ছবি : আপন দেশ
বাংলাদেশে পান খাওয়া কেবল একটি অভ্যাস নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাবারের পর, আড্ডায় কিংবা বিয়েবাড়ির উৎসবে পান ছাড়া যেন চলেই না। কিন্তু এ প্রচলিত অভ্যাসে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ এক স্বাস্থ্যঝুঁকি। বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্পষ্টভাবে বলছে, পানের সঙ্গে জড়িত উপাদান, বিশেষত সুপারি এবং তাতে মেশানো জর্দা বা গুলের মতো তামাকজাত দ্রব্যগুলো মুখগহবর বা মুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
দেশের ক্যান্সার চিত্র ও উদ্বেগজনক তথ্য
আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বাধিক শনাক্ত হওয়া ক্যান্সার হলো ঠোঁট ও মুখগহবরের। ওই বছর দেশে প্রায় ১৬ হাজার নতুন রোগী এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন, যা দেশের মোট ক্যান্সার রোগীর প্রায় ১০ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, এটি আমাদের দেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এটি এত বিপজ্জনক?
পানের উপাদানে থাকা রাসায়নিকগুলো মুখের ভেতরের কোষকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে ‘ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস’ নামের একটি অবস্থা তৈরি হয়, যা ক্যান্সার হওয়ার ঠিক আগের ধাপ। সহজ কথায় পানের সঙ্গে জর্দা, গুল বা সাদা পাতা মেশালে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এমনকি যারা তামাক ছাড়া কেবল সুপারি দিয়ে পান খান, গবেষণায় দেখা গেছে তাদের ঝুঁকিও সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।
বিপুল মানুষ ঝুঁকির মুখে
সাম্প্রতিক জাতীয় পর্যায়ের জরিপ ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৩১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত পানের কোনো না কোনো রূপ ব্যবহার করেন। অন্যদিকে দেশে চিবানো তামাক (জর্দা, গুল) ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ, অর্থাৎ দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী সরাসরি মরণঘাতী ক্যান্সারের ঝুঁকিতে মধ্যে রয়েছেন।
আরও পড়ুন<<>>লিভার ট্রান্সপ্লান্টসহ বিশ্বমানের চিকিৎসা চালুর ঘোষণা
প্রতিরোধ সম্ভব
আশার কথা হলো, মুখের ক্যান্সার অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। যদি পান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের এ অভ্যাস ত্যাগ করা যায়, তবে দেশে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেখানে এ অভ্যাস অত্যন্ত প্রচলিত, সেখানে জনসচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
আপনার ও পরিবারের সুরক্ষায় করণীয়
অভ্যাস ত্যাগ করুন: এটি সহজ নয়, তবে জীবনের চেয়ে বড় নয়। পান, জর্দা, গুল ও সাদাপাতা ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।
লক্ষণ খেয়াল করুন: মুখের ভেতরে সাদা বা লাল দাগ, কোনো ক্ষত যা শুকাচ্ছে না, দীর্ঘস্থায়ী ঘা কিংবা খাবার গিলতে সমস্যা হলে দেরি না করে দ্রুত ডেন্টাল সার্জন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শুরুতে ধরা পড়লে চিকিৎসার ফল অনেক ভালো হতে পারে।
সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবার ও তরুণ প্রজন্মকে পানের ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝিয়ে বলুন। অনেকেই মনে করেন শুধু সুপারি ক্ষতিকর নয়, বরং তাদের ভুল ভেঙে দেওয়া জরুরি।
আইনের প্রয়োগ: তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র সতর্কবার্তা এবং বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতির কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
উপসংহার
পান আমাদের সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য হলো এটি একটি নীরব ঘাতক। আজ আপনি পানের খিলিটি বর্জন করার যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা হয়তো আপনার ও আপনার পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে। সব ক্যান্সার অনিবার্য নয়, সচেতনতার মাধ্যমে কিছু ক্যান্সার রুখে দেয়া সম্ভব।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































