Apan Desh | আপন দেশ

ইউনিফাইড টোল সিস্টেমে রেগনামের ডিজিটাল চুরি হাজার কোটি

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৯:০৩, ১ মে ২০২৬

আপডেট: ১৯:১৮, ১ মে ২০২৬

ইউনিফাইড টোল সিস্টেমে রেগনামের ডিজিটাল চুরি হাজার কোটি

ছবি: আপন দেশ

দেশের সেতুগুলোতে টোল আদায়ের নামে যা চলছে, সেটাকে দুর্নীতি বললে কম বলা হয়-এটা সরাসরি সংগঠিত লুটপাট। দিনের আলোয়, সবার চোখের সামনে, সফটওয়্যার ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা উধাও করে দিচ্ছে একটি চক্র।

এ চক্রের কেন্দ্রে রয়েছে ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’- আর এর পেছনে রয়েছেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় বড় হওয়া ব্যাক্তি মোহাম্মদ হোসাইন জনি। তিনি এখন তারেক রহমানের সরকারের সড়ক ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ঘনিষ্ঠজনখ্যাত 

এ প্রতিষ্ঠানটি শুধু টোল আদায় করছে না- তারা টোলের হিসাবই বদলে দিচ্ছে। দেশের অন্তত ৬৭টি সেতুর টোল আদায় নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের সরবরাহ করা ইউনিফাইড টোল সিস্টেম। আর এ সিস্টেমটাই হয়ে উঠেছে চুরির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

অভিযোগ স্পষ্ট- গাড়ি পার হচ্ছে, টাকা নেয়া হচ্ছে, কিন্তু সে টাকার কোনো হিসাব নেই। ডাটা মুছে ফেলা হচ্ছে, ট্রানজেকশন গায়েব করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের অর্থ যেন একদল সফটওয়্যার-চালিত ডাকাতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

টেন্ডার ছাড়াই কাজ, চুক্তি ছাড়াই কোটি টাকার লেনদেন। সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে- এ প্রতিষ্ঠানটি কোনো নিয়ম মানেনি, মানতেও হয়নি। না কোনো টেন্ডার, না কোনো বৈধ চুক্তি- তারপরও বছরের পর বছর টোল আদায় করছে তারা।

এটা কীভাবে সম্ভব? উত্তর একটাই- রাজনৈতিক প্রভাব।

সাবেক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ হোসাইন জনি তার প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক সেতুর টোল আদায়ের কাজ বাগিয়ে নেয়। সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) এখানে ছিল শুধুই কাগজে- বাস্তবে সবকিছু হয়েছে ‘মুখের কথায়’।

২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল মেঘনা-গোমতী সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন চালু হয়। উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এ কার্যক্রম চালানোর জন্য ‘রেগনাম’-এর কোনো বৈধ কার্যাদেশই ছিল না। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো থেকে টাকা তোলা হচ্ছে সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিকভাবে- এটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটা পরিকল্পিত সুযোগ করে দেয়া।

সফটওয়্যার কারচুপির ভয়াবহ প্রমাণ

এ লুটপাট কাগজে-কলমে ধরা পড়ে না- কারণ সবকিছু হচ্ছে সফটওয়্যারের ভেতরে। ইউনিফাইড টোল সিস্টেম ব্যবহার করে গাড়ির তথ্য, লেনদেন, ট্রানজেকশন নম্বর- সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে ‘রেগনাম’।

একটি উদাহরণই পুরো চিত্র পরিষ্কার করে দেয়- ১৭ মার্চ, স্থান- মেঘনা-গোমতী সেতু। সময়: দুপুর ১২টা ১০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ০৩ মিনিট। এ ৫৩ মিনিটের মোট গাড়ি চলে ৩২টি। কিন্তু রেকর্ডে টোল দেখানো হয়েছে ১২টি গাড়ির। আর গায়েব করা হয়েছে ২০টি গাড়ির টোল। এ ২০টি গাড়ির কোনো ট্রানজেকশন নম্বর নেই। অর্থাৎ সিস্টেম থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।

