Apan Desh | আপন দেশ

আঙুল ফুলে কলাগাছ শাহনাজ চম্পা 

বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতালে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা

এম এস রহমান, পাবনা প্রতিনিধি, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১০:১৫, ৪ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতালে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা

ছবি: আপন দেশ

নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে পাবনা শহরে অবস্থিত বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতালের কার্যক্রম। বিষয়টি জানলেও অজ্ঞাত কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একইকক্ষে গাদাগাদি করে রোগী রাখা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নার্স নেই। একই হাসপাতালে মানসিক রোগী ও মাদকসেবী রোগীদের চিকিৎসা। মধ্য শহরের মধ্যে গাড়ি পার্কিং জায়গা না থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে চলছে এ বেসরকারি হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা।

হাসপাতালটির নেপথ্যে মালিক পাবনা মানসিক হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহনাজ সুলতানা চম্পা। কিন্তু কাগজে কলমে মালিক করে রেখেছেন তার বড় ছেলে ইউসুফ বিন মিজানকে। এ ক্লিনিক ব্যবসা করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে উঠেছেন স্বামী পরিত্যক্তা শাহনাজ সুলতানা ওরফে চম্পা। সরকারি হাসপাতালে চাকুরী করে তিনি কোন নিয়মে বেসরকারি হাসপাতাল চালাচ্ছেন তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

পাবনা পৌর শহরে জায়গা কিনে কোটি টাকা খরচে বাড়ি করেছেন, ছোট ছেলেকে অস্ট্রেলিয়ায় লেখাপড়া করাচ্ছেন। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে দুদক ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।

সম্প্রতি পাবনা মধ্য শহরের সোনাপট্টি এলাকায় বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতাল ও মাদক নিরাময় কেন্দ্র সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায় নানা অনিয়ম। অফিসে ঢুকতেই প্রধান ফটকে চোখে পড়ে তালা দেয়া। ডাকতেই বেরিয়ে আসেন হাসপাতালটির ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দেয়া আকাশ হোসেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি তালা খুলে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেন।

তার মাধ্যমে হাসপাতালটি সম্পর্কে তথ্য জানা যায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতাল ও মাদক নিরাময় কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত। একটি ভবনের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলা ভাড়া নিয়ে চলছে হাসপাতালটি। হাসপাতালের রোগীর ক্যাপাসিটি অনুমোদন রয়েছে ১৭ জনের। অথচ বর্তমানে হাসপাতালে রোগী আছে ২৮ জন। ১১ জন রোগী বেশি রাখা হয়েছে। ওয়ার্ডগুলো ঘুরে দেখা যায়, একটি ওয়ার্ডের প্রতিটি শয্যার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থাকার নিয়ম থাকলেও সেখানে মানা হয়নি। 

এক রুমে ৫টি বেড একসাথে লাগানো। সেখানেই গাদাগাদি করে থাকছে রোগীরা। যদিও মানসিক রোগী ও মাদক রোগী আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে। পাশের ছোট্ট একটি কক্ষে চলে রোগীদের খাবার দাবার। পাশেই টয়লেট। এ সময় হাসপাপতালটিতে অন্য কোনো নার্সের (পুরুষ বা মহিলা) দেখা মেলেনি। মধ্য শহরে জনবহুল এলাকায় হাসপাতালটির অবস্থান হওয়ায় গাড়ি পার্কিং এর নেই কোনো ব্যবস্থা।

ম্যানেজার আকাশ হোসেন জানান, হাসপাতালটিতে ঢাকা ও পাবনার তিনজন মানসিক ডাক্তার রোগী দেখেন। এর  মধ্যে ঢাকা থেকে একজন ডাক্তার সপ্তাহে একদিন আসেন। পাবনার ডাক্তার যখন প্রয়োজন তখন এসে রোগী দেখেন। এছাড়া সবসময় কোনো ডাক্তার সেখানে থাকেন না।

নেপথ্যে হাসপাতালটির মালিক পাবনা মানসিক হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহনাজ সুলতানা চম্পা। কিন্তু আইনের চোখ ফাঁকি দিতে খাতা কলমে হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেখানো হয়েছে তার বড় ছেলে ইউসুফ বিন মিজানকে। তাকে হাসপাতালটিতে খুব একটা দেখা যায় না। কারণ সবকিছু পরিচালনা করেন শাহনাজ সুলতানা ওরফে চম্পা। তিনি ১৯৯৮ সালে পাবনা মানসিক হাসপাতালে নার্স হিসেবে যোগ দেন। এরপর থেকে এখনও বহাল তবিয়তে একই হাসপাতালে চাকুরী করছেন চম্পা।

