ছবি: আপন দেশ
দেশে দুর্নীতি ও লুটপাটের শীর্ষে যতগুলো প্রকল্প আছে তারমধ্যে অন্যতম ‘পদ্মা রেল সেতু প্রকল্প’। আর এ প্রকল্পের শীর্ষ দুর্নীতিবাজের অন্যতম হলেন-প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন। যিনি ওই প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ছিলেন। এখন রেলের মহাপরিচালক (ডিজি)। পদ্মা সেতু রেল লাইনের চেয়েও টাকার অঙ্কে দীর্ঘ হয়েছে প্রকৌশলী আফজালের চুরির নথি।
৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকা দুর্নীতি করেছেন প্রকৌশলী আফজাল হোসেন। সঙ্গে ছিলেন-কয়েক নারী কর্মকর্তা। দুর্নীতির এ মহোৎসব সাধারণ মানুষকে আঁতকে তুলেছে, প্রশাসনকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। তারপরও দুর্নীতিবাজরা সাজার বদলে পুরস্কৃত হচ্ছেন।
প্রকৌশলী আফজাল হোসেনকে নিয়ে ‘আপন দেশ’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি। চার পর্বের প্রতিবেদনের আজকের পর্ব ‘১৩ হাজার কোটি টাকা চুরি করেও রেলে আফজালের ডিজিগিরি’।
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পটি দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল রেলপথ হিসেবে পরিচিত। প্রকল্পটি শুরু থেকেই অস্বাভাবিক ব্যয়, অনিয়ম, অডিট আপত্তি এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অডিট প্রতিবেদন, প্রশাসনিক সূত্র এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী- প্রকল্পটির পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত নানা স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
২০১৬ সালে একনেকে পদ্মা রেল সেতু প্রকল্প অনুমোদনের সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। কিন্তু অনুমোদনের মাত্র দুই বছরের মাথায়, ২০১৮ সালে প্রকল্পের ব্যয় এক ধাক্কায় বাড়িয়ে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা করা হয়। অর্থাৎ একবারেই ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় প্রায় ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের শুরুতেই ভুয়া হিসাব-নিকাশ ও অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখিয়ে প্রকল্পের খরচ কয়েকগুণ বাড়িয়ে ধরা হয়েছিল, যাতে পরবর্তীতে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন কম ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রস্তুত, ঠিকাদার নিয়োগ এবং বাস্তবায়নের প্রায় সব পর্যায়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। দরপত্র যাচাই ছাড়াই চীনা ঠিকাদারদের কাজ দেয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার রাজনৈতিক প্রভাব এবং চীনা ঠিকাদারদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল-এমন তথ্য দিয়েছে দুদক।
আরও পড়ুন<> শেখ রেহানার আফজাল এখন শেখ রবির রেলের ডিজি
সরকারের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পটিতে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে মোট ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকার অনিয়মকে ‘গুরুতর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যেগুলোকে ‘মীমাংসাযোগ্য নয়’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
অডিটে যেসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে ৫৫৬ কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন। রেললাইন নির্মাণে কম উচ্চতায় মাটি ভরাট করেও অতিরিক্ত বিল নিয়ে ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি সাধন করেছেন। বালুর স্তর কম ব্যবহার করেও ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল প্রদান করেছেন। প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে প্রকল্পে ১৭.১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যে ইপিসি/টার্নকি চুক্তি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা রেলস্টেশন নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকায় স্টেশন নির্মাণ সম্ভব ছিল, সেখানে ১৫০ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আফজাল হোসেনই কৌশলে এ ব্যয়বহুল স্টেশনকে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেন।
আরও পড়ুন<<>> মোরশেদ আলমের ‘শরীয়াহ ভিত্তিক’ দুর্নীতি! ন্যাশনাল লাইফের শতকোটি লুট
মো. আফজাল হোসেন দীর্ঘ সময় এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে ডিপিপি প্রস্তুত, প্রকল্প অনুমোদন এবং ব্যয় বৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপে সরাসরি ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, চীনা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে প্রতিটি বিল পরিশোধের বিপরীতে কমিশন গ্রহণ এবং সাব-কন্ট্রাক্টর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ চুরি করেছেন। তাতে সমর্থন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। শেখ রেহানার কালেক্টর হিসেবে বহুলপরিচিতি আফজাল হোসেনকে ওবায়দুল কাদের তারপাতানো ‘পুত্র’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন। সে থেকেই প্রকৌশলীপাড়ায় তিনি ‘ওকাপুত্র’ হিসেবে খ্যাত।
দুর্নীতির তুলনামুলক ভয়ঙ্কর চিত্র
