ছবি: এআই জেনারেট
মো. আফজাল হোসেন। বেড়ে উঠা টাঙ্গাইল সদরের চৌবাড়িয়া গ্রামে। স্থানীয় এলাসিন তারক যোগেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে এইচএসসি এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ১৯৯৪ সালের ২৫ এপ্রিল সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড হয়ে যোগদান করেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে।
১৯৬৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিবৃতপল্লীতে জন্ম নেয়া এবং অন্যের বাসায় লজিং থাকা মেধাবী আফজাল হোসেন এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের শীর্ষ পদ মহাপরিচালক (ডিজি)। রেল ভবন থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়, পদ্মাসেতু থেকে দুদক পর্যন্ত- তিনি বহুল আলোচিত প্রকৌশলী।
আফজাল হোসেনকে নিয়ে ‘আপন দেশ’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি। একইসঙ্গে নাজনীন আরা কেয়া, শামীমা নাসরিন (বিথি), ফারহানা সুলতানাদের মতো আরও কয়েকজনের নাম ও ভূমিকা মিলেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের মন্ত্রী, আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তির যোগসাজশের তথ্যও মিলেছে গভীর তালাশে। চার পর্বের প্রতিবেদনের আজকের পর্ব ‘শেখ রেহানার আফজাল এখন শেখ রবির রেলের ডিজি’।
পানি উন্নয়ন বোর্ডে স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেন প্রকৌশলী আফজাল। এরপর যোগদান করেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে। দুর্নীতির হাতেখড়ি তখন থেকেই। কালো বিড়ালের বিচরণক্ষেত্র রেলওয়েতে বিস্তৃত হয় তার অপকর্মপরিধি। ধাপে ধাপে পদ বাগিয়েছেন, তবে পদ্মা সেতুর পিডি হবার আগেই তিনি নানা ইস্যুতে সমালোচিত।
আরও পড়ুন<<>> ইউনিফাইড টোল সিস্টেমে রেগনামের ডিজিটাল চুরি হাজার কোটি
শেখ হাসিনা শাসনামলে দেশের টাকায় নির্মিত পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ প্রকল্পের পিডি ছিলেন আফজাল। তখন থেকেই এ আফজাল হোসেন শেখ পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী না হয়েও ‘পাওয়ারফুল ওম্যান’ শেখ রেহানার ‘কালেক্টর’ বনে যান। আফজাল হোসেন তার ফরিদপুরের শ্বশুরকূলের আত্মীয়, কথিত শ্যালিকাসহ পছন্দের নারী কর্মকর্তাদের পদায়ন করে তারই নিয়ন্ত্রণাধীণ প্রকল্পে। এরপর থেকে আসল-নকল কাগজে পদ্মা সেতুতে বরাদ্দের কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে তা দিয়েছেন রেহানার কোষাগারে। নিজের আখের গুছানোতে মনোযোগী ছিলেন তারও আগে থেকেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার মেন্টর শেখ রেহানা পলায়ন করলেও গরম হাওয়া লাগেনি ম্যানেজ মাস্টার আফজালের গায়ে। হাওয়া বুঝে ছাতা ঘুরিয়ে ধরেন ড. ইউনূস সরকারের দাপিয়ে বেড়ানো দুই সমন্বয়মুখী।
প্রথমে আফজালের কর্মে তেলে-বেগুনে জ্বলেছিলেন রেলমন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। সে পরিস্থিতি অনুকূলে নিতে আফজালকে সহযোগিতা করেছেন চার সমন্বয়কের একজন যিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। রহস্যের তাবিজে কিছুদিনের মধ্যেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরেযান উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। প্রথমে যত গরম হয়েছিলেন, পরে তত শীতল হন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। যাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ, তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে বিভিন্ন সেক্টরে।
আরও পড়ুন<<>> বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মোরশেদ আলমের শত শত কোটি টাকা পাচার
২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশে উপসচিব উজ্জ্বল কুমার ঘোষের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
