Apan Desh | আপন দেশ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার আমল-দোয়া

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৫২, ৯ জুলাই ২০২৬

প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার আমল-দোয়া

ছবি: আপন দেশ

প্রকৃতি কখনো বিরূপ আকৃতি ধারণ করে। যেটাকে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলি। যেমন- ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, ভারী বর্ষণ, বন্যা, খরা, দাবানল, শৈত্যপ্রবাহ, দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প ও সুনামি প্রভৃতি।

প্রকৃতির যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা আল্লাহর অধীনে। এসব কিছু কেবল তার হুকুমেই হয়। তার হুকুম ও আদেশের বাইরে গাছের একটি পাতাও নড়ে না। পবিত্র কোরআনে দুর্যোগের বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান, মাল ও ফলফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, নিজেদের বিপদ-মুসিবতের সময় বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী, তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সুরা বাকারা,আয়াত : ১৫৫-১৫৭)

দুর্যোগের আল্লাহর রাসুল (সা.) যা করতেন
দমকা হওয়া বইতে দেখলে রাসুল (সা.) আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যেতেন এবং উদ্বিগ্ন হয়ে চলাফেরা করতেন। যখন বৃষ্টি হতো তখন তিনি খুশি হতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, যখন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হতো এবং ঝোড়ো বাতাস বইত—তখন রাসুল (সা.) এর চেহারায় চিন্তার রেখা ফুটে উঠত। এ অবস্থা দেখে তিনি এদিক-সেদিক পায়চারি করতে থাকতেন এবং এ দোয়া পড়তেন—

اللهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا، وَخَيْرَ مَا فِيهَا، وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا، وَشَرِّ مَا فِيهَا، وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা-ফিহা ওয়া খাইরা মা-উরসিলাত বিহি, ওয়া আউজুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা-ফিহা ওয়া শাররি মা-উরসিলাত বিহি।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে এ বৃষ্টির কল্যাণগুলো কামনা করছি, এ বৃষ্টিতে যেসব কল্যাণ রয়েছে সেগুলো কামনা করছি এবং এ বৃষ্টির মাধ্যমে প্রেরিত কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর  আর এ বৃষ্টি ও বৃষ্টির মাধ্যমে প্রেরিত সব রকম অকল্যাণ ও বিপদাপদ থেকে পরিত্রাণ চাই।

এরপর যখন বৃষ্টি হতো— তখন মহানবী (সা.) শান্ত হতেন। আয়েশা (রা.) আরও বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছি যে লোকজন মেঘ দেখলে বৃষ্টির আশায় আনন্দিত হয়ে থাকে, আর আপনি তা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন?’ 

জবাবে রাসুল (সা.) বলেন, আমি এ ভেবে শঙ্কিত হই যে বৃষ্টি আমার উম্মতের ওপর আজাব হিসেবে পতিত হয় কি না। কেননা আগের উম্মতদের ওপর এ পদ্ধতিতে (বৃষ্টি বর্ষণের আকারে) আজাব পতিত হয়েছিল। (বুখারি, হাদিস : ৩২০৬; মুসলিম, হাদিস : ৮৯৯; তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৪৯)

তাই ঈমানদারদের উচিত, আকাশে বৃষ্টির ভাব দেখলে বা বৃষ্টি আসবে আসবে— মনে হলে এ দোয়া পাঠ করা। সাহাবিদের জীবনে আমরা দেখি, বিপদে-মুসিবতে তারা নামাজে দাঁড়াতেন ও ধৈর্য ধারণ করতেন। (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫৩৪৫)।

দুর্যোগের সময় করণীয় সুন্নত আমল
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কিছু সুন্নত আমল করার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচার সুযোগ রয়েছে। হাদিসে আছে, যখন কোথাও ভূমিকম্প সংঘটিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন সবার উচিত মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা, তার কাছে নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা, মহান আল্লাহকে স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, দ্রুততার সঙ্গে মহান আল্লাহর জিকির করো, তার নিকট তওবা করো। (বুখারি, হাদিস : ২/৩০; মুসলিম, হাদিস : ২/৬২৮)।

আল্লাহর জিকিরের সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে— নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত বা দোয়া-দরুদ পাঠ করা। দুর্যোগের সময় জিকিরের আরও উপায় হতে পারে— ইস্তিগফার ও তাসবিহ পাঠ ইত্যাদি।

বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার বা বৃষ্টি থামানোর দোয়া
প্রয়োজনমাফিক বৃষ্টি কল্যাণকর। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও বন্যা অবশ্যই খারাপ। যখন প্রবল বৃষ্টি হতো— তখন নবী (সা.) বলতেন,

اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا ولَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ علَى الآكَامِ والظِّرَابِ، وبُطُونِ الأوْدِيَةِ، ومَنَابِتِ الشَّجَرِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা হাওয়া-লাইনা, ওয়ালা আলাইনা; আল্লাহুম্মা আলাল আ-কাম ওয়াজ জিরাব ওয়া বুতুনিল আওদিআ; ওয়া মানাবিতিস শাজার। (বুখারি, হাদিস : ১০১৪)

