Apan Desh | আপন দেশ

কমার্স ব্যাংকের ছায়া এমডি পুত্রবধূ, চেয়ারম্যান শ্বশুর

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ 

প্রকাশিত: ১৫:১০, ১৯ মে ২০২৬

আপডেট: ১৫:৫৮, ১৯ মে ২০২৬

কমার্স ব্যাংকের ছায়া এমডি পুত্রবধূ, চেয়ারম্যান শ্বশুর

চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান। ছবি-এআই জেনারেটর

সরকারি-বেসরকারি মিশ্র মালিকানাধীন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, পিএলসি। এটি ছিল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের (এস আলম) নিয়ন্ত্রণে। এর অর্ধেকের বেশি শেয়ার আছে সরকারের। এস আলমের লোপাটের তালিকায় এ ব্যাংকটিও বাদ যায়নি। যার আর্থিক দুর্নীতির চিত্র মোটামোটি সবারই জানা। এবার ব্যাংকটিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘শ্বশুর-পুত্রবধূর শাসন’।

ব্যাংকটিতে চাকরিরত একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকে আরও পদোন্নতি, বদলির সিদ্ধান্ত ও সাজা নির্ধারিত হয় দিলকুশা শাখা থেকে। যেখানে বসে বাণিজ্যিকভাবে সিদ্ধান্ত দেন ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ। আর ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন চেয়ারম্যান। যিনি শ্বশুর। এককথায় কমার্স ব্যাংক চলছে ‘পুত্রবধূর ইশারায়’।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের অধীনে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আতাউর রহমান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক। তার মেয়াদকাল প্রযোজ্য নয় বলে নিয়োগে উল্লেখ আছে।

আরও পড়ুন<<>> মোরশেদ আলমের ‘শরীয়াহ ভিত্তিক’ দুর্নীতি! ন্যাশনাল লাইফের শতকোটি লুট

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ব্যাংকটিকে ‘পারিবারিক’ প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছেন। তার অপছন্দের কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করেছেন, বদলি করেছেন। আবার লঘুদণ্ডও দিয়েছেন। পদত্যাগ করানো হয়েছে এমডি মোহাম্মদ মোশারফ হোসেনকেও।

পদত্যাগের বিষয়ে সাবেক এমডি মোশারফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওখানে (কমার্স ব্যাংক) কাজ করার পরিবেশ ছিল না। প্রতিটা মুহূর্তে বিরক্ত করা হতো। প্রতিটা কাজে যদি চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টর নাক গলায়, তাহলে কীভাবে কাজ করব?’

চেয়ারম্যান আতাউর রহমানের প্রভাবে উদাহরণ এমনতর যে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) জন্য বরাদ্দকৃত বিলাসবহুল ‘পাজেরু’ গাড়ি ব্যবহার করেন চেয়ারম্যান আতাউর রহমান নিজেই। এমডিকে দিয়েছেন নিম্নমানের ‘হেরিয়ার’। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিপত্র জারির মাধ্যমে বন্ধের নির্দেশনা দিলেও বোর্ডের চেয়ারম্যান বড় চেম্বারে ব্যাংকে নিয়মিত অফিস করছেন। দৈনন্দিন অফিসে বসে খানাপিনা শেষে বাসায় পার্সেলও নিয়ে যান। তাতে করা হয়, বড় অঙ্কের বিল। 

২০২৫ সালের শেষের দিকে এসে চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান ব্যাংকটিতে পারিবারের সদস্যদের নিয়োগ দিয়েছেন। এরমধ্যে রয়েছে তারপুত্রবধূ তানজিনা সুলতানা (রিমা)। তাকে অন্যান্য সুবিধি ছাড়াও মাসে ৪০ হাজার ৯৫০ টাকা বেতনে অ্যাসিসটেন্ট অফিসার পদে চাকরি দিয়েছেন। যার স্মারক নং- BCL/HO/HRD?24/2025/1480। তারিখ-২৬-১১-২০২৫। 

৩৮ বছর বয়সী অফিসার তানজিনা সুলতানা রিমা চাকরি বাগিয়ে নেয়ার কিছুদিন পর থেকেই শ্বশুরের প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। রাজধানীর রাজারবাগের বাসিন্দা হওয়ায় যাতায়াতের কথা বিবেচনায় রেখে নিযোগ নেন রাজধানীর দিলকুশা শাখায়। এখানে বসেই ব্যাংকের বিভিন্ন জনের পদোন্নতি, বদলির সুরাহা করেন। চাউর আছে এ সুবিধার বদলে তিনি আর্থিত সুবিধা নিয়ে থাকেন। অঙ্ক ও কথায় মিললে বাধ্যগত কর্মকর্তার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান শ্বশুরের কাছে। আর পুত্রবধূর কথায় কর্মকর্তার ভাগ্যে জুটে পদোন্নতি, বদলি।

সূত্রের তথ্যমতে, পুত্রবধূর তানজিনা সুলতানা রিমার কথায় এইচআরডির প্রধানকে চট্টগ্রাম, সাভার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার রাজীকে বরিশালসহ গত দেড় মাসে প্রায় ৫০ জনকে বদলি করা হয়। আর শূন্যস্থানে কর্মকর্তা বসিয়ে হাতিয়েছেন ৫০ লাখ টাকা। এ ব্যাংকটিতে একযোগে ৩১৮ জনের পদোন্নতির নজিরও আছে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রয়োজন না থাকলেও বড় ধরনের নিয়োগে যাচ্ছে পরিচালনা বোর্ড। আর কাদের নিয়োগ দেয়া হবে, তা আগে থেকেই দরকষাকষির মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়েছে।

পৌনে তিন বছরের অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতেই মো. আতাউর রহমানকে কল করা হয়। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।

ব্যাংকটির একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আপন দেশ’কে বলেন, নিযুক্ত হবার পর থেকে আতাউর রহমান বলা চলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে। রাজনৈতিক নানান ইস্যুতে একাধিক পরিচালকও তার কাছে জিম্মি। তবে এসব বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা অবগত বলে দাবি করেন ওই পরিচালক।

ব্যাংকটির পিআর ডিভিশন প্রধান হাসান মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মন্তব্য দিতে নিষেধাজ্ঞা আছে বলে জানান। তিনি ব্যাংকের মুখপাত্র জিয়াউল হাসানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রশ্ন শুনে তিনি বিভিন্ন ডিভিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। আগে নিত্যদিন এসেছেন এখন মাঝেমধ্যে চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান ব্যাংকে আসেন বলে জানান তিনি।   

এদিকে, মঙ্গলবার (১৯ মে ) দুপুর ১টা ৩ মিনিটে মোবাইলে কল করা হয় চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ তানজীনা সুলতানা রিমাকে। প্রতিবেদকের প্রশ্নের পর পাল্টা প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, ‘আমার মোবাইল নম্বর কে দিয়েছে?’ 

এরপর ফোনটি ডিসকানেক্ট করে দেন।

আপন দেশ/এবি/এনএম

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়