প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘ওলি বার বার ফিরে যায়’। প্রেম, বেদনা ও প্রত্যাশার এক অনবদ্য সংমিশ্রণ এ গানটি, যা আমাদের হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয়। তেমনই উল্টো নাড়া দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের একটি ঘটনা। এ অধিদফতরের এক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বারবার ফিরে আসে একই চেয়ারে। চেয়ারটি হলো এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদের। আর ঘুরেফিরে আসার কর্মকর্তার নাম প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ।
আওয়ামী লীগ সরকার দিয়ে তার দুর্নীতির শুরু। ওই দলটি নিষিদ্ধ হলেও রশিদের কদর কমেনি। আন্দোলনের ফলে আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এ বিভাগের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ভূইয়া সজিবের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। তাই চেয়ারে ধাক্কা পড়েনি। নির্বাচনের মাধ্যমে ওই সরকারেরও বিদায় হলো কিন্তু রশিদে আঁচড় পড়েনি। বরং চুক্তিভিত্তিক ফিরে এসেছেন ওই চেয়ারেই। শনিবার (২৮ মার্চ) এক আদেশে ওই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।
আরও পড়ুন<<>> দৈনিক দেড়টাকা বেতনের ব্যাটারি লোকমান এখন হাজার কোটি টাকার মালিক
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে মো. আব্দুর রশীদ মিয়ার নিয়োগ এবং মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সে নিয়োগ বাতিল- এ ঘটনা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তন নয়, বরং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ও বিপুল অর্থের জোরেই তিনি বারবার এ গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছেন।
গত ২৪ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে চুক্তিভিত্তিকভাবে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু মাত্র চার দিনের মাথায়, ২৮ মার্চ সেই নিয়োগ বাতিল করে সরকার। এত স্বল্প সময়ে নিয়োগ ও বাতিল- এটি প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
পুরোনো অভিযোগ, নতুন নিয়োগ
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সাল থেকেই মো. আব্দুর রশীদ মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান চলছিল। অভিযোগের মধ্যে ছিল অবৈধ সম্পদ অর্জন, প্রকল্পে অনিয়ম এবং পদোন্নতি বাণিজ্যের মতো গুরুতর বিষয়। এসব অভিযোগের তদন্ত শেষ না হলেও পরের বছরই তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান।
এখানেই শেষ নয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসানো হয়। তখনও তার বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবুও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়- যা নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন ওঠে।
টাকার জোরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
প্রশাসনের ভেতরে ও সংশ্লিষ্ট মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে- বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমেই তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব খাটাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যবহার করেছেন। এমনকি প্রধান প্রকৌশলীর পদে আসতে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে- এমন অভিযোগও প্রশাসনিক মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এলজিইডি একটি বড় বাজেটের সংস্থা। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্টসহ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় এ সংস্থার মাধ্যমে। ফলে প্রধান প্রকৌশলীর পদটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ। এ পদকে ঘিরে অর্থনৈতিক স্বার্থও বড় আকারের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ কারণেই এ পদে বারবার ফিরে আসার চেষ্টা ছিল আব্দুর রশীদ মিয়ার।
বারবার ফিরে আসার রহস্য কী
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বারবার পদোন্নতি পেয়েছেন, দায়িত্ব পেয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও পেয়েছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রশাসনের ভেতরে তার একটি শক্তিশালী লবিং ছিল, যা অর্থের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আপন দেশ’কে জানান, অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয় না। কিন্তু আব্দুর রশীদ মিয়ার ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে- নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল। কতো বড় হাত ছিল। এ আলোচনায় এসেছে একমাসের বর্তমান সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর নাম।
আরও পড়ুন<<>> ‘দুদকের সততা, আজিজীর বহুতল ভবন’
