Apan Desh | আপন দেশ

শাহী খানাপিনা ঐতিহ্যের নিবিড় বন্ধন চকবাজারের ইফতার 

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২০:৪৫, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ২০:৫৮, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

শাহী খানাপিনা ঐতিহ্যের নিবিড় বন্ধন চকবাজারের ইফতার 

ছবি: মো. সম্রাট শাহজাহান

ইফতারে শাহী খাবার না থাকলে ঢাকাইয়াদের রসনা বিলাস যেন অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ঐতিহ্য, আভিজাত্য, স্বাদ, মান সব দিক বিবেচনায় চকবাজারের মুখরোচক ইফতার ঢাকার শাহী খানাপিনারই একটি অংশ। গত চারশ বছরের ইতিহাসে ইফতারে ঢাকার শাহী খানাপিনা এখনো শীর্ষস্থান দখল করে আছে সেটার প্রমাণ দেয় পুরান ঢাকার চকবাজার। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির এ পরিবর্তিত সময়ে সবকিছুই পালটে গেলেও পাল্টায়নি পুরান ঢাকার চকবাজারের ইফতারের ঐতিহ্য।

বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ঢাকার শাহী খাবার ও মোগল ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা চকবাজারের ইফতার। এটি ঢাকার ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশও। চাহিদার নিরীখে প্রথম দিনেই জমে উঠেছে। প্রায় চারশ বছর আগে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান চকবাজারে শাহি মসজিদ তৈরি করেন। আর ওই বছরের রমজানকে কেন্দ্র করেই শাহি মসজিদ ও এর আশপাশে গড়ে ওঠে ইফতার বাজার।

আর সে থেকে টানা সাড়ে ৩০০ বছর ধরে ঐতিহ্যের সঙ্গে পথ চলে এখনো ইফতার বাজারে সবার ভালোলাগার জায়গা চকবাজারের ইফতার বাজার। এ এলাকার বাসিন্দারা জানান, দুপুর ২টার পর থেকে শুধু পুরান ঢাকার বাসিন্দারাই নন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা ছুটে এসেছেন ইফতার কিনতে।

শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকালে সরেজমিন ক্রেতাদের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়ই প্রমাণ করে চকবাজারের ইফতারের প্রতি মানুষের ভালোলাগা আর ভালোবাসা। এখানকার দোকানগুলোর ইফতারের মেন্যুতে পাওয়া যাচ্ছে সুতি কাবাব, জালি কাবাব, টিক্কা কাবাব, মোরগ পোলাও, লাবাং, পরোটা, বিভিন্ন ধরনের কাটলেট, শাহি জিলাপি, পেঁয়াজু, শাকপুলি, ডিম চপ, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট, খাসির রানের রোস্ট, দইবড়া, আস্ত রাজ হাঁসের ফ্রাই, হালিম, নূরানি লাচ্ছি, পনির, পেস্তা বাদামের শরবত, ছানামাঠা, কিমা পরোটা, ছোলা, ঘুগনি, বেগুনি, আলুর চপ ইত্যাদি।

এ এলাকার ইফতারের অন্যতম আকর্ষণীয় ও লোভনীয় খাবার হচ্ছে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এ খাবারটি। গত চার বছর যাবত একই দামে বিক্রি হচ্ছে  ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। চার বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বড় বাপের পোলায় খায় বিক্রি হচ্ছ ৮০০ টাকা কেজিতে।

‘বড় বাপের পোলায় খায়’-এর বিক্রেতা জানান, তার দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তিনি এখনো এ আইটেমটি বিক্রি করছেন। প্রায় ৭৮ বছর আগে এখানে এ আইটেম নিয়ে বসতেন মোহাম্মদ হোসেনের দাদু। এখন তিনি ও তার ভাই পূর্ব পুরুষদের সে ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতি রমজানে বিক্রি করছেন ঢাকাবাসীর প্রিয় এ শাহি ইফতার মেন্যু। এ বাজারের ইফতারের অন্যতম সুস্বাদু খাবার গরুর সুতি কাবাব বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি এক হাজার এবং খাসির সুতি কাবাব বিক্রি হচ্ছে এক হাজার দুইশ টাকায়।

এ ছাড়া প্রতি কেজি শাহি ছোলা ২৮০, ঘুঘনি ১৪০, চিকেন আচারি ১ হাজার ৩০০ এবং কাশ্মীরি বিফ আচারি ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য খাবারগুলোর মধ্যে প্রতিটি জালি কাবাব ৩০, টানা পরোটা ৫০, কিমা পরোটা ৭০, কাঠি কাবাব ৪০ এবং ডিম চপ ৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।

