ফাইল ছবি
রমজান মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এ মাসে ফরজ রোজার পাশাপাশি যে নফল ইবাদতটি মুসলিম উম্মাহ অত্যন্ত আগ্রহ ও গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করেন, তা হলো তারাবির নামাজ। তারাবির নামাজ রমজানের রাতগুলোকে আলোকিত করে, ইমানকে মজবুত করে, বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়তা করে এবং গুনাহ মাফের সহায়ক হয়। শরিয়তে তারাবির গুরুত্ব ও ফজিলত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।
তারাবির পরিচয় ও অর্থ : ‘তারাবি’ শব্দটি আরবি ‘তারবিহা’ থেকে উদ্ভূত, এর অর্থ বিশ্রাম নেয়া। তারাবির নামাজ দীর্ঘ কেরাতের সঙ্গে আদায় করা হয় বলে প্রতি চার রাকাত পর পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়া হয়, এ কারণেই এ নামাজকে তারাবি বলা হয়। রমজান মাসে এশার নামাজের পর জামাতের সঙ্গে তারাবি আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
কোরআনে রাতের নামাজের গুরুত্ব : যদিও কোরআনে সরাসরি ‘তারাবি’ শব্দটি উল্লেখ নেই, তবে রমজান ও রাতের ইবাদতের গুরুত্ব বহু আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, হে চাদরাবৃত! তুমি রাতে দাঁড়াও, অল্প অংশ ছাড়া। (সুরা মুজ্জাম্মিল ১-২) এ আয়াত রাতের ইবাদতের গুরুত্ব তুলে ধরে। তারাবি মূলত রাতের নামাজেরই একটি বিশেষ রূপ, যা রমজান মাসে সম্মিলিতভাবে আদায় করা হয়। কোরআনের এ নির্দেশনা তারাবির ফজিলতের ভিত্তি তৈরি করে।
অপর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে, তারা তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে। (সুরা সাজদা ১৬) তারাবির নামাজ আদায়কারীরা এ আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যারা আরাম ও ঘুম ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রাত জেগে তারাবির নামাজ পড়ে।
হাদিসে তারাবির ফজিলত : রমজানে রাতের ইবাদত সম্পর্কে হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে (কিয়ামে রমজান) দাঁড়াল, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এ হাদিসে ‘কিয়ামে রমজান’ বলতে তারাবি নামাজকেই বোঝানো হয়েছে। এখানে গুনাহ মাফের সুসংবাদ তারাবির সর্বোচ্চ ফজিলত প্রমাণ করে।
সাহাবিদের যুগে তারাবি : প্রথম দিকে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েক রাত সাহাবিদের নিয়ে জামাতে তারাবি আদায় করেন। পরে উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি নিয়মিত জামাতে আদায় বন্ধ রাখেন। তার ওফাতের পর খলিফা হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহাবিদের এক ইমামের পেছনে একত্রিত করেন এবং এটিকে সুসংগঠিত রূপ দেন। তিনি বলেছিলেন, এটি উত্তম ব্যবস্থা। এ থেকে বোঝা যায়, তারাবি জামাতে আদায় করা সাহাবিদের সম্মিলিত আমল দ্বারা প্রমাণিত।
আরও পড়ুন<<>>এ বছর সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০ টাকা, সর্বোচ্চ ২৮০৫ টাকা
তারাবি ও কোরআনের সম্পর্ক : তারাবি নামাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত। অনেক মসজিদে পুরো রমজান মাসে সম্পূর্ণ কোরআন খতম করা হয়। এতে মুসল্লিরা নামাজের মধ্যেই কোরআনের পূর্ণ শিক্ষা ও উপদেশ শ্রবণ করার সুযোগ পান। কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের জন্য তারাবি এক অনন্য মাধ্যম।
ইমান ও তাকওয়া বৃদ্ধিতে তারাবি : তারাবির নামাজ ইমানকে সতেজ করে এবং তাকওয়া অর্জনে সহায়ক হয়। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর সামনে কোরআনের আয়াত শোনা ও পড়ার বিষয়টি বান্দার অন্তরকে নরম করে দেয়। গুনাহের প্রতি ঘৃণা ও নেক আমলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। রমজানের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করা। তারাবির নামাজ সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তারাবির সামাজিক গুরুত্ব : তারাবির নামাজ মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য গড়ে তোলে। একসঙ্গে মসজিদে সমবেত হয়ে ইবাদত করার মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে, যা ইসলামের সাম্যের বাস্তব চিত্র।
ধৈর্য ও আত্মসংযমের শিক্ষা : তারাবির নামাজ দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য হওয়ায় এতে ধৈর্যের বিশেষ প্রশিক্ষণ রয়েছে। ক্লান্তি সত্ত্বেও নামাজে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মসংযম ও দৃঢ়তার পরিচায়ক। এ ধৈর্যই পরবর্তী সময় জীবনের নানা পরীক্ষায় মুসলমানদের অবিচল থাকতে সাহায্য করে।
তারাবি অবহেলার পরিণতি : তারাবি নামাজ ফরজ না হলেও সুন্নতে মুয়াক্কাদা। বিনা কারণে এর অবহেলা করলে একজন মুমিন বহু সওয়াব ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। রমজানের মতো বরকতময় মাসে এমন ইবাদত ছেড়ে দেয়া আত্মিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শ্রেষ্ঠ ইবাদত : তারাবির নামাজ রমজানের রাতের শ্রেষ্ঠ ইবাদতগুলোর একটি। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত এর ফজিলত ও গুরুত্ব মুসলমানকে এ ইবাদতের প্রতি আরও যত্নবান হতে উৎসাহিত করে। গুনাহ মাফ, ইমান বৃদ্ধি, কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক এবং সামাজিক ঐক্য, সবকিছুই তারাবির মাধ্যমে অর্জিত হয়। তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত, রমজান মাসে নিয়মিত তারাবির নামাজ আদায় করা এবং এর মাধ্যমে হান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের মুক্তি অর্জনের চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদ্রাসা, গাজীপুর
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































