Apan Desh | আপন দেশ

বিশ্ব শিক্ষক দিবস

নিরবে নিভৃতে মানুষ গড়েন যারা

এম জাফিউল ইসলাম

প্রকাশিত: ০৯:৪৬, ৫ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ০৯:৪৭, ৫ অক্টোবর ২০২৬

নিরবে নিভৃতে মানুষ গড়েন যারা

গ্রাফিক্স ছবি

সকাল হতেই শ্রেণিকক্ষের দরজা খোলেন তিনি। হাতে বই, সামনে একঝাঁক কৌতূহলী মুখ। কেউ স্বপ্ন দেখে চিকিৎসক হওয়ার, কেউ প্রকৌশলী, কেউবা বিজ্ঞানী কিংবা শিক্ষক। তাদের সে স্বপ্নের ভিত গড়ে দিতে দিনের পর দিন নিরলসভাবে কাজ করেন একজন শিক্ষক। তার নিজের জীবনের গল্প হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, কিন্তু তার হাতে তৈরি শিক্ষার্থীরাই একদিন হয়ে ওঠে সমাজ ও রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি।

আজ ০৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের দিনটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সে মৌলিক সত্য—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে নীরব অথচ শক্তিশালী কারিগর শিক্ষকসমাজ।

পাঠ্যবইয়ের বাইরে যে শিক্ষা : শিক্ষকের কাজ কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়। একটি শিশুকে কীভাবে দায়িত্বশীল মানুষ হতে হয়, কীভাবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, পরাজয়ের পর আবার উঠে দাঁড়াতে হয়—এসব শিক্ষাও অনেক সময় আসে শিক্ষকের কাছ থেকেই।

পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করা যেমন শিক্ষকের দায়িত্ব, তেমনি তার চরিত্র, চিন্তাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও শিক্ষকের বড় দায়িত্ব। একটি উৎসাহের বাক্য, একটি সঠিক পরামর্শ কিংবা সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানো—একজন শিক্ষকের এমন ছোট্ট উদ্যোগই কখনো কখনো বদলে দিতে পারে একটি শিক্ষার্থীর পুরো জীবন।

সাফল্যের মঞ্চে শিক্ষার্থী, নেপথ্যে শিক্ষক: সমাজে যখন কোনো শিক্ষার্থী বড় সাফল্য অর্জন করেন, তখন আলো পড়ে তার ওপর। সংবাদপত্রে তার ছবি প্রকাশিত হয়, অভিনন্দনে ভাসেন তিনি। কিন্তু সে সাফল্যের পেছনে থাকা শিক্ষকের নামটি অনেক সময় থেকে যায় আড়ালে।

আজকের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, সাহিত্যিক কিংবা রাজনীতিক—প্রত্যেকের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এমন একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি তাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করেছেন কিংবা কঠিন সময়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন।

একজন শিক্ষক তাই শুধু একটি শ্রেণির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি নন; তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মাতা।

বদলে গেছে শ্রেণিকক্ষ, বেড়েছে চ্যালেঞ্জ: প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ শিক্ষাব্যবস্থাকে যেমন নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে, তেমনি শিক্ষকদের সামনে তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এখন শিক্ষার্থীর হাতে শুধু পাঠ্যবই নয়; রয়েছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও অসংখ্য অনলাইন উৎস। তথ্য পাওয়া এখন সহজ, কিন্তু সঠিক তথ্য বেছে নেয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

ফলে বর্তমান সময়ে শিক্ষককে শুধু তথ্য প্রদানকারী হিসেবে থাকলে চলে না। তাকে হতে হচ্ছে তথ্য যাচাইয়ের পথপ্রদর্শক, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের পরামর্শদাতা এবং মূল্যবোধের শিক্ষকও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের যুগে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ ও মানবিকতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে।

আরও পড়ুন<<>>বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ

প্রান্তিক শিক্ষকের গল্প আলাদা: শহরের আধুনিক শ্রেণিকক্ষের বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রতিদিন শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন অসংখ্য শিক্ষক। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা উপকরণের সংকট কিংবা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

অনেক শিক্ষক নিজের সময় ও শ্রমের অতিরিক্ত অংশ ব্যয় করেন পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকই হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীর অভিভাবক, পরামর্শদাতা এবং আশ্রয়। তাদের এ নীরব অবদান পরিসংখ্যানের পাতায় সবসময় ধরা পড়ে না; কিন্তু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

শিক্ষক কেমন আছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ: শিক্ষার মান উন্নয়নের আলোচনা হলে শিক্ষার্থী, পাঠ্যক্রম, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির কথা বলা হয়। কিন্তু এর কেন্দ্রে থাকা শিক্ষক কেমন আছেন—সে প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত মর্যাদা। একজন শিক্ষক যদি নিজের পেশায় সম্মান ও নিরাপত্তা অনুভব করেন, তবে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে শ্রেণিকক্ষেও।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই শুধু ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবারও দিন।

নীরব কারিগরদের প্রাপ্য স্বীকৃতি: একজন শিক্ষক হয়তো জানেন না, তার শেখানো একটি বাক্য কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে। হয়তো তিনি জানেন না, তার দেয়া সামান্য উৎসাহই কোনো একদিন কোনো শিক্ষার্থীকে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে যায়, কর্মজীবনে প্রবেশ করে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের স্রোতে অনেকেই হয়তো ভুলে যায় প্রাথমিক সে মানুষটির কথা, যিনি প্রথম তাকে বই খুলে পড়তে শিখিয়েছিলেন, ভুল করলে সংশোধন করেছিলেন এবং বলেছিলেন—“তুমি পারবে।”

কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক থেমে থাকেন না। নতুন প্রজন্ম আসে, নতুন মুখ আসে, নতুন স্বপ্ন আসে। আর তিনি প্রতিদিন আবারও শুরু করেন মানুষ গড়ার কাজ।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শ্রদ্ধা তাদের প্রতি—যারা প্রচারের আলোয় নয়, নিরবে-নিভৃতে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। কারণ একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে যে পাঠ শুরু হয়, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে। একজন শিক্ষক হয়তো একসঙ্গে কয়েক ডজন শিক্ষার্থীকে পড়ান; কিন্তু তার হাতে তৈরি একজন মানুষই একদিন বদলে দিতে পারে শত শত, হাজার হাজার মানুষের জীবন।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়