১) এ প্রকল্পের ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি গড় ব্যয় হয়েছে প্রায় ২২৫ থেকে ২২৮ কোটি টাকা (প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২০.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বাংলাদেশেই একই সময়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) অর্থায়নে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪৪.৭১ কোটি টাকা। সে তুলনায় জিটুজি (G2G) পদ্ধতিতে নির্মিত পদ্মা রেল লিংকের কিলোমিটারপ্রতি খরচ ছিল প্রায় ৫ গুণ বেশি। এটি আন্তর্জাতিক মানের চেয়েও অনেক উচ্চ।
২) পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে জিটুজি (G2G) পদ্ধতি ও একক ঠিকাদার সিন্ডিকেট: এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে চীন ও বাংলাদেশ সরকারের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে। এতে কোনো উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র (Open Tender) ছিল না। চীন সরকার নিজেই তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান 'চায়না রেলওয়ে গ্রুপ' (CREC)-কে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেয়। প্রতিযোগিতা না থাকায় ঠিকাদারের দেয়া চড়া দামেই কাজ লুফে নেয়া হয়, যা মেগা-দুর্নীতির অন্যতম বড় উৎস বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
৩) ভূমি অধিগ্রহণ ও ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ: রেলপথের জন্য মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণের সময় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৫-২৬ নাগাদ) মাদারীপুরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের প্রায় ১০ কোটি টাকা ভুয়া নথিপত্র এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে।
৪) বিলাসী ব্যয় ও কেনাকাটায় অতিমূল্যায়ন: প্রকল্পটির অধীনে বিভিন্ন স্টেশন বিল্ডিং, সিগন্যালিং সিস্টেম এবং আসবাবপত্র কেনাকাটায় অস্বাভাবিক মূল্য ধরার অভিযোগ ওঠে। যেমন, প্রকল্পের অডিট ও পরবর্তীতে ব্যয় কাটছাঁটের অংশ হিসেবে শুধু ফরিদপুরের ভাঙ্গা জংশন স্টেশনেই টাইলস, কমোড ও অতিরিক্ত এসি বাদ দিয়ে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছিল, যা প্রমাণ করে শুরুতে এখানে বিশাল অঙ্কের আর্থিক অপচয় বা অনিয়মের ছক ছিল।
৫) পরামর্শক ও ভৌত অবকাঠামো খাতের নামে অর্থ লোপাট: প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশায় বারবার ত্রুটি রেখে প্রকল্প সংশোধন করা হতো। ঢাকা প্রান্তের রেল ভায়াডাক্টের উচ্চতা সংক্রান্ত ভুলের কারণে প্রায় এক বছর কাজ ঝুলে ছিল। এ ধরনের কৃত্রিম বিলম্ব সৃষ্টি করে পরামর্শক ফি এবং ওভারহেড কস্ট বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
৬) আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত: বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে পদ্মা বহুমুখী সেতু ও এর রেল সংযোগ প্রকল্পের সামগ্রিক আর্থিক অনিয়ম, বাড়তি ব্যয় এবং প্রভাবশালীদের অবৈধ সুবিধা নেয়ার বিষয়গুলোর ওপর তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে প্রকৌশলী আফজালের টাকার দেয়াল টপকে উঠতে পারছে না দুদকের তদন্ত।
আরো কারা জড়িত?
প্রকল্পের আরেক আলোচিত কর্মকর্তা নাজনীন আরা কেয়া। শুরুতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, পরে প্রধান প্রকৌশলী এবং বর্তমানে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আফজাল হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ত ছিলেন।
উপপরিচালক শামীমা নাসরিন (বিথি), ফারহানা সুলতানা, যুগ্মসচিব মীর আলমগীর হোসেন, উপসচিব হোসনে আরা এবং পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের চক্র ছিল বলেও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। অডিট আপত্তি ধামাচাপা দিতে এবং তদন্ত প্রভাবিত করতে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক কাজ করেছে।
রেলওয়ে বিশ্লেষক নাজমুল হকের মতে, পদ্মা সেতু চালুর পর একই রুটে পৃথক রেল সেতুর প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন ছিল। যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের যে পূর্বাভাস দেখিয়ে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। প্রকল্পে ২৪ জোড়া ট্রেন চলাচলের কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র কয়েক জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে এবং মালবাহী ট্রেন এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্প আর্থিকভাবে লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। চীন থেকে কমদামে সজঞ্জামাদি এনে ১০ থেকে ক্ষেত্র বিশেষ ২০গুণ বেশি বিল সাবমিটের নজির স্থাপন করা হয়েছে এ প্রকল্পে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের অনিয়ম, অস্বাভাবিক ব্যয় ও অডিট আপত্তির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হলে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা কঠিন হবে। একইসঙ্গে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অবস্থান ভবিষ্যৎ তদন্ত ও জবাবদিহি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
গতপর্বের মতোই এবারের অভিযোগসমুহ নিয়ে কোনো মন্তব্য দিতে সাড়া দেননি প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন।
তৃতীয় পর্ব পড়তে ও জানতে আপন দেশ-এর সঙ্গে থাকুন।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