উল্লিখিত ৫৩ মিনিটেই প্রায় ১২ হাজার ৭১৮ টাকা উধাও।

একই দিন রাত তখন ১১টা ২০ মিনিট থেকে ১১টা ৫০ মিনিট। গাড়ি পার হয়েছে ৩৪টি। গায়েব ট্রানজেকশন ২২টি। আর টাকা উধাও ১০ হাজার ২৭৪ টাকা। মাত্র একদিনে, দুই লেনে, প্রায় ২৩ হাজার টাকা গায়েব।

এটা যদি ৬৭টি সেতুতে, প্রতিদিন, বছরের পর বছর চলে- তাহলে কত টাকা গেছে? হিসাবটা ভয়ংকর।

কোটি টাকার টোল, কয়েকগুণ বেশি চুরি

সরকারি হিসাবে পদ্মা, যমুনা, মোক্তারপুর- ৩টি সেতুতে টোল আদায় হয় ১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা (২০২৩-২৪)। মেঘনা-গোমতী সেতুতে বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু বাস্তবতা কী ঘটেছে তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- এ অংক শুধু ‘দেখানো’ হিসাব। প্রকৃত আদায় এর কয়েকগুণ বেশি। আর সে অতিরিক্ত অংশই গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, সীতাকুণ্ড, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, নরসিংদীর চরসিন্দুর, কুমারখালীসহ সব জায়গায় একই প্যাটার্ন। ক্যামেরা বন্ধ, ডাটা মুছে ফেলা হয়েছে, টাকা উধাও। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না- এটা একটা সুসংগঠিত, বহুস্তরবিশিষ্ট লুটপাট মেশিন।

চরসিন্দু টোল প্লাজা। ইনসেটে রেগনাম ও জনি। ছবি সংগ্রহীত

প্রশাসন জড়িত না থাকলে এটা অসম্ভব

এ ধরনের অপারেশন একা কোনো কোম্পানি চালাতে পারে না। এখানে স্পষ্টভাবেই প্রশাসনের ভেতরের কিছু লোক জড়িত। অভিযোগ আছে- সড়ক ও সেতু বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের হাত করে এ চক্র কাজ করছে। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া বছরের পর বছর এভাবে কোটি কোটি টাকা গায়েব করা সম্ভব না। আর এখানেই আসে রাজনৈতিক সুরক্ষা।

ক্ষমতা বদলেছে, লুটপাটের মালিক বদলায়নি। পলাতক ওবায়দুল কাদের দেশ ছেড়েছেন- কিন্তু তার তৈরি করা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক দিব্যি চলছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ড. ইউনূস সরকারের সময় অভিযোগ উঠেছে সড়ক ও সেতু বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে চুরির টাকার ভাগবাটোয়ারা হতো।

তারপর আসে নতুন সরকার। দায়িত্ব নেন শেখ রবিউল আলম। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা কী? টোলদাতারা বলছে- ‘সব আগের মতোই আছে। শুধু নাম বদলেছে। আগে ছিল ওবায়দুল কাদের, এখন শেখ রবিউল ইসলাম।’

ক্ষমতা বদলালেই যদি লুটেরাদের নেটওয়ার্ক টিকে থাকে, তাহলে সেটা শুধু দুর্নীতি না- এটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে গড়ে ওঠা এক ধরনের অপরাধী সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেট খুব দ্রুত নিজেদের রঙ বদলায়, নতুন ক্ষমতার সঙ্গে খাপ খায়, আর আগের মতোই টাকা লুটতে থাকে।

কোম্পানির ভেতরের রহস্য

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:-এর জয়েন্ট স্টকে নিবন্ধিত একটি কোম্পানি বটে। তবে এটি মোহাম্মদ হোসেন জনির মালিকানাধীন একটি বেনামি প্রতিষ্ঠান। রেকর্ডপত্রে কখনো প্রতিষ্ঠানটির ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ দেখানো হয়েছে স্ত্রী শাহনাজ বেগম মিতুকে। কখনো তাকে রাখা হয়েছে রেগনামের ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে। যেখানে শাহনাজ বেগম মিতু এটির ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ সেখানে মোহাম্মদ হোসেন জনির নাম উল্লেখ রয়েছে ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে। আর যেখানে স্ত্রী ‘চেয়ারম্যান’ সেখানে মোহাম্মদ হোসেন জনি নিজেকে দাবি করেছেন ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’।

