Apan Desh | আপন দেশ

দুদকের মামলার আসামি হয়েও আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মনসুর

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১০:৫১, ২৩ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১১:০১, ২৩ জুলাই ২০২৬

দুদকের মামলার আসামি হয়েও আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মনসুর

ছবি : আপন দেশ

যে ব্যাংকে বসে শত শত কোটি টাকা লুটের ভয়ংকর ‘নীল নকশা’ বাস্তবায়ন হলো, দিনশেষে সে ব্যাংকেরই সর্বোচ্চ পদে প্রাইজ পোস্টিং পেলেন কুশীলবদের একজন। 

শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাত থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। অথচ নজিরবিহীন জাদুকরী ক্ষমতার বলে সে অভিযুক্ত ব্যক্তিই পুরস্কৃত হয়ে চেয়ার চেপে বসেছেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে। তবে কারাগারে রয়েছেন মূল কুশীলব সালমান এফ রহমান ওরফে দরবেশ এবং শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতা শিবলী রুবায়েত ইসলাম।

ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্স ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কমার্স (আইএফআইসি) ব্যাংকের বর্তমান এমডি সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে ঘিরে এখন দেশের আর্থিক খাতে তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্ক। বর্তমানে ব্যাংকটিতে ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার সরকারের। বাকি অংশ পরিচালক, উদ্যোক্তা ও সাধারণ জনগণের।

আরও পড়ুন : ‘কালো টাকা’র কাজী ইমদাদ হচ্ছেন দুদক চেয়ারম্যান?

সচেতন মহল ও সাধারণ আমানতকারীদের সোজা প্রশ্ন, দুদকের গুরুতর মামলার আসামি হয়েও কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তিনি এ প্রাইজ পোস্টিং পেলেন? যে ব্যাংকে লুটপাট চলল, সে ব্যাংকেরই শীর্ষ অভিভাবক যদি হন অভিযুক্ত আসামি, তবে সাধারণ মানুষের কষ্টে অর্জিত হাজার কোটি টাকার আমানত কার কাছে নিরাপদ?

৮৭ কোটির জমি দেখানো হয় ১০২০ কোটি : জালিয়াতির ভয়ংকর ফাঁদ

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আর্থিক খাতের নজিরবিহীন এক জালিয়াতি ও জঘন্য প্রতারণার চিত্র। গাজীপুরের শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেড নামের একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৮৭ কোটি টাকার জমিকে অবিশ্বাস্য কারসাজিতে রূপ দেয়া হয় ১০২০ কোটি টাকায়। এরপর ‘আইএফআইসি আমার বন্ড’ নামের আকর্ষণীয় ও বিভ্রান্তিকর ব্র্যান্ডিং ব্যবহার করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলোভন দেখিয়ে বাজার থেকে তোলা হয় শত শত কোটি টাকা।

উত্তোলিত অর্থ থেকে লোক দেখানো ২০০ কোটি টাকার এফডিআর করা হলেও বাকি ৮০০ কোটি টাকা ব্যাংকিং আইনকানুন আতিপাতি করে পাচার করা হয় বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডসহ সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পকেটে। পরবর্তীতে জালিয়াতির তথ্য গোপন করতে সন্দেহজনক লেনদেন ও লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে পুরোদমে মানি লন্ডারিং সম্পন্ন করা হয়।

এ পুরো মহালুটপাটের সময় সৈয়দ মনসুর মোস্তফা ছিলেন ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) এবং চিফ ক্রেডিট অফিসার। ঋণের প্রাথমিক অনুমোদন ও ছাড়পত্রের মূল নিয়ন্ত্রক হয়েও কীভাবে তিনি এমন জঘন্য আর্থিক অপরাধের মূল মদদদাতা হলেন, তা দুদকের তদন্তে সুনির্দিষ্টভাবে উঠে এসেছে। 

অন্যদিকে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলার আসামি দরবেশের বিরুদ্ধে তদন্তে বৈরাগ্য দেখাচ্ছে দুদক।

যেসব আইন ও ধারায় ঝুলছে অপরাধের দায়

দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণিত এ বিশাল জালিয়াতি, জালিয়াতিযুক্ত কাগজপত্র তৈরি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ পাচারের জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশের দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি বিরোধী আইনের একগুচ্ছ কঠোর ধারায় মামলা করা হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ (অস্থাবর সম্পত্তি আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা ও অসাধুভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরে প্ররোচনা), ৪৬৭ (মূল্যবান জামানত বা উইল জালিয়াতি), ৪৬৮ (প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি), ৪৭১ (জালি দলিলকে খাঁটি হিসেবে ব্যবহার), ৪৭৭(ক) (হিসাব জালিয়াতি বা বিকৃতি) এবং ১০৯ (অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনা) ধারায় সরাসরি অভিযোগ আনা হয়েছে।

আরও পড়ুন : রূপালী লাইফের দুর্নীতি: ২৮ কোটি ভুয়া আয়, ৩২ কোটি গোপন ব্যয়

একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা (সরকারি বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচরণ) এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৪ ধারা (অবৈধ অর্থ স্থানান্তর, রূপান্তর ও পাচার) লঙ্ঘন করে দণ্ডনীয় অপরাধ করার দায়ে মামলাটি অনুমোদিত ও দায়ের করা হয়।

পটপরিবর্তনের পর রহস্যময় ‘প্রাইজ পোস্টিং’

চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা পালিয়ে যান। দাড়ি-গোঁফ ফেলে পালানোর সময় গ্রেফতার হন ব্যাংকটির মূল নিয়ন্ত্রক সালমান এফ রহমান। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামকেও গ্রেফতার করে দুদক।

দেশের মানুষ যখন আর্থিক খাতের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই রহস্যজনকভাবে ২ জুন সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে আইএফআইসি ব্যাংকের 'এমডি' পদে বসিয়ে দেয়া হয়।

আরও পড়ুন : সওজে হরিলুটের সাম্রাজ্য, প্রকৌশলী আজাদের কন্ট্রোলে রিমোট

অপরাধের স্পষ্ট ধারাযুক্ত মামলার আসামি সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি না করে উল্টো এমডি পদে বসানোয় অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিকেই ব্যাংকের লাগাম সঁপে দেয়া অর্থ খাতের কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর গভীর ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমানতকারীদের চরম উদ্বেগ

আইএফআইসি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। যে ব্যক্তি ব্যাংকের নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে শত শত কোটি টাকার জালিয়াতি ও পাচারে সরাসরি যুক্ত, তার কাছে ব্যাংকটির লাখ লাখ গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। আমানতকারীরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। 
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন ধারার গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত আসামিকে এমডি পদে বহাল রাখা আমানতকারীদের পিঠে স্পষ্ট খঞ্জরাঘাতের নামান্তর।

দুদকের মামলা ও ৩০ আসামির পূর্ণাঙ্গ তালিকা

দুদক মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) প্রতিবেদককে জানান, সংস্থার সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বাদী হয়ে এ মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্ত ৩০ জন আসামি হলেন। তারা হলেন,

১. সালমান এফ রহমান, সাবেক চেয়ারম্যান, আইএফআইসি ব্যাংক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
২. শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম, সাবেক চেয়ারম্যান, বিএসইসি
৩. সৈয়দ মনসুর মোস্তফা, এমডি (তৎকালীন ডিএমডি ও চিফ ক্রেডিট অফিসার), আইএফআইসি ব্যাংক
৪. মো. মশিউজ্জামান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেড
৫. তিলাত শাহরিন, পরিচালক, শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেড
৬. আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, আইএফআইসি ব্যাংক
৭. মো. শাহ আলম সারোয়ার, সাবেক এমডি, আইএফআইসি ব্যাংক
৮. সুধাংশু শেখর বিশ্বাস, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংক
৯. এ আর এম নাজমুস সাকিব, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংক
১০. কামরুন নাহার আহমেদ, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংক
১১. রাবেয়া জামালী, সাবেক পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংক
১২. গোলাম মোস্তফা, সাবেক পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংক
১৩. মো. জাফর ইকবাল, সাবেক পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংক
১৪. রুমানা ইসলাম, সাবেক কমিশনার, বিএসইসি
১৫. মিজানুর রহমান, সাবেক কমিশনার, বিএসইসি
১৬. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ, সাবেক কমিশনার, বিএসইসি
১৭. মো. আবদুল হালিম, সাবেক কমিশনার, বিএসইসি
১৮. শাহ মো. মঈনউদ্দিন, হেড অব লোন পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট, আইএফআইসি ব্যাংক
১৯. মো. রফিকুল ইসলাম, ডিএমডি ও চিফ বিজনেস অফিসার (রিটেইল), আইএফআইসি ব্যাংক
২০. গীতাঙ্ক দেবদীপ দত্ত, ডিএমডি ও চিফ বিজনেস অফিসার (করপোরেট), আইএফআইসি ব্যাংক
২১. মো. নুরুল হাসনাত, ডিএমডি ও চিফ অব আইটি, আইএফআইসি ব্যাংক
২২. মনিতুর রহমান, ডিএমডি ও চিফ ইনফরমেশন অফিসার, আইএফআইসি ব্যাংক
২৩. মোহাম্মদ শাহিন উদ্দিন, হেড অব ট্রেজারি, আইএফআইসি ব্যাংক
২৪. নাজিমুল হক, সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক ও এফভিপি (ধানমন্ডি শাখা), আইএফআইসি ব্যাংক
২৫. হোসাইন শাহ আলী, সাবেক ব্যবস্থাপক, আইএফআইসি ব্যাংক
২৬. সরদার মো. মমিনুল ইসলাম, রিলেশনশিপস ম্যানেজার, আইএফআইসি ব্যাংক
২৭. নিমাই কুমার সাহা, সিইও, সন্ধানী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি
২৮. মো. মিজানুর রহমান, কোম্পানি সেক্রেটারি, সন্ধানী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি
২৯. আয়েশা সিদ্দিকা, সাবেক কর্মকর্তা, আইএফআইসি ব্যাংক
৩০. সিলভিয়া চৌধুরী, সাবেক কর্মকর্তা, আইএফআইসি ব্যাংক

অভিযুক্তের অফিসে নীরবতার দেয়াল

এসব গুরুতর জালিয়াতি ও নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে বারবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে সরাসরি তার কার্যালয়ে গেলে ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দেন, ‘তিনি (সৈয়দ মনসুর মোস্তফা) এ বিষয়ে কোনো কথা বলবেন না।’

আরও পড়ুন : বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মোরশেদ আলমের শত শত কোটি টাকা পাচার

এমন চরম নীরবতা অপরাধের সত্যতাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে। হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ছায়াতলে থাকা এ এমডিকে অবিলম্বে অপসারণ না করলে ব্যাংকটি ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা।

আপন দেশ/এবি/এনএম

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়