Apan Desh | আপন দেশ

‘দুদকের সততা, আজিজীর বহুতল ভবন’

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৯:০১, ৫ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ১৯:১৩, ৫ মার্চ ২০২৬

‘দুদকের সততা, আজিজীর বহুতল ভবন’

মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবর আজিজী ও ‘আজিজী টাওয়ার’।

ছোট শহর চাপাইনবাবগঞ্জ- যেখানে আকাশছোঁয়া ভবন নেই, ঝকঝকে কর্পোরেট নেই, আর কোলাহল বলতে মাত্র কিছু রিকশা আর ধীরগতির গাড়ি। শহরটা শান্ত, নিরীহ, কিন্তু চোখে পড়ার মতো সরল জীবনযাত্রা আছে। দুই-তিনতলা বাসাবাড়ি, সাদামাটা দোকানপাট, মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ- সবকিছুতেই স্পষ্ট মফস্বলী সরলতা। পথঘাটে মানুষের চলাচল সীমিত, শহর যেন নিজের ছন্দেই ধীরস্থিরভাবে বয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এ নিরীহ শহরের বুকেই হঠাৎ ধাক্কা দিয়েছে এক আধুনিক বৈপরীত্য। শহরের প্রাণকেন্দ্র বড় ইন্দারার মোড়, যেখানে ভিড় জমে এবং স্থানীয়রা এটিকে ‘জমজমাট’ এলাকা মনে করে, সে মোড়ের পাশেই দাঁড়িয়েছে সোনালী ব্যাংকের গলি। সাধারণ দোতলা-তিনতলা ভবনের মাঝে হঠাৎ মাথা তুলেছে এক উচ্চাভিলাষী বহুতল। পাঁচতলা পর্যন্ত নির্মাণ শেষ হলেও লক্ষ্য ১০ তলা। ঝকঝকে এসকেলেটর, আধুনিক লিফট, ভারবাহী কার্গোলিফট, শতাধিক গাড়ির পার্কিং- সব মিলিয়ে মফস্বল শহরের ভেতরে হঠাৎ গড়ে উঠেছে এক তথাকথিত আধুনিক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য। স্থানীয়রা বিস্ময় মিশ্রিত কৌতূহলে তাকিয়ে থাকে- এমন টাওয়ার কি সত্যিই এই ছোট শহরের মফস্বল জীবনধারার সাথে খাপ খায়? ওই বহুতল ভবনের নাম ‘আজিজী টাওয়ার’। আর এর মালিক সাবেক কমিশনার (তদন্ত), দুর্নীতি দমন কমিশনের সদ্যপদত্যাগকারী কর্মকর্তা মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবর আজিজী।

আরও পড়ুন<<>> দৈনিক দেড়টাকা বেতনের ব্যাটারি লোকমান এখন হাজার কোটি টাকার মালিক

আজিজীর পারিবারিক পরিচয়ও আলোচিত। তিনি চাপাইনবাবগঞ্জ শহরের শাহজাহান আলী মিঞা ওরফে পচু হাজীর পুত্র। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শাহজাহান আলী মিঞা ছিলেন সুফি সাধক হযরত শাহ নেয়ামতুল্লাহর (র.) নবম উত্তরাধিকার। এ ঐতিহ্যবাহী বংশপরিচয়কে সামনে রেখে নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দিতেন আজিজী।

সূত্র বলছে, এ সামাজিক ও পারিবারিক পরিচয় তাকে এক ধরনের ‘ভদ্র’, ‘বিনয়ী’ ও ‘মার্জিত’ ব্যক্তিত্বের আবরণ এনে দিয়েছিল। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-ও তার নিয়োগে আপত্তি জানাননি বলেই আলোচনা রয়েছে।

পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন বিচার বিভাগের ৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা এবং পরে জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে সমালোচকদের মতে, কর্মজীবনে রাজনৈতিক আনুগত্যের হিসাব-নিকাশও তিনি দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন।

