ছবি : আপন দেশ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান দিতে চাপে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। রাজধানীর বাজারগুলোতে মাছ, মুরগি, ভোজ্যতেল ও সবজিসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
সীমিত আয়ের মানুষেরা প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে যেসব মাছ বা মুরগি বেশি কেনেন, এখন সেগুলোর দামও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এক বছর আগে যে সোনালি মুরগির কেজি ছিল ২৩০ থেকে ২৬০ টাকা, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা দরে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় দেড়শ টাকা। গত এক মাসের হিসেবেই সোনালি মুরগির দাম বেড়েছে অন্তত ১০০ টাকা।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাচ্চার দাম ও মুরগির খাদ্যের চড়া দামের কারণে অনেক খামারি উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন রোগের কারণেও অনেক মুরগি মারা গেছে, যার ফলে সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। তবে সাধারণ ক্রেতারা ব্যবসায়ীদের এ যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন। ক্রেতা আসিফ হোসেন জানান, ব্যবসায়ীরা সরবরাহের অজুহাত দেখিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রাতারাতি দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
বেড়েছে ডিমের দামও। ফার্মের মুরগির প্রতি ডজন ডিম ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১১০ টাকার মধ্যে। পাড়া-মহল্লার কিছু কিছু খুচরা দোকানে ডিম ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা ডজনে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মাছের বাজারেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। মাঝারি আকারের রুই মাছ যা আগে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ৩৫০ টাকার নিচে কল্পনাও করা যায় না। আকারে একটু বড় হলেই রুইয়ের দাম ৪০০ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শুধু রুই নয়, নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা তেলাপিয়া, কই ও পাঙাশ মাছের দামও এখন উর্ধ্বমুখী। প্রতি কেজি টেংরা ৬৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৩০ টাকা, রুই ৩০০ টাকা, ব্রিগেড ১৮০ টাকা, পোয়া ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বাইলা ৬০০ টাকা, চিংড়ি ৪০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং পাবদা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
গ্রীষ্মের নতুন সবজি আসলেও সেগুলোর দামও বেশ চড়া। বিক্রেতারা আশা করছেন সরবরাহ বাড়লে সবজির দাম কিছুটা কমতে পারে। বাজারে প্রতি কেজি গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, বরবটি প্রতি কেজি ১০০ টাকা, ঝিঙ্গা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, করলা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, মুলা প্রতি কেজি ৫০ টাকা, শসা প্রতি কেজি ৬০ টাকা, শিম প্রতি কেজি ৮০ টাকা, পটল প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আরও পড়ুন<<>>স্বর্ণ-রুপার আজকের বাজারদর
এ ছাড়া ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৫০ টাকা, বাঁধা কপি প্রতি পিস ৪০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কচুর লতি প্রতি কেজি ৮০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৭০ থেকে ৮০ টাকা, সজিনা প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কলা প্রতি হালি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে কম রয়েছে কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজের দাম। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা ও পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা যেন কাটছেই না। বাজারে ঠিকঠাক বোতলজাত সয়াবিন মিলছে না। দোকানগুলোতে ৫ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল মিললেও সরবরাহ কম। আধা লিটার, এক ও দুই লিটারের বোতল বেশিরভাগ দোকানেই পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু দোকানে খোলা সয়াবিন তেল মিললেও তা বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশিতে।
এখন সরকার নির্ধারিত এক লিটার বোতলজাত তেলের দাম ১৯৫ টাকা। অন্যদিকে, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা ও পাম তেলের নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা। তবে বাজারে খোলা সয়াবিন ২০০ থেকে ২১০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর পাম বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়।
খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ডিলাররা তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থা মাসখানেকের বেশি সময় ধরে চললেও গত তিন-চারদিন ধরে একেবারে অর্ডার নেয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন।
চিনির বাজারেও অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। খুচরা পর্যায়ে এক কেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায়, যা দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় অন্তত ৫ টাকা বেশি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের এ আকাশছোঁয়া দামের কারণে মানুষ তাদের প্রাত্যহিক খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক পরিবার মাছ বা মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে সবজি দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সবজির দামও চড়া থাকায় সেখানেও শান্তি মিলছে না।
অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি ও বাজার তদারকির অভাবে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাদের মতে, নিয়মিত বাজার অভিযান ও সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এ বিশাল ফারাক মধ্যবিত্ত সমাজকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































