ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের মদিনা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বদর প্রান্তর। প্রায় ১৪০০ বছর আগে এখানেই সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ—বদরের যুদ্ধ।
সামরিক দিক থেকে যোদ্ধার সংখ্যা খুব বেশি না হলেও ইতিহাসে এ যুদ্ধকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআনে এ দিনকে ‘আল-ফুরকান’ বা সিদ্ধান্তের দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মদিনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে পাহাড়ে ঘেরা একটি ডিম্বাকৃতির বিস্তীর্ণ প্রান্তর হলো বদর। প্রস্থ প্রায় সাড়ে চার মাইল। প্রাচীনকাল থেকেই জায়গাটির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ছিল। কারণ ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বাণিজ্য পথ এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে গেছে।
একই স্থানে মক্কা ও মদিনা থেকে আসা দুটি পথ মিলিত হয়েছিল। পাশাপাশি লোহিত সাগরও এখান থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরে অবস্থিত।
ইতিহাসবিদদের মতে, বদর নামের উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি ধারণা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো—বদর বিন ইয়াখলাদ নামের এক ব্যক্তি এখানে একটি কূপ খনন করেছিলেন।
কূপের পানি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। বলা হয়, সে পানিতে চাঁদের প্রতিফলন দেখা যেত। আরবিতে চাঁদকে ‘বদর’ বলা হয়। এ দুটি কারণ থেকেই স্থানটির নাম বদর হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
প্রাক-ইসলামী ‘জাহিলিয়া’ যুগে প্রতি বছর জিলকদ মাসের প্রথম দিন থেকে অষ্টম দিন পর্যন্ত এ এলাকায় একটি বড় মেলা অনুষ্ঠিত হতো বলেও জানা যায়।
মক্কায় ইসলামের প্রচারের সময় মুসলমানরা প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েন। পরে তারা মদিনায় হিজরত করেন। তবে দুই শহরের মধ্যে সংঘর্ষের পেছনে শুধু ধর্মীয় বিরোধই কারণ ছিল না।
আরও পড়ুন <<>> রমজানে দোয়া কবুলের উত্তম সময়
দ্বিতীয় হিজরি বর্ষে রজব মাসে মক্কার এক গোত্রপ্রধান আমর ইবনে আল-হাদরামি দুর্ঘটনাবশত মুসলমানদের হাতে নিহত হন। মহানবী মুহাম্মদ (সা.) স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন।
তবুও কুরাইশ নেতারা এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন মনে করেন, এ ঘটনাই বদরের যুদ্ধের সূচনা তৈরি করে।
পরবর্তীতে সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরছিল কুরাইশদের একটি সম্পদবাহী কাফেলা। কাফেলার নেতা ছিলেন আবু সুফিয়ান। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মুসলমানরা কাফেলাটি আক্রমণ করতে পারে। এতে তিনি মক্কায় বার্তা পাঠান। মক্কা থেকে প্রায় ৯০০-১০০০ সৈন্যের একটি সশস্ত্র বাহিনী কাফেলাকে সাহায্য করতে বের হয়। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন কুরাইশ নেতা আবু জাহল।
অন্যদিকে, ১২ রমজান নবী মুহাম্মদ (সা.) ৩১৩ জন সাহাবিকে নিয়ে বদরের উদ্দেশে রওনা হন। ১৭ রমজান ২ হিজরি (১৩ মার্চ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
আরব ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রথমে একক দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে তিনজন কুরাইশ যোদ্ধা নিহত হন। এরপর পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। দুই তরুণ আনসার যোদ্ধা মুয়াজ ও মুয়াওয়াজ আবু জাহলকে হত্যা করেন। এতে যুদ্ধের গতি মুসলমানদের পক্ষে যেতে শুরু করে। সংখ্যায় কম হলেও মুসলমান যোদ্ধারা কৌশলী আক্রমণ চালায়। এতে কুরাইশ বাহিনী ভেঙে পড়ে।
যুদ্ধে কুরাইশদের প্রায় ৭০ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হন এবং আরও ৭০ জন বন্দী হন। বন্দীদের মুক্তির জন্য ৪,৪০০ দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয়। যারা শিক্ষিত ছিলেন, তাদেরকে দশজন মুসলিম শিশুকে পড়া-লেখা শেখানোর শর্তে মুক্তি দেয়া হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, বদরের যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। কেমব্রিজ হিস্ট্রি অব ইসলামের মতে, এ যুদ্ধে মক্কার বহু দক্ষ প্রশাসক ও ব্যবসায়ী নিহত হন। এতে কুরাইশদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মক্কার বাণিজ্যপথও ঝুঁকির মুখে পড়ে, কারণ সিরিয়ার সঙ্গে তাদের বাণিজ্য মূলত এ পথেই চলতো।
এ বিজয় মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। তাদের ধর্মীয় চেতনা আরও শক্তিশালী হয়। মদিনায় মুসলিম রাষ্ট্রের অবস্থানও মজবুত হয় এবং আরবের বিভিন্ন গোত্র মুসলমানদের শক্তিকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করে।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ যুদ্ধেই প্রথমবার মুসলমানরা নবী (সা.) নেতৃত্বে বড় সংঘর্ষে অংশ নেয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এ যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হলে ইসলাম মারাত্মক সংকটে পড়তে পারতো। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধকে অন্যতম ‘নির্ণায়ক যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