আরও পড়ুন<<>>বরিশালে ৯০ কেজি গাঁজাসহ যুবক গ্রেফতার

বদলীযোগ্য চাকুরী হলেও তাকে এতবছরে একবারও কোথাও বদলী করা হয়নি। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মানসিক হাসপাতালে ডিউটি করে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ছুটে যান নিজের প্রতিষ্ঠানে। অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে আসেন নিজের ক্লিনিকে। মানসিক হাসপাতালের সরকারি ওষুধ কারচুপিরও অভিযোগ রয়েছে। আর এসব অপকর্ম তিনি সিভিল সার্জন ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অফিসকে ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে  জানা যায়, মানসিক হাসপাতালের চাকুরী আর নিজের ক্লিনিক ব্যবসা করে অল্প সময়ে আঙুল ফুলে যেন কলা গাছ হয়ে উঠেছেন স্বামী পরিত্যক্তা শাহনাজ সুলতানা চম্পা। পৈত্রিক বাড়ি ঈশ্বরদীতে হলেও পাবনা পৌর শহরের পাওয়ার হাউজপাড়া এলাকায় কোটি টাকা খরচে জায়গা কিনে বহুতল ভবন করেছেন। ছোট ছেলে ইউনুস বিন মিজান পূর্ন কে অর্ধকোটি টাকা খরচে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়েছেন লেখাপাড়া করার জন্য।

লাইসেন্সের কাগজপত্র যাচাই করে দেখা যায়, পরিবেশ অধিদফরের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে। নবায়ন করা হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে। আর নবায়ন করা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন করা হয়নি। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের লাইসেন্সের মেয়াদ আছে ২০২৬ সাল পর্যন্ত।

সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে মানসিক হাসপাতাল থেকে নিজের বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতাল ও মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ছুটে আসেন শাহনাজ সুলতানা চম্পা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনার সময় বড় ছেলেটা বিপথে চলে যাবে ভেবে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে এ হাসপাতালটি করে দিয়েছি। তার নামেই সবকিছু, সে মালিক। আমি মা হিসেবে তার পাশে রয়েছি।

তিনি আরো বলেন, ছোট ছেলে স্কলারশিপ পেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে গেছে। আমার কাজিনরা আর্থিক সহযোগিতা করে তাকে পাঠিয়েছে। বাড়ির জায়গা কেনা ও বাড়ি করার ক্ষেত্রে আমার ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি করেছি। আর শহরের মধ্যে ওই সময় নিজস্ব ভবন ছিলনা, তাই ভবন ভাড়া নিয়ে হাসপাতালটি করা হয়েছে। তবে আমরা শহরের বাইরে গাছপাড়া এলাকায় জায়গা কিনে সেখানে হাসপাতালটি স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। কেউ হয়তো ষড়যন্ত্রমুলক শত্রুতাবশত আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছে।

পাবনা পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. ইউসুফ আলী বলেন, বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতালের পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র দেয়া আছে। তাদের নবায়ন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া শহর থেকে বাইরে হাসপাতালটি স্থানান্তর করবে বলে আগামী দুই বছর সময় নিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থানান্তর না করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পাবনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. শহিদুল মান্নাফ কবির বলেন, পাবনায় দুটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স রয়েছে। দুইটারই লাইসেন্স নবায়ন করা আছে। তার মধ্যে একটি বাংলাদেশ মানসিক হাসপাতাল ও মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র। তাদের রোগী কম থাকায় সেভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়না। তবে এর আগেও অভিযোগ ওঠায় তাদের সতর্ক করা হয়েছে। আবার যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে তাদের নজরদারির মধ্যে আনা হবে।

এ বিষয়ে পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, এসব হাসপাতালের লাইসেন্স দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। আমরা শুধু তাদের দেখভাল করি। কিছু হাসপাতালে অনুমোদিত বেডের বাইরে বেশি রোগী রাখা হয়। আমরা তাদের বলেছি নির্ধারিত বেডের বাইরে যেন তারা বেশি রোগী ভর্তি না করে। এখানে আমরা ম্যানেজ হয়ে দেখি না কিছু বিষয়টা এমন নয়। সরকার লাইসেন্স দিয়েছে। তারা হয়তো সেগুলো নবায়ন করতে গড়িমসি করে। তারপরও বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখবো। কোনো ব্যতয় পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়