ছবি: আপন দেশ
কাগজের সম্পদে কাল্পনিক মুনাফা দেখিয়ে লভ্যাংশ লোপাট করছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পিএলসি। অস্তিত্বহীন সম্পদ, ব্যাংক তহবিল উধাও ও আইনি খরচ গোপনের মাধ্যমে গ্রাহকদের লাইফ ফান্ড এখন চরম ঝুঁকিতে। দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানে ডুবন্ত বিনিয়োগ ও জালিয়াতির নেপথ্য খতিয়ান নিয়ে আপন দেশ ডটকমের তিন পর্বের বিশেষ প্রতিবেদন। আজ পড়ুন প্রথম পর্ব- ‘ব্যাংক তহবিল উধাও ও ভুয়া সম্পদের তেলেসমাতি: রূপালী লাইফের লভ্যাংশ লোপাট!’
দেশের বিমা খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০২৪ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন আর্থিক কারচুপির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষকদের গোপন প্রতিবেদন গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিটি তাদের নথিপত্রে কোটি কোটি টাকার অলীক ও অস্তিত্বহীন সম্পদ দেখিয়ে গ্রাহক, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুকৌশলে প্রতারিত করে আসছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এ পুঞ্জীভূত জালিয়াতির কারণে কোম্পানিটি এখন চরম দেউলিয়া পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা পুরো বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
১২০ কোটি টাকার অস্তিত্বহীন সম্পদ ও ‘ভুয়া’ সারপ্লাসের শুভঙ্করের ফাঁকি
আর্থিক প্রতিবেদনের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছে ৬১৮ কোটি টাকা। তবে নিরীক্ষক দল ও আর্থিক বিশ্লেষকদের চুলচেরা পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে এক নেপথ্য সত্য। এ প্রদর্শিত সম্পদের মধ্যে অন্তত ১২০ কোটি টাকার সম্পদের কোনো বাস্তব বা দৃশ্যমান অস্তিত্বই নেই।
বিমা খাতের সুশাসন ও প্রচলিত হিসাববিজ্ঞান নীতিমালা অনুযায়ী, এ বিশাল অঙ্কের কাল্পনিক ও অস্তিত্বহীন সম্পদকে অবিলম্বে কোম্পানির ‘লাইফ ফান্ড’ বা জীবন তহবিল থেকে বাদ দেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু রূপালী লাইফ কর্তৃপক্ষ তা করেনি, উল্টো এ অস্তিত্বহীন ১২০ কোটি টাকাকে লাইফ ফান্ডের অংশ হিসেবে ধরে ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত বা ‘সারপ্লাস’ প্রদর্শন করেছে।
আরও পড়ুন<> মোরশেদ আলমের ‘শরীয়াহ ভিত্তিক’ দুর্নীতি! ন্যাশনাল লাইফের শতকোটি লুট
শুধু কাগজের কলমে এ ভুয়া উদ্বৃত্ত দেখানোই শেষ নয়, এ কাল্পনিক মুনাফাকে ভিত্তি ধরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের জন্য ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশও ঘোষণা ও বিতরণ করেছে। অথচ বাস্তব হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্থিক প্রতিবেদন থেকে যদি এ অস্তিত্বহীন ১২০ কোটি টাকার সম্পদকে লাইফ ফান্ড থেকে পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়। তবে কোম্পানির প্রকৃত জীবন তহবিল কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৭৭ কোটি টাকায়। এ প্রকৃত ফান্ডের বিপরীতে যখন পলিসি গ্রাহকদের মোট দায় তথা ৪৭২ কোটি টাকাকে সমন্বয় করা হয়, তখন কোম্পানির উদ্বৃত্ত তো দূরের কথা, উল্টো ৯৮ কোটি টাকার এক বিশাল ও ভয়াবহ প্রকৃত আর্থিক ঘাটতি উন্মোচিত হয়।
হিসাববিদ ও বিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্তিত্বহীন কাল্পনিক সম্পদ দেখিয়ে এভাবে কৃত্রিম উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস তৈরি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আর্থিক অপরাধের শামিল। এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড একদিকে যেমন শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ পলিসিগ্রাহকের মৌলিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে, অন্যদিকে কোম্পানির প্রকৃত নাজুক আর্থিক অবস্থাকে আড়াল করে রাখে। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে কোম্পানির মূল তহবিল আকস্মিকভাবে সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যাংক হিসাব থেকে উধাও ৪৪ কোটি টাকা!
রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনের অন্যতম বড় ধাক্কাটি এসেছে ব্যাংক জমার হিসাব থেকে। ২০২৪ সালের বার্ষিক আর্থিক নথিতে কোম্পানিটি দাবি করেছে যে, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের মোট জমার পরিমাণ ৯১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এ হিসাবের বিস্তারিত বিবরণীতে দেখানো হয়েছে, কোম্পানির বিভিন্ন এসটিডি (STD) অ্যাকাউন্টে রয়েছে ৬৯ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং চলতি হিসাবে জমা রয়েছে ২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
তবে নিরীক্ষক দল (অডিটর) যখন ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে এবং বাস্তব অনুসন্ধান চালায়, তখন বেরিয়ে আসে এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতি। অডিটররা সরেজমিনে রূপালী লাইফের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে মাত্র ৪৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। অর্থাৎ, নথিতে বর্ণিত হিসাবের চেয়ে বাকি ৪৪ কোটি টাকার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব, বৈধ রসিদ বা আইনি নথিপত্র নিরীক্ষকেরা খুঁজে পাননি। এ বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেছে। এ বিপুল আর্থিক গরমিল ও নথিপত্রের মারাত্মক ঘাটতির বিষয়টি নিরীক্ষক দল তাদের আনুষ্ঠানিক 'কোয়ালিফাইড ওপিনিয়নে' অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। আরও আশঙ্কার বিষয় হলো, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়েও রূপালী লাইফের ব্যাংক জমার স্থিতি নিয়ে বারবার একই ধরনের গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু কোনো কার্যকর সমাধান বা ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
গ্রাহকের প্রিমিয়াম এজেন্টের পকেটে, লভ্যাংশ নিলেন পরিচালকেরা
তহবিল তছরূপের আরও এক অভিনব হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ খাতকে। মাঠপর্যায়ে সাধারণ গ্রাহকেরা তাদের কষ্টার্জিত বিমা পলিসির প্রিমিয়ামের টাকা জমা দিয়েছিলেন রূপালী লাইফের অনুমোদিত এজেন্টদের কাছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের সে এজেন্টরা গ্রাহকের সে টাকা কোম্পানির কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা না দিয়ে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছেন। অথচ রূপালী লাইফ কর্তৃপক্ষ এ অনাদায়ী ও বকেয়া অর্থকে বছরের পর বছর ধরে তাদের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ বা কোম্পানির কার্যকর সম্পদ হিসেবে প্রদর্শন করে আসছে।
আরও পড়ুন<> ন্যাশনাল লাইফের তদন্তে দুদক: ২১শ’ অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেন, ৭১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ-পাচার
সবচেয়ে বড় অনিয়মটি ঘটেছে এখানেই। এজেন্টদের হাতে আটকে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া এ অনাদায়ী টাকাকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করে রূপালী লাইফের পরিচালকেরা কৃত্রিম সারপ্লাস দেখিয়েছেন। সেই সারপ্লাসের ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ নিজেদের পকেটে পুরেছেন।
২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত ৭ বছরের আর্থিক রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ খাতে মোট ২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে ৭ কোটি ৭২ লাখ, ২০১৮ সালে ৪ কোটি ৯৮ লাখ, ২০১৯ সালে ৪ কোটি ৪৬ লাখ, ২০২০ সালে ৩ কোটি ৬৯ লাখ এবং ২০২১ সালে ৪ কোটি ৮ লাখ টাকার বকেয়া সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী অর্থ আদায় না হওয়া সত্ত্বেও তা দিয়ে মুনাফা দেখানো স্পষ্ট জালিয়াতি।
ক্যাশ ইন হ্যান্ডে ১৬.৪৫ কোটি টাকার গভীর রহস্য
কোম্পানির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও শাখাগুলোতে নগদ কত টাকা গচ্ছিত রয়েছে, তা নির্দেশ করে ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ বা হাতে নগদ খাত। রূপালী লাইফের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এ খাতে মাত্র ৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ছিল। এরপর থেকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতি বছর এ খাতের অঙ্ক অবাস্তবভাবে বাড়তে থাকে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ক্যাশ ইন হ্যান্ডের পরিমাণ দেখানো হয়েছে বিশাল অঙ্কের- ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
বিমা খাতের সিনিয়র চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও হিসাববিদদের মতে, এ বিপুল পরিমাণ টাকা অলসভাবে কোম্পানির অফিসে বা কারো হাতে নগদ রেখে দেয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যবসায়িক যৌক্তিকতা নেই। এত কোটি কোটি টাকা কোনো লাভজনক খাতে বিনিয়োগ না করে হাতে নগদ হিসেবে দেখানোর পেছনে বড় ধরনের জালিয়াতি লুকিয়ে রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদনে এ ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আদতে কার কাছে, কোন সিন্দুকে বা কার জিম্মায় রয়েছে, তার কোনো বিস্তারিত বিবরণ বা ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের তীব্র আশঙ্কা, কোম্পানিটির মূল তহবিল থেকে বড় অঙ্কের অর্থ অন্য কোনো বেনামী খাতে সরিয়ে নিতে বা সরাসরি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে এ ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ খাতের ভুয়া অঙ্ক ব্যবহার করা হয়েছে। এ জালিয়াতি বন্ধ না হলে সাধারণ গ্রাহকের জমানো টাকা ফেরত পাওয়া আগামী দিনে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে জানতে রূপালী লাইফের এমডি মো. গোলাম কিবরিয়াকে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও এ রিপোর্ট লেখা নাগাদ তাতে সাড়া দেননি।
পরের পর্বে পড়ুন- রূপালী লাইফের দুর্নীতি: ২৮ কোটি ভুয়া আয়, ৩২ কোটি গোপন ব্যয়, লাইফ ফান্ড ঝুঁকিতে।
আপন দেশ/এবি/এনএম
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































