সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের এ সময়ে আবারও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন মাহফুজ আনাম- একজন সম্পাদক, যিনি নিজেকে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর হিসেবে উপস্থাপন করলেও তার অতীত ভূমিকা, সম্পাদকীয় অবস্থান এবং রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ নিয়ে তার সাম্প্রতিক উপসম্পাদকীয় নতুন করে সে প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। সমালোচকদের মতে, তার লেখায় নীতিগত উদ্বেগের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পক্ষপাত, অবস্থান বদলের প্রবণতা এবং ক্ষমতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার পুরোনো অভ্যাস।
তার সম্পাদিত The Daily Star-এ প্রকাশিত লেখায় তিনি নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের যোগ্যতা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য- এ প্রশ্নগুলো নিরপেক্ষ অনুসন্ধান নয়; বরং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট একটি বর্ণনা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কারণ অতীতে ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিতর্কে তার নীরবতা বা বিপরীত অবস্থান ছিল লক্ষণীয়।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাহফুজ আনাম প্রকাশ্যে নিজেকে সরকারের ‘আজীবন শুভাকাঙ্ক্ষী’ ঘোষণা করেছিলেন। সে সময় বা তার আগের দুর্নীতি, গণমাধ্যম দমন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক মামলার বিস্তারসহ নানা অভিযোগ উঠলেও তার সম্পাদকীয় অবস্থান ছিল আশ্চর্যজনকভাবে নমনীয়। সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কার্যত সরকারের পক্ষে জনমত গঠনের ভূমিকায় ছিলেন। তবে বিদ্রূপাত্মকভাবে, সে সময় তোষামোদি অবস্থান সত্ত্বেও ‘মব’-এর আক্রমণ থেকে নিজের পত্রিকা অফিস রক্ষা করতে পারেননি; এমনকি অগ্নিসংযোগকারীদের শনাক্ত বা বিচারের আওতায় আনতেও পারেননি ড. ইউনূস। এ ঘটনাকে অনেকে তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সীমাবদ্ধতার প্রতীক হিসেবে দেখেন।
সমালোচকদের আরও দাবি, তার লেখালেখিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তারেক রহমানকে দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যা প্রতিপক্ষদের রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে ভূমিকা রাখে। অথচ সময়ের পরিবর্তনে সে একই ব্যক্তির সঙ্গে করমর্দনের দৃশ্য জনমনে প্রশ্ন তুলেছে- এ কি নীতির পরিবর্তন, নাকি ক্ষমতার সমীকরণ বদলের সঙ্গে অবস্থান বদল? নতুন সরকার গঠনের মাত্র দশ দিনের মাথায় তার কঠোর সমালোচনা সে প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে।

মাহফুজ আনামের সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত জরুরি অবস্থা- যা ‘১/১১’ নামে পরিচিত। সে সময় গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহ করা যাচাইবিহীন তথ্য প্রকাশ করে রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্রহননের অভিযোগ ওঠে তার পত্রিকার বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে তিনি টেলিভিশন টকশোতে স্বীকার করেন যে যাচাই ছাড়াই সে সংবাদ প্রকাশ করা ছিল ভুল এবং শেখ হাসিনা সরকারের আমলে জাতির কাছে ক্ষমাও চান। সমালোচকদের মতে তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের পক্ষে জনমত তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে দুর্বল করেছিল।
নতুন প্রজন্মের একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে তাকে ও তার মতো সম্পাদকদের ‘প্রতিবেশী দেশের দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সমালোচনা করে থাকেন। একইভাবে The Daily Star-কে ব্যঙ্গ করে ‘দিল্লি স্টার’ নামে উল্লেখ করার প্রবণতাও দেখা যায়। সমালোচকদের দাবি, পত্রিকাটি দেশবিরোধী ও ভারতীয় ন্যারেটিভ তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে- যদিও এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে পত্রিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বহুবার আপত্তি জানিয়েছে। তবুও জনমনে এ ধারণার বিস্তার গণমাধ্যমের প্রতি আস্থাহীনতার একটি লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।
তার লেখালেখিতে ক্ষুব্ধ হয়ে অতীতে পত্রিকাটির কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছিল- যা গণমাধ্যম ও জনমানসের সম্পর্কের চরম অবনতি নির্দেশ করে। সমালোচকদের মতে, সম্পাদকীয় অবস্থানের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এতটাই গভীর হয়েছিল যে তা সহিংস প্রতিক্রিয়ায় রূপ নেয়। যদিও সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এ ঘটনা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটের একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।

গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টি তুলে ধরে তার নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে পুনঃতফসিল সবসময় অপরাধের সমার্থক নয়; এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ এবং বৈধ প্রক্রিয়ার মধ্যেই ঘটে। ফলে এ বিষয়টিকে ব্যক্তিগত অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করাকে অনেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন। একইভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন তুললেও অতীতে বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। 
সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি নয়; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং নীতি বাস্তবায়নের দৃঢ়তা গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, ভিন্ন অ্যাকাডেমিক পটভূমি থাকা সত্ত্বেও কার্যকর নেতৃত্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে। সে প্রেক্ষাপটে নতুন গভর্নরের কার্যকারিতা সময়ই নির্ধারণ করবে- আগাম নেতিবাচক রায় নয়।
সম্পাদক-প্রকাশক মাহফুজ আনামকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা আর কেবল ব্যক্তিগত বিতর্কের সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নৈতিক ভিত্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেই সরাসরি সম্পর্কিত। সমালোচকদের মতে, বারবার অবস্থান বদল, ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা, রাজনৈতিক চরিত্র নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা এবং জনমতের প্রতি ঔদাসীন্য- এসব মিলিয়ে তিনি এমন এক সম্পাদকীয় সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যেখানে সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে প্রভাব বিস্তারই মুখ্য। তাদের ভাষায়, এ ধারা অব্যাহত থাকলে গণমাধ্যম জনস্বার্থের প্রহরী নয়, বরং ক্ষমতার খেলায় অংশগ্রহণকারী এক পক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবে- এবং সে অবিশ্বাসের ভার বহন করতে হবে পুরো সাংবাদিকতা পেশাকেই।
লেখক: আফজাল বারী, সাংবাদিক ও প্রধান সম্পাদক, ডেইলি আপন দেশ ডটকম, ই-মেইল: [email protected]
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।



