তবে প্রতিটি সংশোধনীতে ছেলে সাদমান সাকিফকে রাখা হয়েছে ‘ডিরেক্টর’ হিসেবে। নিবন্ধিত ‘রেগনাম রিসোর্স লিমিটেড’-এর ঠিকানা দেখানো হয়েছে, ‘রহমানস রেগনাম সেন্টার’, ১৯১/বি, তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোড, ঢাকা-১২০৮। যাতে শাহনাজ বেগম মিতুর টিআইএন নম্বর-০৭৭-১০৬-৬২৬১, সার্কেল-২৩ উল্লেখ রযেছে। তার এনআইডি নম্বর: ২৬১১৮৮৪৫৩৫৭৬৭। পেশা উল্লেখ করা হয়েছে ‘ব্যবসায়ী’।

বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মোরশেদ আলমের শত শত কোটি টাকা পাচার

রেগনামের ১৫ হাজার শেয়ারের মধ্যে ৯ হাজার শেয়ার রয়েছে শাহনাজ বেগম মিতুর নামে। পুত্র সাদমান সাকিফের রয়েছে ছয় হাজার শেয়ার। সাদমানের টিআইএন নম্বর-০৭৭-১১০-৪৯৭৫। করাঞ্চল-২৩। তার কোনো এনআইডি নেই। পাসপোর্ট নম্বর-কিউ-০১৫১৪৯২। মোহাম্মদ হোসেন জনির ছেলের সাদমান সাকিফের ‘পেশা’র ঘরটি ফাঁকা। প্রতিষ্ঠানটির অথোরাইজ ক্যাপিটাল ধরা হয়েছে তিন কোটি টাকা। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- সর্বত্রই মোহাম্মদ হোসেন জনির টিআইএন নম্বর, ফোন নম্বর, এনআইডি নম্বর গোপন রাখা হয়েছে।

‘রেগনাম রিসোর্স লিমিটেড’-এর অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ হোসেন জনির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কোনো জবাব মিলেনি। 

অডিট ছাড়া সত্য বের হবে না

আইটি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ চুরির প্রকৃত পরিমাণ বের করতে হলে আন্তর্জাতিক মানের অডিট লাগবে। কারণ- ডাটা ডিলিট করা হয়েছে, সার্ভার লগ পরিবর্তন করা হয়েছে, ভিডিও ফুটেজ পর্যন্ত গায়েব করা হয়েছে। এটা সাধারণ দুর্নীতি না- এটা ডিজিটাল ফরেনসিক লেভেলের অপরাধ। যেমনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরি হয়েছিল। 

পলাতক ওবায়দুল কাদের দেশ ছেড়েছেন, কিন্তু তার দুর্নীতির প্রকল্প থেমে নেই। তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে চুরি, ডাকাতি, লুটপাট অব্যাহত আছে। ৫ আগস্টের পর ড. ইউনূস সরকারের সময়ও এ টোল লুটপাটে বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেন শেখ রবিউল আলম- কিন্তু অভিযোগ, শুধু গ্রহীতা বদলেছে, লুটপাটের ধরণ বদলায়নি।

ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে এ চক্র নতুন করে যোগাযোগ করে, নিজেদের অবস্থান ঠিক করে নেয়, এবং আগের মতোই টোল আদায়ের নামে টাকা লোপাট করতে থাকে। টোলদাতা ও স্থানীয়দের ভাষায়- সেতু, টোল প্লাজা, সফটওয়্যার, অপারেটর- সবই একই আছে; শুধু নাম পাল্টেছে। আগে ছিল ওবায়দুল কাদের, এখন শেখ রবিউল আলম। একজনের দুর্নীতির উত্তরসূরি যেন আরেকজন হয়ে উঠেছেন।

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়