদি কারও মর্যাদা হরণ করে কথা বলো, তবে তুমি নিজেই নিজের মর্যাদা হারিয়েছ।’- মহাত্মা গান্ধী
বিশ্বের মহান নেতারা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে চরম প্রতিপক্ষের সঙ্গেও মার্জিত ভাষায় বিতর্ক করা যায়। নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা মহাত্মা গান্ধী আজীবন অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, কিন্তু তারা কখনও ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেননি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তিনি তার লেখায় বিদ্রোহ এনেছেন, কিন্তু কখনও অশ্লীলতাকে প্রতিবাদের হাতিয়ার বানাননি। অথচ আজ আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা তুচ্ছ রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে সব সীমা লঙ্ঘন করছেন।
গণতন্ত্র বা বাক স্বাধীনতা মানে এ নয় যে, নিজের মনে যা আসলো বা যা চাইল তা-ই মুখে বলে দিলাম কিংবা কিবোর্ডে লিখে দিলাম। স্বাধীনতার সঙ্গে সবসময় একটি অলিখিত দায়িত্ববোধ ও নাগরিক দায়বদ্ধতা জড়িয়ে থাকে। আমরা যখন জনপরিসরে একটি বিষাক্ত শব্দ ছুঁড়ে দিই, তখন সে শব্দের নেতিবাচক দিক এবং সামাজিক ভাঙনের চূড়ান্ত ভার কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ দেশ ও রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। সমাজকে এ মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করতে এবং তরুণ প্রজন্মকে এ মানসিক বিকৃতি থেকে মুক্ত করতে আজ সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও এক বিশাল প্রতিরোধমূলক দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই আইনি কাঠামো ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ডিজিটাল মাধ্যমে সুস্থ ভাষার চর্চাকে নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক মতভেদ প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশেই থাকে। এটি সুস্থ রাজনীতির একটি স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সে মতভেদ প্রকাশের ভাষা কেন যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা নারীবিদ্বেষী উপমায় পূর্ণ হবে? বাংলাদেশের ইতিহাস হলো ত্যাগের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন পর্যন্ত, প্রতিটি সংগ্রামে এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিস কিংবা শিশু রিয়া গোপের পরিবারের কান্না কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ নয়। এ ব্যক্তিগত শোক এবং আজন্ম বেদনাকে কোনো অশালীন বা উচ্চারণ অযোগ্য শব্দে বন্দি করা যায় না। যারা এ আন্দোলন নিয়ে কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করছেন, তারা আসলে লাখ লাখ মানুষের রক্ত ও ত্যাগকে অপমান করছেন।
একটি জাতির সভ্যতা কেবল তার অর্থনৈতিক জিডিপি, বড় বড় প্রযুক্তি বা আকাশচুম্বী ভবনের দ্বারা পরিমাপ করা যায় না। মানুষের মুখের ভাষা ও ব্যবহারের মাধ্যমেই একটি দেশের প্রকৃত সভ্যতা প্রতিফলিত হয়। সমাজবিজ্ঞানের এ মৌলিক সত্যটি আজ আমাদের সুশীল সমাজ ভুলে গেছে। আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ খাটো হচ্ছে কেবল আমাদের এ কুরুচিপূর্ণ আচরণের কারণে। কারণ উচ্চ শিক্ষিতরা শুধু নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করেন না, তারা তাদের পরিবার, সমাজ এবং পুরো দেশের পরিচয় বহন করেন। তাদের অধঃপতন মানে পুরো দেশের আন্তর্জাতিক পরাজয়।
‘কোনো জাতির সভ্যতা ধ্বংস করার জন্য কোনো অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। কেবল তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে দূষিত করে দিলেই তারা এমনিতেই ধ্বংস হয়ে যাবে।’- নোয়াম চমস্কি
আমরা এ ভয়াবহ ধারাটির পরিবর্তন চাই। উচ্চ শিক্ষিত ও সুশীলদের এ নৈতিক অধঃপতনকে আমরা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ মুছে দিতে চাই। এটি করার জন্য আমাদের সবাইকে আজই ঐক্যবদ্ধভাবে আওয়াজ তুলতে হবে। আমরা আমাদের সন্তানদের একটি সুন্দর, সহনশীল ও সভ্য সমাজ উপহার দিতে চাই। আমরা তাদের যুক্তির ভাষা শেখাতে চাই, ঘৃণার ভাষা নয়। কোনো ব্যক্তি বা দলকে হেয় করার চেয়ে আমাদের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি। কারণ আজ আমরা যে ভাষা ব্যবহার করব, আগামী প্রজন্ম সে ভাষা দিয়েই তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণ করবে।
পরিশেষে বলতে চাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সস্তা অ্যালগরিদম আজ হয়তো উত্তেজনাপূর্ণ ভাষাকে বেশি ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সাময়িক ‘ভাইরাল’ পোস্টকে মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে দায়িত্বশীল ও মার্জিত ভাষাকে। আসুন, আমরা আমাদের ভাষার শুচিতা ফিরিয়ে আনি। সুশীল সমাজের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, তারা যেন আত্মকেন্দ্রিকতা ও নোংরা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ভাষায় কথা বলেন। তবেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
লেখক: সাংবাদিক, প্রধান সম্পাদক, আপন দেশ
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