অর্থ : হে আল্লাহ! আমাদের আশপাশে বৃষ্টি দিন, আমাদের ওপরে নয়। হে আল্লাহ! পাহাড়-টিলা, খাল-নালা এবং গাছ-উদ্ভিদ গজানোর স্থানগুলোতে বৃষ্টি দিন।

আরও পড়ুন<<>>‘অশ্লীল বাক্য’ বিনিময় কুরআন হাদিস বিরোধী

আনাস (রা.) বলেন, একবার জুমার দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবা দেয়া অবস্থায় জনৈক সাহাবি মসজিদে প্রবেশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! জীবজন্তু মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের জন্য বৃষ্টি প্রার্থনা করুন। তখন রাসুল (সা.) তার দুই হাত উঠিয়ে দোয়া করতে শুরু করেন—

اللَّهُمَّ اسْقِنَا، اللَّهُمَّ اسْقِنَا، اللَّهُمَّ اسْقِنَا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাসক্বিনা, আল্লাহুম্মাসক্বিনা, আল্লাহুম্মাসক্বিনা।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করো! হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করো! হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করো!

আনাস (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ! তখন আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘের ছোঁয়াও ছিল না, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দোয়ার পর দিগন্তে মেঘের উদ্ভাস হয়, কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো আকাশ ছেয়ে ফেলে, অতঃপর মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হয়।

অতি বৃষ্টি বন্ধের দোয়া ও আমল
আনাস (রা.) আরও বলেন, আল্লাহর শপথ! পরবর্তী ছয় দিন যাবৎ আমরা সূর্য দেখিনি। সপ্তাহান্তে পরবর্তী জুমায় পুনরায় ওই ব্যক্তি যখন মসজিদে প্রবেশ করে তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবারত অবস্থায়, ওই ব্যক্তি আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! ধনসম্পদ সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পানিতে পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, আল্লাহ তায়ালার কাছে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার প্রার্থনা করুন।

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই হাত উঁচিয়ে দোয়া করলেন— اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا ولَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ علَى الآكَامِ والظِّرَابِ، وبُطُونِ الأوْدِيَةِ، ومَنَابِتِ الشَّجَرِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা হাওয়া-লাইনা, ওয়ালা আলাইনা; আল্লাহুম্মা আলাল আ-কাম ওয়াজ জিরাব ওয়া বুতুনিল আওদিআ; ওয়া মানাবিতিস শাজার। (বুখারি, হাদিস : ১০১৪)

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের আশপাশে বৃষ্টি দিন, আমাদের ওপরে নয়। হে আল্লাহ! পাহাড়-টিলা, খাল-নালা এবং গাছ-উদ্ভিদ গজানোর স্থানগুলোতে বৃষ্টি দিন।

বর্ণনাকারী বলেন, তখনই বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, অতঃপর আমরা নামাজান্তে রোদের মধ্যে বের হই। (বুখারি, হাদিস : ১০১৩; মুসলিম, হাদিস : ৮৯৭)

বজ্রপাত শুনে যে দোয়া পড়তে হয়
আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বজ্রপাতের সময় কথা বন্ধ রাখতেন। আর বলতেন—

 وَيُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ উচ্চারণ : ওয়া য়ুসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহি, ওয়াল মালাইকাতু মিন খিয়ফাতিহি। (সুরা রাদ, আয়াত : ১৩)

অর্থ : বজ্র ও সব ফেরেশতা সন্ত্রস্ত হয়ে তার প্রশংসা পাঠ করে।

এরপর বলেন, এটি দুনিয়াবাসীর জন্য চরম হুমকি। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৭২৩; মুয়াত্তা মালেক, হাদিস : ৩৬৪১; আল-আজকার, হাদিস : ২৩৫)

ঝড়-তুফান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার দোয়া
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বজ্রের আওয়াজ শুনতেন তখন এ দোয়া পড়তেন— اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا، اللَّهُمَّ صَيِّبًا هَنِيئًا، اللَّهُمَّ لاَ تَقْتُلْنَا بِغَضَبِكَ وَلاَ تُهْلِكْنَا بِعَذَابِكَ وَعَافِنَا قَبْلَ ذَلِكَ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ছায়্যিবান নাফিআ, আল্লাহুম্মা ছায়্যিবান হানীআ। আল্লাহুম্মা লা তাকতুলনা বি-গদাবিকা, ওয়া লা তুহলিকনা বি-আযাবিকা ওয়া আ-ফিনা ক্বাবলা যা-লিকা।

অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি আপনার গজব দিয়ে আমাদের হত্যা করে দেবেন না এবং আপনার আজাব দিয়ে ধ্বংস করে দেবেন না। এসবের আগেই আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। (বুখারি, হাদিস : ৭২১; তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৫০; নাসায়ি, হাদিস : ৯২৭; আহমাদ, হাদিস : ৫৭৬৩; মিশকাত, হাদিস: ১৫২১)

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়