ছবি : আপন দেশ
রাজধানীর শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত রাজা ওরফে পিচ্চি রাজার পলায়ন ছিল প্রিজন ভ্যানে দায়িত্বে থাকা পুলিশের সাজানো নাটক।
তদন্ত শেষে সোমবার (০৫ অক্টোবর) গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পিচ্চি রাজাকে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় নয়, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার থেকেই প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের এক এসআই তাকে আগে থেকে অপেক্ষায় থাকা একটি প্রাইভেটকারে তুলে দেন। ওই গাড়িতে ছিলেন পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাসহ কয়েকজন।
পুলিশ জানায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২৯ আসামিকে প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকার আদালতে নেয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে রাতে তাদের কাশিমপুরে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছিল। রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রিজন ভ্যানটি থামে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে দায়িত্বে থাকা স্কট পার্টির ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে ভ্যানের চাবি নিয়ে তালা খোলেন। এরপর পিচ্চি রাজা ও খাইরুল বাশার নামে দুই হাজতিকে ভ্যান থেকে নামানো হয়। খাইরুল বাশারকে চালকের পাশে ভ্যানের সামনের অংশে বসানো হলেও পিচ্চি রাজা আর ভ্যানে ওঠেননি।
পুলিশ বলছে, তাঁতীবাজারেই পিচ্চি রাজাকে একটি অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকারে তুলে দেয়া হয়। গাড়িতে আগে থেকেই ছিলেন তার বোন তাসলিমাসহ কয়েকজন। তাকে গাড়িতে তুলে দেয়ার সময় এসআই প্রবীর সাদাপোশাকে ছিলেন বলে তদন্তে জানা গেছে। পরে প্রিজন ভ্যানটি বাকি আসামিদের নিয়ে কাশিমপুরের দিকে রওনা হয়।
আরও পড়ুন<<>>দুদকের মামলায় চট্টগ্রাম ওয়াসার সাবেক গাড়িচালকের কারাদণ্ড
তদন্তে আরও জানা যায়, পিচ্চি রাজাকে গাড়িতে তুলে দেয়ার পর এসআই প্রবীর গাজীপুর মহানগরীর বাইমাইল এলাকায় নাওজোড় হাইওয়ে থানার সামনে এসে আবার প্রিজন ভ্যানে যুক্ত হন। এরপর কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছে পিচ্চি রাজার পলায়ন নিয়ে ভিন্ন একটি ঘটনা সাজানো হয়।
সেখানে বলা হয়, বাইমাইল বা নাওজোড় এলাকায় পৌঁছানোর পর পিচ্চি রাজা বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে প্রিজন ভ্যান থেকে নামেন। পরে সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালিয়ে যান। এতদিন পুলিশের পক্ষ থেকে এ ঘটনাকেই তার পলায়নের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। বাইমাইলে পৌঁছানোর আগেই তাকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। তাঁতীবাজার থেকেই প্রাইভেটকারে করে চলে যান তিনি।
পুলিশের তদন্তে পিচ্চি রাজার পলায়নে সরাসরি সহযোগিতার অভিযোগে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন ও পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল জাকির হোসেন, মো. সাকিব ও শাকিল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। গ্রেফতার দুই পুলিশ সদস্য ছাড়া বাকি তিন কনস্টেবলকে নজরদারিতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পিচ্চি রাজার পলায়নের পর প্রকৃত ঘটনা গোপন করে ভিন্ন তথ্য দেয়ার অভিযোগে কোনাবাড়ী থানায় দণ্ডবিধির ২২৪ ধারায় মামলা হয়। পরে মামলাটির তদন্তভার দেয়া হয় জিএমপির ডিবি দক্ষিণ বিভাগকে। তদন্তে প্রিজন ভ্যানের গতিপথ, দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা এবং পিচ্চি রাজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, এমনকি সে পুলিশ সদস্য হলেও কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সঠিক তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে তদন্তে পলায়নের প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে এলেও এখনও অধরা পিচ্চি রাজা। ঘটনার আট দিন পেরিয়ে গেলেও তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তাকে এবং পলায়নে সহযোগিতাকারী অন্যদের ধরতে ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে ডিবি পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে বলে জানান কমিশনার।
রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা ওরফে বাদশা মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ব্লক-এ এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসংক্রান্ত ৩০টি মামলা রয়েছে। চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে দেশে ফেরার পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাকে, তার স্ত্রী ও শ্যালককে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































