Apan Desh | আপন দেশ

ঋণশোধে বিদেশি মুদ্রা পাবে কোথায় মেঘনা গ্রুপ?

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ০০:০৯, ৯ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ০০:১৪, ৯ জুলাই ২০২৬

ঋণশোধে বিদেশি মুদ্রা পাবে কোথায় মেঘনা গ্রুপ?

ছবি: এআই জেনারেট

দেশের বেসরকারি খাতের ক্রমাগত সম্প্রসারণে থাকা শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) এবার ৮ কোটি ডলারের ঋণ নিয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রায় পাওয়া এসব ঋণ দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ কিনবে গ্রুপটি। এতে তাদের নতুন ব্যবসার দুয়ার খুলছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে বিশাল এ অঙ্কের ঋণ পরিশোধের সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার যোগান কে দেবে?

সিমেন্ট, ভোগ্য পণ্য (ডাল, তেল, আটা, ময়দা, সুজি, চিনিসহ নিত্যপণ্য), সাইকেল, সমুদ্রগামী জাহাজ, ব্রেভাজ, ইস্পাত, এলপিজি, টিস্যু, আবাসন ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে মেঘনা গ্রুপের।

গ্রুপটি সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) কাছ থেকে ৮ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেয়, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৮৫ কোটি টাকা। প্রথমে আবেদন বাতিল করা হলেও পরে নানামুখি চাপে সেই ঋণ অনুমোদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন বৈদেশিক ঋণ অনুমোদনের নিয়মেও পরিবর্তন আনতে চাইছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

আরও পড়ুন<<>> বসুন্ধরার পাচারের টাকায় তিন মহাদেশে আট সাম্রাজ্য!

আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন রিজার্ভের ওপর ধারাবাহিক চাপ রয়েছে, তখন পর্যাপ্ত রফতানি আয় ছাড়া এমন বৃহৎ আন্তর্জাতিক ঋণ গ্রহণ পুরো অর্থনীতির জন্যই এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করছে।

যে কারণে বাতিল করা হয় ঋণটি:

বৈদেশিক মুদ্রায় পাওয়া এ ঋণের পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রায় ৯৮৫ কোটি টাকা। এ ঋণের সুদহার হবে ৬.৬ শতাংশ। এরসঙ্গে রয়েছে সার্ভিস চার্জও। গ্রুপটির বৈদেশিক মুদ্রার আয় সেভাবে না থাকায় এ ঋণের অর্থ কিভাবে পরিশোধ করা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে ঋণটির অনুমোদন দেয়নি। কারণ হচ্ছে, এ পরিমাণ ঋণ সুদ দেয়ার মতো বিদেশি মুদ্রার আয় নেই মেঘনা গ্রুপের। 

নিয়ম অনুযায়ী, দেশে কার্যরত কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কারণ হচ্ছে, কোনো কারণে ঋণটি খেলাপি হলে তা রাষ্ট্রকে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। দেশের ক্রেডিট রেটিং ঠিক রাখতে গিয়ে রাষ্ট্র নিরুপায় হয়ে সেটি করে থাকে। অন্যদিকে খেলাপি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।

আরও পড়ুন <<>> পালাচ্ছে বসুন্ধরা

বৈদেশিক মুদ্রার আয় যথেষ্ঠ না হওয়ায় ঋণ পরিশোধের সময়ে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ডলার কিনতে হবে মেঘনা গ্রুপকে। এতে ডলার বাজার অস্থির হয়ে উঠবে। এছাড়া প্রতি কিস্তি পরিশোধের সময়েই বড় অঙ্কের ডলার ব্যয় হবে-এসব বিবেচনায় ঋণটির অনুমোদন আটকে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

মেঘনা গ্রুপের জাহাজ ব্যবসা:

মেঘনা গ্রুপের সূত্র অনুযায়ী, প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ কিনবে গ্রুপটি। তাদের আরও ২৭টি জাহাজ রয়েছে। তাতে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩১টিতে।
নানা খাতে গ্রুপটির যে ব্যবসা রয়েছে তাতে সমুদ্রপথে আমদানি-রফতানি মিলিয়ে প্রতি বছরে গড়ে ২৭৯ কোটি ডলারের (স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার) পণ্য পরিবহণ করতে হয়। বিশাল এ পণ্য পরিবহণ করতে নিজেদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া নিতে হয়।

প্রশ্ন হলো, সমুদ্রগামী নতুন চারটি জাহাজ কি মেঘনা গ্রুপের পণ্য পরিবহণ করবে, নাকি অন্য দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য ভাড়ায় খাটবে। যদি শুধু অন্য দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য ভাড়ায় চলে তাহলে আয় দিয়ে কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হবে? যদি কোনো কারণে জাহাজ আয় করতে না পারে তাহলে বিশাল এ অঙ্কের বৈদেশিক ঋণের অর্থ পরিশোধে ডলার পাবে কোথায়? অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেই যদি ডলার কিনতে হয়, তাহলে ডলার বাজারে চাপ আরও বাড়বে। অশান্ত হবে দেশীয় ডলার বাজার।

নিজস্ব পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে কিছু বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, আন্তর্জাতিক রুট থেকে সরাসরি ডলার আয় করার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকলে এ বিশাল অঙ্কের দায় প্রকারান্তরে স্থানীয় বাজারকেই শুষে নেবে।

লেনদেনে মধুমতি ব্যাংক

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল মধুমতি ব্যাংকের পরিচালক। চতুর্থ প্রজন্মের অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের এ ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দিচেছ আইএফসি। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকটির বড় ধরনের পোর্টফলিও নেই। শুধু পরিচালক হওয়ায় মধুমতি ব্যাংক বাধ্য হচ্ছে এত বড় ঝুঁকি নিতে।

শক্তিশালী ফরেক্স পোর্টফোলিও না থাকা সত্ত্বেও একটি ছোট বেসরকারি ব্যাংক কেবল পরিচালক-সংশ্লিষ্টতার কারণে এত বড় ঋণের মধ্যস্থতাকারী হওয়ায় ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি সক্ষমতা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে।

মেঘনা গ্রুপের বিদেশি মুদ্রায় পাওয়া ঋণ নতুন নয়। এর আগে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে ২০ লাখ ডলারের ঋণ পায়। যা দিয়ে গ্রুপটি তাদের আটা-ময়দার ব্যবসা সম্প্রসারণ করে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রথম জলবায়ু-স্মার্ট স্টিল কারখানা স্থাপনের জন্য মেঘনা রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলসকে ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের ঘোষণা দেয় আইএফসি। প্রকল্পটি বছরে ১৫ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদন এবং ২০ হাজারের বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

আরও পড়ুন <<>> বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মোরশেদ আলমের শত শত কোটি টাকা পাচার

এর আগে ২০২৩ সালে আইএফসি তাদের গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি প্ল্যাটফর্মের আওতায় মেঘনা গ্রুপের তানভীর ফুড লিমিটেডকে বগুড়ায় আধুনিক চালকল স্থাপনের জন্য ৩৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের ঘোষণা দেয়। গ্রুপটির বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। এতে দেশের বেসরকারি খাত থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে সুদ-আসল পরিশোধ করতে।

এ বিষয়ে জানতে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের কাছে ই-মেইল ও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। তিনদিনেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।  

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়