ছবি : আপন দেশ
দেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনের প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় মুখ, ফিলিপস পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক সৈয়দ গোলাম বতুল কাজিম রেজা আর নেই।
বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
কাজিম রেজার মৃত্যুতে দেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু একজন সংবাদকর্মী হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেননি; একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠক, প্রশিক্ষক এবং তরুণ সাংবাদিকদের পরামর্শদাতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৭২ সালে সাংবাদিকতার যাত্রা
কাজিম রেজার সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা হয় ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে। স্বাধীনতার পরপরই তিনি সাপ্তাহিক চরমপত্রের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। সে সময় বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ছিল নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। এমন একটি সময়ে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী পাঁচ দশকে বিস্তৃত হয় দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিক সংগঠনে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক দেশ, সাপ্তাহিক রোববার, দৈনিক জনকণ্ঠসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন।
তার সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বাসস। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও বাসস ইউনিটের একটি সাংবাদিক ইউনিয়ন-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দেন, যা তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা-সম্পৃক্ততার সাম্প্রতিক প্রমাণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
রিপোর্টিং ছিল তার পেশাগত পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি
কাজিম রেজা সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, সংবাদ তৈরি এবং সাংবাদিকতার পেশাগত শৃঙ্খলা—এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
তার পেশাগত জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সংবাদকর্মীর পাশাপাশি সাংবাদিকতার পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করার কাজে সম্পৃক্ত থাকা। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার পাশাপাশি তিনি নিজেও সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
ফিলিপস পুরস্কার: পেশাগত স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
কাজিম রেজার সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম বড় অর্জন ফিলিপস পুরস্কার লাভ। এ পুরস্কার তার পেশাগত দক্ষতা ও সাংবাদিকতায় অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের পেশাগত সাফল্য যেমন স্বীকৃতি পেয়েছিল, তেমনি সাংবাদিকতার প্রতি তার নিষ্ঠাও বৃহত্তর পরিসরে পরিচিতি লাভ করে।
সাংবাদিক সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা
কাজিম রেজা শুধু সংবাদপত্রের নিউজরুম বা রিপোর্টিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও সংগঠনের সঙ্গেও তিনি দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন।
তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক দফতর সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহকারী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা তাকে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ, অধিকার ও কল্যাণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেয়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে সাংবাদিক মহলে তিনি একজন প্রবীণ সহকর্মী ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
সাংবাদিক তৈরির কারিগর
কাজিম রেজার কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাংবাদিক প্রশিক্ষক হিসেবে তার ভূমিকা।
তিনি সাংবাদিকতা বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজেও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। তার প্রশিক্ষণ ও পেশাগত প্রস্তুতির মধ্যে ছিল প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) প্রথম প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, রিপোর্টিংয়ের ওপর পিআইবির একাধিক কোর্স এবং নেপালে সাংবাদিকতা বিষয়ে স্টাডি ট্যুর।
এছাড়া সাংবাদিক প্রশিক্ষকদের জন্য ডানিডার বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও তিনি অংশ নেন।
প্রশিক্ষক হিসেবে তার কাজের ব্যাপ্তিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ডানিডার মানবাধিকারবিষয়ক প্রকল্পের আওতায় তিনি ১২টি কর্মশালা ও আটটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেয়া প্রায় ২৫০ সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। অর্থাৎ, নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা তিনি পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নেতৃত্বের দায়িত্ব
দীর্ঘ কর্মজীবনে কাজিম রেজা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক দেশ ও সাপ্তাহিক রোববারের চিফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দেশের বাইরেও সাংবাদিকতা ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে কাজিম রেজার ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও ছিল বিস্তৃত। তিনি পাকিস্তান, আফগানিস্তান, আজাদ কাশ্মীর, কাতার, নেপাল ও মরক্কো ভ্রমণ করেছেন।
এসব সফর তার দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বোঝার সুযোগকে বিস্তৃত করেছিল। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য দেশের বাইরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া সংবাদ বিশ্লেষণ ও রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
পারিবারিক পরিচয়
কাজিম রেজা ছিলেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামের এক শিক্ষিত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান। তার পিতা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ মুসা কাজিম নুরী এবং মা ছিলেন চাঁদপুরের প্রথম নারী শিক্ষিকা হিসেবে পরিচিত সৈয়দা সাইয়েদা বানু।
শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বেড়ে ওঠা তার ব্যক্তিত্ব ও পেশাগত জীবনেও প্রভাব ফেলেছিল বলে তার জীবনবৃত্তান্ত থেকে প্রতীয়মান হয়।
স্ত্রীর মৃত্যুর শোকের মধ্যেই বিদায়
কাজিম রেজার মৃত্যুর ঘটনাটি আরও বেদনাবিধুর হয়ে উঠেছে তার পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে। তার স্ত্রী মৃত্যুর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তিনিও মারা গেলেন। ফলে একই সময়ে পরিবারকে পরপর দুটি বড় শোকের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি দুই কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের পরিচিত মুখ
অবসর-পরবর্তী সময়েও সাংবাদিকতা ও সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়নি। অবসর নেয়ার পর তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবে দিনের বড় একটি অংশ কাটাতেন। সেখানে তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। ক্লাবের দখিনের বারান্দায় সকাল-দুপুরে খাবার সেরে বাকি সময় কাটাতেন মিডিয়া সেন্টারে। অন্যরা যখন দেশীয় রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় মত্ত তখন কাজিম রেজার আলোচনায় ওঠে আসতো আন্তর্জাতিক খরবাখবর।

তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন শোক প্রকাশ করে। মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান সংগঠনগুলি।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































