ছবি: আপন দেশ/এআই
রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা জাতিকে শোকাহত করেছে। সন্তান হারানো পরিবারগুলোর কান্না, ক্ষোভ এবং বিচার দাবি আজ পুরো দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের তদন্তে চিকিৎসক, নার্স এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ফলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে সর্বত্র।
কিন্তু ঘটনার পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে- যদি কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা ব্যবস্থাপনার গাফিলতির কারণে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে কি পুরো হাসপাতালটির নিবন্ধন বাতিল বা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়া জনস্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে?
অনেকের মতে, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা ও জনস্বার্থের আলোকে।
গরিব মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা
দীর্ঘদিন ধরে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন। যেখানে অনেক বেসরকারি হাসপাতালে একটি অপারেশন, আইসিইউ বা নবজাতকের চিকিৎসায় লাখ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে আদ্-দ্বীন তুলনামূলক কম ব্যয়ে সেবা দেয়ার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন<> আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে ৭২ ঘণ্টার নোটিশ
গণমাধ্যমকর্মী সাইফুর রহমান সম্প্রতি তার স্ত্রীর সন্তান জন্মের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতালের জুরাইন শাখায় আমার স্ত্রীর সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। অপারেশন থিয়েটারের চার্জ ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক ব্যয় অন্য অনেক হাসপাতালের তুলনায় অনেক কম। হাসপাতালের নিজস্ব পরিবহন সুবিধাও রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিশু মৃত্যুর ঘটনায় যারা দায়ী তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু হাসপাতালটি বন্ধ করে দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ।’
অতীতের নজিরও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে
স্বাস্থ্যখাতের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দেশে অতীতে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলা, ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত বিল আদায় কিংবা রোগী মৃত্যুর অভিযোগ বহুবার উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনরা হাসপাতাল ভাঙচুর করেছেন, মামলা হয়েছে, তদন্ত হয়েছে। কিন্তু সেসব ঘটনায় খুব কম ক্ষেত্রেই হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল বা পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার মতো ব্যবস্থা দেখা গেছে।

এ কারণে সাধারণ মানুষের একটি অংশ প্রশ্ন তুলছেন- আইনের প্রয়োগ কি সবার ক্ষেত্রে সমান হবে? যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধ বা অবহেলা ঘটে, তাহলে অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান সংস্কারের সুযোগ কি দেয়া উচিত নয়?
অবহেলা ক্ষমার অযোগ্য, তবে শাস্তির লক্ষ্য কী?
ছয় নবজাতকের মৃত্যু নিঃসন্দেহে ভয়াবহ এবং হৃদয়বিদারক। কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের অবহেলা মেনে নেয়া যায় না। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, নার্স কিংবা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিচার কি কেবল শাস্তির জন্য, নাকি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের জন্যও?
স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের কিছু ব্যক্তির ব্যর্থতার দায়ে পুরো প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিলে ভবিষ্যতে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বরং দায়ীদের বিচারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা বেশি কার্যকর হতে পারে।
সরকার চাইলে পুনর্গঠন বা তত্ত্বাবধান করতে পারে
সরকার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছে। মন্ত্রী নিজে পরিদর্শনে গিয়েছেন, দ্রুত কমিটি গঠন, তদন্ত রিপোর্ট দাখিল এবং কেনো হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল হবে না তার কারণ জানতে হাসপাতালটিকে ৭২ ঘণ্টার নোটিশ দিয়েছে। তাতে প্রসংশা হচ্ছে। নোটিশে মনে হচ্ছে হাসপাতালটি বন্ধ হতে পারে। তাই অনেকেই মনে করেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ক্ষেত্রে সরকার বিকল্প পথও বিবেচনা করতে পারে। যদি তদন্তে গুরুতর ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা বা অবকাঠামোগত দুর্বলতা ধরা পড়ে, তাহলে হাসপাতালটি সরাসরি বন্ধ না করে বিশেষ প্রশাসনিক তত্ত্বাবধান, পুনর্গঠন, পরিচালনা বোর্ড পরিবর্তন, কিংবা রাষ্ট্রীয় সহায়তায় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশে অতীতে আর্থিক সংকটে পড়া বা দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ কিংবা বিশেষ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার নজির রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার মতো জনকল্যাণমূলক খাতে প্রয়োজন হলে অনুরূপ নীতিগত সহায়তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কারণ হাসপাতালটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি হাজারো দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসার আশ্রয়স্থল।
জনমনে নানা আলোচনা
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা সেবা দেয়ার কারণে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক স্বাস্থ্যখাতের একটি অংশের জন্য অস্বস্তির কারণ ছিল। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। এটাও সত্য যে স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং রোগী আকর্ষণের প্রশ্নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যবসায়িক স্বার্থ কাজ করে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নানা পক্ষের নানা বক্তব্য সামনে আসছে।

অন্যদিকে সন্তান হারানো পরিবারগুলোর বুকের আগুন এখনো জ্বলছে। তাদের শোক, ক্ষোভ ও বিচার প্রত্যাশা পুরোপুরি যৌক্তিক। কিন্তু সেই বেদনার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন ব্যক্তিগত, বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সেদিকেও সতর্ক নজর রাখার আহবান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার সময়
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সাশ্রয়ী চিকিৎসা এখন ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে। অনেক নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে জমি বিক্রি করছে, ঋণ নিচ্ছে কিংবা চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে বাড়ি ফিরছে। এ বাস্তবতায় আদ্-দ্বীনের মতো তুলনামূলক কম খরচের হাসপাতালগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই জনস্বার্থের প্রশ্নে রাষ্ট্রের সামনে এখন দুটি দায়িত্ব- প্রথমত, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের কঠোর বিচারের আওতায় আনা; দ্বিতীয়ত, নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসা সেবার সুযোগ যেন সংকুচিত না হয় তা নিশ্চিত করা।
ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণ- দুটোই জরুরি
ছয় নবজাতকের মৃত্যু একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি। এ ঘটনার বিচার অবশ্যই হতে হবে। যারা অবহেলা করেছে, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের নিরাপত্তা, অবকাঠামো, চিকিৎসা প্রটোকল এবং জবাবদিহি ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার আনতে হবে। কিন্তু একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, একটি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে সেই মানুষগুলো, যাদের পক্ষে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব নয়। তাই অনেকের প্রত্যাশা- দোষীদের শাস্তি হোক, সত্য উদঘাটিত হোক, হাসপাতালের সব ত্রুটি দূর করা হোক; কিন্তু গরিব মানুষের চিকিৎসার দরজাটি যেন চিরতরে বন্ধ না হয়ে যায়।
কারণ ন্যায়বিচার যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারও।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