রেলের যে কয়েকজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন, তার মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন মো. আফজাল হোসেন। তার সিনিয়র মার্কেটিং অ্যান্ড করপোরেট প্ল্যানিং বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পার্থ সরকার, ট্রেনিং অ্যাকাডেমির প্রধান কর্মকর্তা এস এম সলিমুল্লাহ ওরফে বাহার এবং রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) আহমেদ মাহবুব চৌধুরীদের ডিঙিয়ে ডিজি করা হয়েছে তাকে। তখনই রেলওয়েসহ মন্ত্রণালয়ে চাউর হয় ‘চড়া দামে বিক্রি’ হলো ডিজি পদটি। আর তাতে খরিদদার মো. আফজাল হোসেন। মধ্যস্থতায় ছিলেন ড. ইউনূস সরকারের আমলের প্রভাবশালী দুই সমন্বয়ক ও একজন আমলা। এরপর থেকে আর কোনো সমস্যা হয়নি এ প্রকৌশলীর।
বর্ণিত সময়ে যমুনা রেলওয়ে সেতু ডাবল লাইনের সমান্তরাল সেতু হিসেবে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে আধুনিকায়ন। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ-চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইনটি পুরোপুরি সচল করা, রেলওয়ে লাইন উন্নয়ন (পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চল) ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনর্বাসন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়), লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহ করাসহ বহু কাজ হয়েছে টেন্ডারে। প্রায় ৫৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার কাজের বেশিরভাগই হয়েছে এবং হচ্ছে আফজালের টেবিলে ঘুরা ফাইলের মাধ্যমে।
রেলের পিয়ন থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত জানেন, ডিজির আফজালের পিসি ৫%। এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে বেনামী যৌথ ব্যবসা।
টাঙ্গাইলের নিরেট পল্লীতে অন্যের বাসায় লজিং থেকে পড়ালেখা করা আফজাল হোসেন এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। ঝামেলা এড়াতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের নাম। গ্রামের বাড়িতে দুর্নীতির নিশানা না থাকলেও রাজধানীর বনানীতে কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। দেশে দুর্নীতির টাকা পাচার করেছেন অস্ট্রেলিয়াতে। সেখানে কেনা বাড়িসহ রয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে তার সম্পদের খোঁজে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আরও পড়ুন<<>> ‘দুদকের সততা, আজিজীর বহুতল ভবন’
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। রেলমন্ত্রী নিযুক্ত হন শেখ রবিউল ইসলাম রবি। মন্ত্রীপরিষদ গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকৌশলী আফজাল হোসেন নতুন বন্দোবস্ত করেন বিএনপির শেখের সঙ্গে। চাহিদা মিটিয়ে ডিজি পদে বহাল রয়েছেন শেখ রেহানার আফজাল। এরপর থেকে নির্বিঘ্নে চলছে লেনদেন। টেন্ডারের পিসি ও বাটোয়ারা যাচ্ছে নয়া শেল্টারদাতার ফান্ডে। শেখ হাসিনার আমলে কাজপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের যারা পলাতক তাদের কাজ ওঠানো হচ্ছে বিএনপির ঠিকাদারদের মাধ্যমে। মধ্যস্থতা করছেন প্রকৌশলী আফজাল। শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠজন আফজাল হোসেন দায়িত্বে থাকায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের ঠিকাদাররা এখন স্বস্তিতে।
ওদিকে, দুদকে চলমান নথি লাল ফিতায় বেধে ফেলেছেন ম্যানেজ মাস্টার আফজাল। দেশ-বিদেশে গড়া সম্পদের পাহাড়ে কোনো আঁচড় পড়ছে না। দুদকের জনৈক কর্মকর্তার আশীর্বাদে নির্ভার রেলের এ শীর্ষ কর্মকর্তা।
পদ্মা সেতুর রেল প্রকল্পের পিডি থাকাকালে উল্লিখিত নারী কর্মকর্তারা ও নথিপত্র জালকারীরাও স্বস্তিতে চাকরি করছেন। অডিট আপত্তিদানকারী কর্মকর্তাদেরও সামলে নিয়েছেন তিনি। বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী ঠিকাদাররা সব ধরনের শেল্টার দিচ্ছেন রেলমন্ত্রীর সুনজরের বদৌলতে।
বিস্তর দুর্নীতির আংশিক অভিযোগ বিষয়ে মতামত জানতে প্রকৌশলী আফজালের অফিসিয়াল নম্বরে ফোন করা হলে তার সহকারী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘স্যার ব্যস্ত, পরে ফোন দিন।’
এরপর দফায় দফায় ফোন করা হয়। তার সাক্ষাৎ চাওয়া হলেও জবাব আসে, ‘স্যার ব্যস্ত, মিটিংয়ে আছেন।’ এ ছাড়াও নির্দিষ্ট সময়ে রেলভবনে গেলে একই উত্তর আসে, ‘স্যার ব্যস্ত, মিটিংয়ে আছেন।’
পরের পর্ব জানতে আপন দেশ-এর সঙ্গে থাকুন।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।



































