ফাইল ছবি
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ এবং পরিচ্ছন্ন নেতৃত্বের জন্য পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ঠাকুরগাঁও-১ থেকে নির্বাচিত এ নেতা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।
আগামী সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করবেন। এরপর সরকার গঠন করবেন। যেখানে দুটি আসনে বিজয়ী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। এ তথ্য জানিয়েছেন দলে স্থায়ী কমিটির সিনিয়র একজন সদস্য। যিনি বিএনপিতে বর্তমানে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে বেশ প্রভাবশালী ও পরামর্শক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও সৎ নেতৃত্ব দেশের নতুন রাষ্ট্রনীতি এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মির্জা রুহুল আমিন, যিনি স্বাধীনতার আগে ও পরে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মির্জা ফখরুলের মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন ছিলেন গৃহিণী। শিক্ষাজীবঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মির্জা ফখরুল।

পেশা যখন শিক্ষকতা
১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেন। ঢাকা কলেজসহ কয়েকটি সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনের সূচনা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একজন সদস্য ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ নির্বাচন ও মন্ত্রীত্ব
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে পঞ্চম ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন, কিন্তু জয় লাভ করতে পারেননি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে জয়লাভ করেন। কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মন্ত্রীত্ব পালন করেন।
আরও পড়ুন<<>> বিশ্ব রাজনীতির নতুন উদাহরণ তারেক রহমান
মির্জা ফখরুল ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন। তিনি বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হলেও শপথ গ্রহণ না করায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন, যা তার রাজনৈতিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তার প্রকাশ।

বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে নিয়মিত মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি বিএনপির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি মহাসচিব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার ত্যাগ, স্বচ্ছতা এবং পরিচ্ছন্ন নেতৃত্ব তাকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনন্য করে তুলেছে।
সংগ্রাম ও ত্যাগ
বারংবার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্বাধীন নির্বাচন ও জনগণের মৌলিক অধিকারের জন্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৭ বছরের মধ্যে একাদশবার খণ্ড সময়ের জন্য কারাগারে ছিলেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে তিনি বিএনপির একাধিক বিক্ষোভ ও আন্দোলন কর্মসূচীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল থেকে চাপ ও হুমকি সত্ত্বেও তিনি দলে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কাজ করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহিত। দম্পতির দুই মেয়ে রয়েছে- মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তার পরিবার এবং রাজনৈতিক পরিবেশ তাকে দৃঢ় ও ন্যায়পরায়ণ নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে।

ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর ফখরুল স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষা সম্প্রসারণ ও যুবশক্তি বিকাশে কাজ করেছেন। তিনি বলেছেন, একটি বিভেদহীন, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়াই তার প্রধান লক্ষ্য, যা সামনের প্রজন্মের জন্য অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করবেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে তার পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক চেতনা ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেছে, যা তাকে রাষ্ট্রপতির আসনে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