২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সিকদার গ্রুপ-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা আইনি বিষয়ে লুটপাটের অভিযোগে আলোচিত ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড-এর লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই বদলে যায় তার অবস্থান। অনেকের ভাষায়, ‘মুহূর্তেই বদলে ফেলেন রাজনৈতিক অবস্থান’- পুরনো আনুগত্য ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক চেতনার পতাকাবাহী হয়ে ওঠেন তিনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কৌশলী প্রক্রিয়ায় জায়গা করে নেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার (তদন্ত) পদে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় বিতর্কের শুরু এখানেই।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি যখন দুদক কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান, তখনও তিনি ছিলেন ঋণখেলাপি। ‘আজিজী টাওয়ার’ প্রকল্পের বিপরীতে ন্যাশনাল ব্যাংকের রাজশাহী শাখা থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সে ঋণ ক্লাসিফায়েড বা খেলাপি হয়ে যায়।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি ১০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য ব্যাংক থেকে ১২ কোটি টাকার হাউজিং ঋণ অনুমোদন পান। কিন্তু কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সুদসহ তার মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭ কোটি ১৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকারও বেশি। ফলে তিনি ঋণখেলাপিতে পরিণত হন।

চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি দুদকের কমিশনার হওয়ার যোগ্য নন। কিন্তু সব বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করেই ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তাকে।

আরও বিস্ময়কর বিষয়- নিয়োগের মাত্র ১৬ দিনের মাথায় ২৬ ডিসেম্বর তার খেলাপি ঋণ রহস্যজনকভাবে পুনঃতফসিল হয়ে যায়। ফলে তিনি দ্রুতই খেলাপি তকমা থেকে মুক্তি পান।

এ সময় আবার ন্যাশনাল ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ পাচার ও লোপাট সংক্রান্ত তদন্তের নথিও তার অধীনেই ছিল। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না- এ প্রশ্নও উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

অভিযোগ রয়েছে, দুদকের কমিশনার থাকা অবস্থায় তার অনুমোদনে বহু মামলার তদন্ত হয়েছে। কিন্তু অনেক এজাহারভুক্ত আসামির নাম চার্জশিট থেকে বাদ পড়ে যায়। আবার কিছু প্রভাবশালী অভিযুক্তকে গ্রেফতার না করেও দীর্ঘদিন ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন<<>> বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মোরশেদ আলমের শত শত কোটি টাকা পাচার

স্বাস্থ্যখাতের আলোচিত ব্যক্তি মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু গ্রেফতার হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, তার জামিন বাতিলের ব্যাপারেও কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে সমঝোতার ভিত্তিতে চার্জশিট পর্যায় থেকে দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে অভিনব কৌশলে অর্থ আদায়েরও।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা এক অভিযোগে বলা হয়েছে, শিবগঞ্জের শাহ নেয়ামতউল্লাহ মাজার কমপ্লেক্স-এর নামে অনুদান সংগ্রহ করা হতো। সেখানে একটি এতিমখানা ও মাদ্রাসা রয়েছে। আজিজীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মনিরুল ইসলাম- যিনি নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে পরিচয় দেন- তার মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ নেয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

একটি গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকের কাছ থেকে মামলায় খালাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এতিমখানার নামে প্রায় ১৬ কোটি টাকা অনুদান নেয়ার অভিযোগও উঠেছে। এদিকে গত ৩ মার্চ পদত্যাগের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।

বৃহস্পতিবার (০৫ মার্চ) বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে ‘আজিজী টাওয়ার’ প্রকল্পের স্পেস বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মনিরুল ইসলামের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

চাপাইনবাবগঞ্জের শান্ত শহরের বুকেই তাই এখন দাঁড়িয়ে আছে এক তীব্র বৈপরীত্য- একদিকে সাধারণ মানুষের সাদামাটা জীবন, অন্যদিকে বিতর্কে ঘেরা এক বহুতল সাম্রাজ্য। আর সে দৃশ্য দেখে অনেকের মুখে এখন ঘুরে বেড়ায় এক তির্যক বাক্য- ‘দুদকের সততা, আজিজীর বহুতল’

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়