আরও পড়ুন <<>> গণতন্ত্র রক্ষায় বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ: প্রধানমন্ত্রী

পাশাপাশি দইবড়া ১০০ টাকা (তিনটি), ফালুদা কেজি ২২০ টাকা, পেস্তা বাদাম শরবত ২৫০ টাকা লিটার, মুরগির ললিপপ প্রতিটি ৪০ টাকা, চিকেন ফিংগার ৪০ টাকা, চিকেন স্যান্ডুইচ ৫০ টাকা, চিকেন রোল ৪০ টাকা, ভেজিটেবল রোল ৩০ টাকা, চিকেন রোল প্যাটিস ৪০ টাকা, চিকেন প্যাটিস ৫০ টাকা, চিকেন শর্মা ৭০ টাকা, চিকেন রেশমি কাবাব ৫০ টাকা, মিনি পিৎজা ৭০ টাকা এবং চিকেন টিক্কা বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা।

আস্ত রাজহাঁসের কাবাব বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ টাকায়, কায়েল ফ্রাই ৮০ টাকা, মুরগি ফ্রাই ৪০০ টাকা, গুটি কাবাব কেজি ১২০০, দইচিঁড়া হাফ কেজির বাটি ৮০ টাকা, শাহি জিলাপি কেজি ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত। সবজি শাহি পরাটা পিস ৬০ টাকা, কিমা পরাটা ৮০ টাকা, প্লেন পরাটা ৪০, ফালুদা হাফ কেজি বাটি ১০০, পেস্তা বাদামের শরবত হাফ লিটার ১০০, পেঁপের শরবত ৫০, তরমুজের শরবত ৮০ টাকা, মালপোয়া পিস ২৫ টাকা, কিমা সমুচা ১৫ টাকা, গরুর কলিজার শিঙাড়া, চিকেন ফ্রাই ৪৫ টাকা পিস, চিকেন শর্মা ৪০, চিকেন সাস্লিক ৩৫ টাকা, চিকেন কাকোজ ৪০ টাকা, দইবড়া ৫ পিস ১০০ আর ১০ পিস ২০০ টাকা, চিকেন টোস্ট ৪০-৪৫ টাকা।

কাশ্মীরি নান ১০০-১২০ টাকা, গরুর কোপ্তা ২০ টাকা পিস, চিকেন রোল ৬০ টাকা, বিফ রোল ৮০, খাসির লেগ পিস ৮০০ টাকা, আস্ত মুরগি ৫০০ টাকা, খাসির ঝুরা মাংস ১৬০০ টাকা কেজি, কাশ্মিরি চিকেন কাবাব ২০০, চিকেন টিক্কা ২৫০টাকা, গরুর শিক কাবাব ২০০, আফগানি বিফ লতা কাবাব ২০০ টাকা, তন্দুরি চিকেন পিস ১৫০ টাকা, খাসির বটি কাবাব ২০০টাকা, চিকেন বটি কাবাব ২০০ টাকা,  স্পেশাল দুধ নান ৬০ টাকা ,কাশ্মিরি নান ১০০ টাকা, বাটার নান ৫০ টাকা, মুরগির আচার ৩০০ টাকা কেজি, কোয়েল ভুনা প্রতি পিস ৮০ টাকা, কোপ্তা চিকেন প্রতি পিস ২০ টাক, ফালুদা ২০০, জর্দা ১০০, জিলাপি ২৫০ কেজি, মালাই জিলাপি ৬০০ টাকা কেজি, মাঠা ৬০ ও ১২০ টাকা।

চকবাজারের ইফতার বাজারে কথা হয় রাজধানীর বাসাবো থেকে আগত মাসফি রাজীব ও মৌ দম্পত্তির সাথে।  রাজীব বলেন, লালবাগ আমার আদি নিবাস। চকবাজারের ইফতার ছাড়া আমার চলেই না। এটি শুধু ইফতার নয় এটি আমার এক টুকরো আবেগ। তার কথায় সহমত প্রকাশ করেন রাজীবের স্ত্রী মৌ। তিনি বলেন, চকবাজারের ইফতার শুধু খাবার না এটি ঢাকার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যার কারণেই এখানে আসা।  তবে দাম বাড়ালেও স্বাদ ও মান আগের তুলনায় অনেকটা কমে গেছে বলেও মনে করেন এ দম্পতি।

বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ঢাকার শাহী খাবার ও মোগল ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা চকবাজারের ইফতার ঢাকার ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েই থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়