Apan Desh | আপন দেশ

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস আজ

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৫৯, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস আজ

ছবি: আপন দেশ

আজ ০৪ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার), বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস। সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং যৌন স্বাস্থ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর এ দিনে দিবসটি পালন করা হয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে যৌন স্বাস্থ্য, অধিকার, ন্যায়বিচার এবং আনন্দের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।

সুস্থতা, মর্যাদা সচেতনতার কথা। মানুষের সুস্থ জীবন কেবল শারীরিক রোগমুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক শান্তি, নিরাপদ সম্পর্ক, নিজের শরীর সম্পর্কে সঠিক ধারণা এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাও সুস্থ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ বৃহত্তর ভাবনাকে সামনে রেখে প্রতি বছর ০৪ সেপ্টেম্বর পালিত হয়, বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস। 

২০১০ সালে World Association for Sexual Health (WAS) এর উদ্যোগে দিবসটির সূচনা হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত ভয়, লজ্জা ও ভুল ধারণার পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও সচেতনতার পরিবেশ তৈরি করা।

যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা কি লজ্জার? নাকি নিজের শরীর, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা সচেতন মানুষের অধিকার? বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা, ভুল ধারণা ও কুসংস্কার অনেক মানুষকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ থেকে দূরে রাখে। কেউ সমস্যার কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন, কেউ অপ্রমাণিত চিকিৎসার আশ্রয় নেন, আবার কেউ সামাজিক অপমানের ভয়ে চিকিৎসা নিতেই চান না।

ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন ফর সেক্সুয়াল হেলথ (ডব্লিউএএস)-এর উদ্যোগে ২০১০ সালে প্রথমবার বিশ্ব যৌনস্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল যৌনস্বাস্থ্যকে ঘিরে সামাজিক নীরবতা ও ট্যাবু কমিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করা।

যৌনস্বাস্থ্য মানে শুধু যৌনবাহিত রোগ নয়
আমাদের সমাজে যৌনস্বাস্থ্যকে অনেক সময় যৌনবাহিত সংক্রমণ বা যৌনক্ষমতার সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি অসম্পূর্ণ ধারণা। যৌনস্বাস্থ্য মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক, আবেগীয় ও সামাজিক সুস্থতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যৌনবাহিত সংক্রমণের প্রতিরোধ ও চিকিৎসার পাশাপাশি প্রজনন স্বাস্থ্য, যৌন সমস্যা, সম্পর্কের সুস্থতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থাৎ যৌনস্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্য থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বড় বাধা লজ্জা ও কুসংস্কার
যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো নানা ভুল ধারণা প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন যৌন সমস্যা মানেই চরিত্রের সমস্যা, যৌনবাহিত সংক্রমণ মানেই অনৈতিক জীবনযাপন অথবা যৌন সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া লজ্জার বিষয়। এ ধরনের ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

যৌন সমস্যার পেছনে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, হরমোনের পরিবর্তন, স্নায়বিক সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপসহ নানা কারণ থাকতে পারে। তাই যৌন সমস্যাকে নৈতিকতার প্রশ্ন না বানিয়ে স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসাবে মূল্যায়ন করা দরকার।

আরও পড়ুন<<>>বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস আজ

ভুল তথ্যের যুগে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা জরুরি
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যৌনস্বাস্থ্য-সম্পর্কিত তথ্যের বড় উৎস হয়ে উঠেছে। কিন্তু একইসঙ্গে এখানে ছড়িয়ে পড়ছে বিপুল মাত্রায় অপ্রমাণিত তথ্য। যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা, দ্রুত যৌন সমস্যা নিরাময়, তথাকথিত অলৌকিক চিকিৎসা কিংবা বিভিন্ন অপ্রমাণিত ওষুধের বিজ্ঞাপন মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। এর ফলে প্রকৃত রোগের চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দরকার বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণের ভিত্তিতে যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য প্রদান।

যৌন শিক্ষা মানেই অশালীনতা নয়
যৌন শিক্ষা নিয়ে সমাজে একটি ভুল ধারণা রয়েছে। এটি যেন যৌন আচরণ শেখানোর সমার্থক। বাস্তবে বয়সোপযোগী যৌনস্বাস্থ্য শিক্ষা মানুষের নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণা, বয়ঃসন্ধির পরিবর্তন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি, ব্যক্তিগত সীমারেখা। প্রয়োজন হলে কোথায় সাহায্য চাইতে হবে, এসব বিষয়ে জ্ঞান দেয়। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা অনুযায়ী সঠিক তথ্য দেয়া দরকার।

যৌনস্বাস্থ্য শিক্ষার প্রথম ক্ষেত্র পরিবার
সন্তান শরীর বা বয়ঃসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন করলে তাকে ধমক দেয়া বা লজ্জা দেয়া উচিত নয়। তার বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী সহজ ভাষায় সঠিক তথ্য দিতে হবে। একটি শিশু যদি মনে করে শরীর সম্পর্কে প্রশ্ন করা লজ্জার বিষয়, তাহলে ভবিষ্যতে সে নির্ভরযোগ্য উৎসের পরিবর্তে অনির্ভরযোগ্য জায়গা থেকে তথ্য নেয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অভিভাবকদের তাই সন্তানদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যেখানে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা স্বাভাবিক।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব
বিদ্যালয় ও কলেজে বয়সোপযোগী স্বাস্থ্য শিক্ষা আরও শক্তিশালী করা দরকার। প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে বয়ঃসন্ধি, শরীরের পরিবর্তন, স্বাস্থ্যবিধি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে শিক্ষা হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক, বয়সোপযোগী, সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল এবং শিক্ষার্থীর মর্যাদা রক্ষাকারী।

মানসিক স্বাস্থ্য ও যৌনস্বাস্থ্য পরস্পর সম্পর্কিত
উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাসের সমস্যা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন যৌনস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার দীর্ঘদিনের যৌন সমস্যাও মানসিক চাপ ও সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলর এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

চিকিৎসকের ভূমিকা
যৌন স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো গোপনীয়তা, সম্মান ও বিচারহীন আচরণ। রোগী ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে এলে তাকে বিব্রত বা অপমান না করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। প্রয়োজনীয় ইতিহাস গ্রহণ, শারীরিক ও মানসিক কারণ বিবেচনা এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব
যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন মাধ্যমে যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। চটকদার শিরোনাম বা ভয় সৃষ্টি নয়, বরং রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ, চিকিৎসা এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত, সেসব বিষয়ে তথ্য দিতে হবে।

যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করলে কাউকে লজ্জা দেয়া নয়, সঠিক তথ্য দিতে হবে। যৌন সমস্যা হলে উপহাস নয়, চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে। ভুল তথ্য ছড়ালে তা অনুসরণ নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে সংশোধন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যৌনস্বাস্থ্যকে নৈতিক বিচার নয়, জনস্বাস্থ্য ও মানবকল্যাণের দৃষ্টিতে দেখা। 

বিশ্ব যৌনস্বাস্থ্য দিবস শুধু একটি দিবস পালনের উপলক্ষ নয়, এটি সমাজে একটি প্রয়োজনীয় ও দায়িত্বশীল কথোপকথন শুরু করার সুযোগ। ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব যৌনস্বাস্থ্য দিবসে 'Every Body'-এর এই বার্তাই হোক বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অঙ্গীকার, যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা যেন প্রত্যেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

আপন দেশ/জেডআই

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়