ছবি সংগৃহীত
দেশে বংশগত রক্তরোগ থ্যালাসেমিয়া রোগী দিনদিন বাড়ছে। ৮ বছরে বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। প্রতিবছর ৬ থেকে ৮ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। বর্তমানে দেশে ৭০ হাজারের বেশি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগী রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোগটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে আজ ০৮ মে (শুক্রবার) সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস-২০২৬’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য-‘আর নয় আড়ালে : শনাক্ত হোক অজানা রোগী, পাশে দাঁড়াই অবহেলিতদের’।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি জটিল বংশগত রক্তরোগ; যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানবকোষে রক্ত তৈরি করার জন্য দুটি জিন থাকে। কোনো ব্যক্তির রক্ত তৈরির একটি জিনে ত্রুটি থাকলে তাকে থ্যালাসেমিয়া বাহক বলে। আর দুটি জিনেই ত্রুটি থাকলে তাকে থ্যালাসেমিয়া রোগী বলে। তবে সব বাহকই রোগী না। শিশু জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ে। এ রোগের লক্ষণগুলো হলো-ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘনঘন রোগ সংক্রমণ, শিশুর ওজন না বাড়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ প্রভৃতি।
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জাতীয় থ্যালাসেমিয়া জরিপ-২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের ১১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া ও হিমোগ্লোবিন-ই রোগের বাহক।
অর্থাৎ, নিজের অজান্তেই প্রায় দুই কোটি মানুষ ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করছে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতির সহযোগিতায় বিবিএস ৬৪ জেলা ও ৪৫৪ উপজেলার ১৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সী আট হাজার মানুষের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে এ তথ্য পেয়েছে।
আরও পড়ুন<<>>একদিনে হাম উপসর্গে আরও ১২ জনের মৃত্যু
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ১১ হাজার ৪০ জন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম নেয়। বর্তমানে দেশে আনুমানিক পাঁচ লাখ ৫২ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে, যাদের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়মিত রক্তসঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ। শরীরে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে ত্রুটির কারণে আক্রান্তদের শরীরে অক্সিজেন পরিবহন কমে যায়। ফলে দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস, অরুচি, পেট ব্যথা ও শারীরিক বৃদ্ধিতে ধীরগতির মতো সমস্যা দেখা দেয়। তবে বাহক মানেই রোগী নয়। অধিকাংশ বাহক স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, সাধারণ মানুষের রক্তকণিকা ১২০ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকলেও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রক্তকণিকা মাত্র ৩০ দিন টিকে থাকে। মা-বাবা দুজনই বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ এবং বাহক হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ। যথাযথ চিকিৎসা না পেলে রোগীর হিমোগ্লোবিন ৩ থেকে ৪ গ্রাম পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। এতে তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় এবং হৃৎপিণ্ড, যকৃতসহ বিভিন্ন অঙ্গ বিকলের ঝুঁকি বাড়ে বলেও জানান তারা।
চিকিৎসকদের মতে, থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটি সম্পূর্ণ বংশগত। সাধারণত রক্ত পরীক্ষা ও হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফরেসিস পরীক্ষার মাধ্যমে বাহক শনাক্ত করা সম্ভব। তাই বিয়ের আগে স্ক্রিনিংকে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাহক শনাক্ত করে দুই বাহকের মধ্যে বিয়ে এড়ানো গেলে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি প্রিনেটাল টেস্টের মাধ্যমে গর্ভের শিশুর থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা, তা আগেই জানা যায়।
এদিকে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন মালিবাগ কার্যালয়ে সচেতনতামূলক র্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি, মেডিকেলের হেমাটোলজি বিভাগসহ বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করবে।
আপন দেশ/জেডআই




































