ছবি: আপন দেশ
শব্দ দূষণ হলো এক অদৃশ্য দূষণ। যা বায়ু বা জল দূষণের মতো সরাসরি চোখে দেখা যায় না। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক।
শব্দ দূষণ আজকের আধুনিক জীবনের এক অবহেলিত কিন্তু অত্যন্ত ক্ষতিকর পরিবেশগত সমস্যা। সাধারণত অতিরিক্ত বা অবাঞ্ছিত শব্দ-যার তীব্রতা মানবশরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক-তাই শব্দ দূষণ হিসেবে বিবেচিত।
শহর এলাকায় যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ, কারখানার যন্ত্রপাতি, উচ্চস্বরে সঙ্গীত বা মাইক ব্যবহার, এমনকি উৎসব-মেলা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বেপরোয়া সাউন্ড সিস্টেম চালানো হয়। এসব শব্দ দূষণের জন্য দায়ী। এসবের শব্দই “নীরব ঘাতক” হিসেবে চিহ্নিত। কারণ এ দূষণ তাৎক্ষণিকভাবে চোখে না পড়লেও মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর ধীরে ধীরে গভীর ক্ষতি ডেকে আনে।
হঠাৎ এ উচ্চ শব্দের ধাক্কা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত উত্তেজিত করে তোলে। তবে শব্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় উৎসবের মৌসুমে। ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে মাইক বা ডিজে বাজানো এখন যেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। মধ্যরাত পর্যন্ত চলা এ তীব্র শব্দ কেবল বয়স্ক বা অসুস্থদের নয়, শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্যেও অসহনীয় যন্ত্রণার কারণ। পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার ফলে দিনের পর দিন ক্লান্তি গ্রাস করে।
সাধারণত ৬৫ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দকে সহনশীল মাত্রা ধরা হয়। কিন্তু ট্র্যাফিক হর্ন প্রায় ১১০ ডেসিবল এবং কনস্ট্রাকশনের শব্দ প্রায় ১০০ ডেসিবল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ে পরিবেশ অধিদফতরের পরিমাপে সাধারণত দেখা যায়: বিয়ে/মাহফিল এলাকায়: ৯০-১১০ ডেসিবল, পূজা-পার্বণ মণ্ডপে: ৯৫-১১৫ ডেসিবল, ডিজে সাউন্ড: ১০০-১২০ ডেসিবল। এগুলো আইনি সীমার (রেসিডেনশিয়াল এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবল) অনেক ওপর।
আরও পড়ুন<<>>জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : রাজধানীর অদূরে প্রকৃতি ও শিক্ষার এক অনন্য মিলনমেলা
শব্দ দূষণ বিষয়ে নাক-কান গলার রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মইনুল হাফিজ বলেন, অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে দীর্ঘদিন কাটালে শ্রবণ শক্তি ধীরে ধীরে কমে যায়। এমনকি বধির হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত শব্দের কারণে কানের নার্ভ ও রিসেপ্টর সেলগুলো নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে শ্রবণ শক্তি হারাতে থাকে। কত ডেসিবল শব্দে আপনি কতটুকু সময় কাটাচ্ছেন তার উপর বিষয়টি নির্ভর করে। ১২০ ডেসিবেল শব্দ সঙ্গে সঙ্গেই কান নষ্ট করে দিতে পারে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে ৮৫ ডেসিবেল শব্দ যদি কোন ব্যক্তির কানে প্রবেশ করে তাহলে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি নষ্ট হবে। মানুষ সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবেল শব্দে কথা বলে। ৭০ ডেসিবেল পর্যন্ত মানুষের কান গ্রহণ করতে পারে। ৮০র উপরে গেলেই ক্ষতি শুরু হয়।
পরিবেশ অধিদফতরের এক জরিপে অনুযায়ী, মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতোমধ্যেই দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। নিয়মিত উচ্চ শব্দের সংস্পর্শে থাকলে শব্দ দূষণ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে:
* শ্রবণশক্তি হ্রাস: দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে কানের ভেতরের সংবেদনশীল কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলস্বরূপ স্থায়ী বধিরতা দেখা দিতে পারে।
* মানসিক স্বাস্থ্য: শব্দ দূষণ সরাসরি দুশ্চিন্তা, বিরক্তি এবং মানসিক চাপের জন্ম দেয়। রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং কর্মক্ষমতা কমে যায়।
* হৃদরোগের ঝুঁকি: একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রমাগত শব্দের ধাক্কা আমাদের শরীরের স্ট্রেস হরমোন (যেমন কর্টিসল) বাড়িয়ে দেয়, যা রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
* শিশু ও শিক্ষার্থীদের সমস্যা: শিশুরা শব্দ দূষণের কারণে মনোযোগের অভাবে ভোগে, তাদের শেখার ক্ষমতা কমে যায় এবং তাদের মধ্যে আগ্রাসী আচরণ দেখা যেতে পারে।
শব্দ দূষণ কমাতে আইনি ব্যবস্থা, জনসচেতনতা এবং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬, মোটরযান আইন ১৯৮৮, ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯ যেখানে নির্দিষ্ট এলাকায় দিনের ও রাতের শব্দসীমা নির্ধারিত আছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ সীমা সম্পর্কে জানে না, আর জানা থাকলেও অনেক সময় তা মানা হয় না। তাই কঠোর নজরদারি, অযথা হর্ন বাজানোয় জরিমানা, মাইক ব্যবহারে অনুমতির বাধ্যবাধকতা এবং জনসচেতনতা-এসব পদক্ষেপ কার্যকর হলে শব্দ দূষণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, শব্দ দূষণ কোনো দৃশ্যমান বিপর্যয় নয়, কিন্তু এর প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। এটি আমাদের শরীর, মন, সমাজ-সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই “নীরব ঘাতক” এ দূষণ মোকাবিলায় প্রত্যেকে সচেতন হওয়া এবং আইন মেনে চলা অত্যাবশ্যক।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































