ছবি: আপন দেশ
দুই দশকের প্রতীক্ষা, টানাপোড়েনময় রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং অনিশ্চয়তায় ঘেরা সময় পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আবারও সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। এ ফলাফল দেশের রাজনৈতিক ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে- যা একদিকে পরিবর্তনের প্রত্যাশা জাগাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্র তৈরি করছে।
এ নির্বাচনী সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করলেও তার নেতৃত্ব এখন কেবল পারিবারিক ধারাবাহিকতার প্রতীক নয়; বরং সাংগঠনিক পুনর্গঠন, কৌশলগত পুনরুত্থান এবং জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক ভাষ্যের এক নতুন পরীক্ষামূলক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাসজীবন শেষে দেশে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপস্থিতি এক আবেগঘন ও নাটকীয় মাত্রা পায়। ব্যক্তিগত শোক-মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু-তার প্রত্যাবর্তনের পরপরই তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। তবে এ বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল না করে বরং আরও দৃঢ় ও দায়িত্বশীল করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সীমিত সময়ের মধ্যে তৃণমূল সংগঠন পুনরুজ্জীবিত করা, নির্বাচনী কৌশল পুনর্গঠন এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রচেষ্টা বিএনপির পুনরুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে পারিবারিক ধারাবাহিকতা নতুন নয়- ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবার, পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবার কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি পরিবার তার উদাহরণ। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারভিত্তিক নেতৃত্বকে একদিকে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতার চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিশ্লেষণ করা হয়। তারেক রহমানের উত্থান এ দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই অবস্থান করছে- যেখানে আবেগ, ঐতিহ্য, জনসমর্থন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একসঙ্গে মূল্যায়নের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে দুই প্রভাবশালী নারী নেতা- খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা- কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন। তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে একই সঙ্গে শক্তিশালী ও মেরুকৃত করেছে। এ দীর্ঘ অধ্যায়ের পর নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব অনেকের কাছে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের স্বাভাবিক ধাপ হিসেবে প্রতীয়মান হলেও, এর সাফল্য নির্ভর করবে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের ওপর।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রশাসনিক সংস্কার, রাজনৈতিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়। এ প্রক্রিয়াকে অনেক বিশ্লেষক দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক রূপান্তর কিংবা পূর্ব ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করছেন- যেখানে অন্তর্বর্তী কাঠামো গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছে।

নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা জনমতের একটি শক্তিশালী প্রতিফলন হিসেবে দেখা হলেও বিরোধী শক্তির উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসা সংসদীয় ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বহুদলীয় অংশগ্রহণ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিজয় গণতান্ত্রিক বহুমাত্রিকতার ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
তারেক রহমানের একাধিক আসনে বিজয় তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এ জনসমর্থন এখন বাস্তব শাসনক্ষমতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়। সংসদীয় গণতন্ত্রে কার্যকর বিরোধী দলের উপস্থিতি, নীতি-নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা- এসবই নতুন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আন্দোলন, সামরিক শাসন, গণআন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জটিল ও আবেগঘন ধারায় গড়ে উঠেছে। এ ইতিহাস একদিকে গৌরবময়, অন্যদিকে সতর্কতামূলক। নতুন নেতৃত্বের সামনে তাই শুধু ক্ষমতা গ্রহণ নয়; বরং আস্থার সংকট কাটানো, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রতিষ্ঠার কঠিন দায়িত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশ আজ এক সংবেদনশীল কিন্তু সম্ভাবনাময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনমনে আশার আলো যেমন উজ্জ্বল, তেমনি রয়েছে সতর্ক প্রত্যাশা ও বাস্তবসম্মত সংশয়। সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, দুর্নীতিনিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা- এসব লক্ষ্য পূরণে নতুন সরকারের সাফল্যই নির্ধারণ করবে এ পরিবর্তন কতটা স্থায়ী ও ফলপ্রসূ হবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক নতুন ভোরের দ্বারপ্রান্তে- যেখানে আবেগ, ইতিহাস, প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার জটিল সংমিশ্রণ ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণ করবে। এ পথচলা কতটা আলোকোজ্জ্বল হবে, তা নির্ভর করবে নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































