Apan Desh | আপন দেশ

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির শোক-গৌরবের অমর আখ্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২২:১২, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ২২:১৫, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির শোক-গৌরবের অমর আখ্যান

ফাইল ছবি।

একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই বাঙালির হৃদয়ে শোক আর গর্বের এক মিশ্র অনুভূতি। ১৯৫২ সালের এ দিনে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল বুকের তাজা রক্তে। সে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে মায়ের ভাষা বাংলার মর্যাদা। আজ এ ইতিহাস শুধু বাঙালির নয়, বরং সারাবিশ্বের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।

রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি—শোক, গৌরব আর আত্মত্যাগের এক অনন্য অধ্যায়। এ দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জীবন দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারসহ অনেক তরুণ।

১৯৫২ সালের এ দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজ শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত, রফিকসহ নাম না–জানা আরও অনেকে শহীদ হন। তাদের সে আত্মত্যাগই আজ বিশ্বজুড়ে ভাষাপ্রেম ও অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি। এদিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতে রাখা হবে।

একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাসহ বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষ ও জাতিগোষ্ঠীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সব শহীদকে, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৫২ সালের এ দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে শহীদ হন আবুল বরকত, আবদুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমদ, আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেকে। তাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় পূর্ব বাংলার মুক্তির প্রথম সোপান। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার এ আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি বরং বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তি আরও মজবুত করেছে। একুশের এই রক্তাক্ত পথ ধরেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির স্মৃতিবিজড়িত এক গৌরবময় দিন উল্লেখ্য করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির স্মৃতিবিজড়িত এক গৌরবময় দিন। তিনি মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় আত্মোৎসর্গকারী ভাষা শহিদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ অজানা শহিদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তানের দুই অংশের ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার চেষ্টা করলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে জনগণের আত্মত্যাগের মাধ্যমে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, বাঙালির জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন ছিল জাতিসত্তা, স্বকীয়তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম, যার চেতনা পরবর্তীতে স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম প্রেরণা যুগিয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের গবেষক ও ভাষাবিদরা বলছেন, একুশ কেবল ভাষার দাবি নয়, এটি ছিল আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রাম। তাই ভাষাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি বন্ধ করতে হবে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেয়ার প্রবণতা।

বাংলা অ্যাকাডেমির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, বাংলা ভাষার প্রতি অনেকের তেমন আগ্রহ নেই। আমাদের উচ্চশিক্ষিত বাঙালিরা, রাষ্ট্রের ধনী লোকেরা দেশত্যাগ করে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। তারা বলছেন, এদেশে রাষ্ট্র গড়ে উঠবে না, বাঙালি জাতি উন্নতি করতে পারবে না। যখন এ ধরনের আত্মসমালোচনা হয়, তখন কিন্তু ভাষার গতিও খর্ব হয়।

তিনি আরও বলেন, রাজনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনা, উচ্চশিক্ষা ও অফিস-আদালতে যদি বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়তে থাকে। তাহলে ভাষার উন্নতি হবে।

রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭৪তম বর্ষপূর্তিতে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত গোটা বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্রই নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালে, যখন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকে দিনটি বিশ্বজুড়ে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার অধিকারের প্রতীক।

আপন দেশ/এমবি

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়