নিয়োগের পরপরই বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে অসন্তোষ দেখা দেয়। চলমান দুর্নীতির তদন্ত, সিনিয়র কর্মকর্তাদের আপত্তি এবং প্রশাসনিক মহলের সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত সরকার তার নিয়োগ বাতিল করে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিয়োগ দেয়ার সময় হয়তো বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি, কিন্তু পরে অভিযোগগুলো সামনে আসায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। বড় প্রশ্ন থেকে যায়। এ ঘটনাটি শুধু একজন কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল নয়, বরং সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন কর্মকর্তা বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে আসেন? বিপুল অর্থ ও প্রভাব কি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে? মন্ত্রণালয়, সচিবালয় এবং এলজিইডি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর আশির্বাদে এসেছিলেন আব্দুর রশিদ, গেলেন পূর্ণমন্ত্রীর ইচ্ছায়। শুধু অবগত হলেন-তাদের চেয়েও গুরু দায়িত্বপ্রাপ্তজন। আর তাতে দাগ পড়ল প্রথমবারেই চূড়ায় বসানো ওই প্রতিমন্ত্রীর গায়ে। পেলেন সতর্কবার্তাও।
মো. আব্দুর রশীদ মিয়ার আসা-যাওয়া তাই শুধু একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়- এটি প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যতদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হবে, ততদিন এমন বিতর্কিত প্রত্যাবর্তন বারবার ঘটতেই থাকবে।
দুদকে আব্দুর রশিদের দুর্নীতি
দুদক সূত্রে জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সাল থেকে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এর পরের বছর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান তিনি। অভিযোগের কোনও সুরাহা না হলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাকে চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী পদে বসায়। এরপর বর্তমান সরকার এসে তাকে আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি-বাণিজ্য এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন আব্দুর রশীদ মিয়া। তিনি এলজিইডির বিভিন্ন পদে থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকল্প বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং বরাদ্দের বড় অংশ তার ঘনিষ্ঠদের হাতে চলে যেতো।

রশীদ মিয়ার স্ত্রী ফাতিমা যাকিয়াহ ও আত্মীয়দের নামে পরিচালিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে কাজ পেয়েছে। অভিযোগ আছে, প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা, প্রতিযোগীদের তুলনায় তাদের বেশি অর্থ বরাদ্দ করা এবং সুনির্দিষ্ট ঠিকাদারি গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
এর আগেও তৃতীয় গ্রেডের এ কর্মকর্তাকে সিনিয়রিটি না মেনে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তবর্তী সরকার। বিতর্কিত এ কর্মকর্তার নিয়োগের বিষয় পুনর্বিবেচনা করার দাবি এলজিইডির সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর।
আরও পড়ুন<<>> সিটি ব্যাংক এমডি মুজিববাদী মাসরুর আরেফিন এখন ব্যাংকখাতের ভয়
দুদকের অভিযোগ থেকে আরও জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় আব্দুর রশীদ মিয়ার নামে একাধিক সম্পদ রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডিতে ছয়তলা বাড়ি এবং গুলশান, বনানী ও বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট এবং প্লট রয়েছে। রাজশাহীতে পাঁচ ও সাততলা দুটি বাড়ি এবং একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে তার নামে। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে ফুড গার্ডেন নামে ব্যবসা চালাচ্ছেন, পাশাপাশি বগুড়ার শেরপুর, হিমছায়াপুর ও শাহবন্দেগী ইউনিয়নে বিশাল জমি ও বাগানবাড়ি রয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এ সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য ৭০ কোটি টাকা। এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রার্থীপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ লেনদেনেরও অভিযোগ আছে।
এলজিইডির প্রশাসন ও ট্রেনিং বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রশীদ মিয়া প্রায় ৩০০ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ সম্পদের বড় অংশই তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও নিকটাত্মীয়দের নামে। অভিযোগের তদন্তের জন্য দুদক থেকে বারবার তাকে তলব করা হলেও হাজির হননি। প্রথমবার অসুস্থতা, পরেরবার বিদেশ সফর এবং আরও একবার অফিসের ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি নোটিসে সাড়া দেননি। দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু থেকেই আব্দুর রশীদ মিয়া অসহযোগিতা করছেন বলে জানিয়েছেন দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































