Apan Desh | আপন দেশ

‘জান্নাতের টিকিট’ দাঁড়িপাল্লায় বনাম তারেক রহমানের ‘নাউযুবিল্লাহ’

বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:৫৫, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ২১:০১, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

‘জান্নাতের টিকিট’ দাঁড়িপাল্লায় বনাম তারেক রহমানের ‘নাউযুবিল্লাহ’

প্রতীকী ছবি

বহুকাল পর ফের প্রতিযোগিতামুলক জাতীয় নির্বাচনে ফিরলো দেশ। আর নির্বাচন সামনে আসতেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ‘জান্নাতের টিকিট’, ‘বিকাশ নম্বর’ ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ (এনআইডিকার্ড)- এ তিন বিষয় ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন গড়িয়েছে ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অবস্থানের মুখোমুখি সংঘাতে। এর কেন্দ্রে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উচ্চারিত এক শব্দ- ‘নাউযুবিল্লাহ’।

বিতর্কের সূত্রপাত জামায়াতে ইসলামীর জনসংযোগকালে দুনিয়া ও আখেরাতের প্রতিশ্রুতি থেকে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, একটি রাজনৈতিক দল ভোটের আগে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। অভিযোগটি সরাসরি জামায়াতের দিকেই ইঙ্গিত করে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। মির্জা ফখরুলের মতে, নির্বাচনী প্রচারণার আড়ালে এভাবে ব্যক্তিগত তথ্য নেয়া নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি নাগরিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ভাইলারও হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটেই সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে এক সমাবেশে কড়া ভাষায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, জান্নাতের মালিক একমাত্র আল্লাহ। সেই জান্নাতের গ্যারান্টি মানুষ বা কোনো রাজনৈতিক দল দিতে চাইলে তা শিরকের শামিল। মুসলমানদের শিরকির পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে- এ কথা বলেই তিনি উচ্চারণ করেন ‘নাউযুবিল্লাহ’। তারেক রহমানের এ বক্তব্য সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ সাদরে গ্রহণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনা মহলে অনেকেই মনে করছেন, ধর্মীয় বিশ্বাসকে ভোটের হাতিয়ার বানানোর প্রবণতার বিরুদ্ধে তিনি সাহসী ও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নতুন কিছু নয়- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সমালোচকদের মতে, নির্বাচন এলেই ধর্মের নামে ‘ব্যবসা’ শুরু করে দলটি। জান্নাত, নেকি, আখিরাত—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলে বলে অভিযোগ জামায়াতবিরোধীদের। এবারের বিতর্ক সেই অভিযোগকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

এদিকে জামায়াতের নায়েবে আমীর আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, বিকাশ নম্বর সংগ্রহের বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কি সরাসরি উপস্থিত ছিলেন? তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগের সরাসরি ব্যাখ্যা না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলায় সন্দেহ কাটেনি।

এ বিতর্কের পেছনে রয়েছে আরও গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকা আজও অস্বীকার করা যায় না। যুদ্ধাপরাধের দায়ে হাফ ডজনের বেশি জামায়াত নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার আমলে। সে সময় সুশীল সমাজ বারবার জাতির কাছে জামায়াতের ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু জামায়াত আজও ১৯৭১-এর দায় স্বীকার করতে নারাজ। বরং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে সামনে এনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আড়াল করার চেষ্টা করছে- এমন অভিযোগ উঠেছে।

রাজনীতির আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো- যে বিএনপি একসময় জোটসঙ্গী হিসেবে জামায়াতকে সরকারে এনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দিয়েছিল, আজ সেই জামায়াতই বিএনপির মুখোমুখি অবস্থানে। একসময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ এখন প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নিয়েছে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনও বিষয়টি আমলে নিয়েছে। কমিশনের এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার আড়ালে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন-২০১০ অনুযায়ী অন্যের এনআইডি সংগ্রহ বা বহন করা দণ্ডনীয় অপরাধ বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

সব মিলিয়ে জামায়াতে টিকিট ঘিরে বিতর্ক এবং তারেক রহমানের ‘নাউযুবিল্লাহ’ মন্তব্য রাজনীতিতে ধর্ম, ইতিহাস ও নৈতিকতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে- এ সংঘাত কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি আদর্শ ও অবস্থানের লড়াইও।

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়