ছবি: সংগৃহীত
দেখতে সাধারণ একটি কলম। সহজেই পকেটে রাখা যায়, সন্দেহ হওয়ারও সুযোগ কম। কিন্তু ট্রিগার চাপলেই বেরিয়ে আসে প্রাণঘাতী বুলেট। মুহূর্তেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অপরাধ।
এমন ছদ্মবেশী অস্ত্র ‘পেন গান’ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মধ্যে। সম্প্রতি রাজধানীর পুরান ঢাকায় এক যুবককে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় এ অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য সামনে আসে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া পেন গানটি ভারতীয় তৈরি। তবে কী পরিমাণে এ ধরনের অস্ত্র দেশে প্রবেশ করেছে বা অপরাধ জগতে ছড়িয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র দেখলে মানুষ অন্তত সতর্ক হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু পেন গান দেখতে একেবারে কলমের মতো হওয়ায় লক্ষ্যবস্তু বুঝে ওঠার আগেই গুলিবিদ্ধ হতে পারেন।
ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, এ অস্ত্রটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। সাধারণ পিস্তল বা আগ্নেয়াস্ত্র দেখলে মানুষ আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু কলমের মতো দেখতে হওয়ায় কেউ বুঝতেই পারবে না এটি প্রাণঘাতী অস্ত্র।
তিনি আরও বলেন, অপরাধীরা খুব সহজেই এটি বহন করতে পারে। এমনকি কাউকে ‘একটু কাগজ দেন’ বলেও মুহূর্তে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যেতে পারে।
তবে গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, এখন পর্যন্ত এ ধরনের অস্ত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মেলেনি।
যেভাবে সামনে এলো ‘পেন গান’
গত ৪ এপ্রিল রাতে রাজধানীর কোতোয়ালি থানার নয়াবাজার এলাকায় রাসেল নামে ৩১ বছর বয়সী এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। তিনি নিজেকে যুবদলের সদস্য বলে পরিচয় দিয়েছেন।
গুলিটি তার বুকের বাঁ পাশে লাগে। হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি বাসায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা হয়। তদন্তে নেমে ডিবি পুলিশ সায়মন ও সোহেল ওরফে কাল্লুসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয় আলোচিত পেন গানটি।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানিয়েছেন, প্রায় ৮০ হাজার টাকায় অস্ত্রটি সংগ্রহ করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন <<>> কৃষিজ প্রকল্প থেকে পর্যটন কেন্দ্র
ডিএমপির ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাধারণ বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রে নির্মাতা বা দেশের পরিচয় লেখা থাকে। কিন্তু উদ্ধার হওয়া পেন গানে এমন কোনো তথ্য ছিল না। পরে তদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, এটি ভারতের তৈরি।
তিনি জানান, অস্ত্রটির কার্যক্ষমতা, ক্ষতিকর দিক ও গুলির রেঞ্জ নির্ধারণে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ পরীক্ষা চালাচ্ছে।
ডিবিপ্রধান বলেন, গ্রেফতার সবাই বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। অস্ত্রটি কীভাবে দেশে এসেছে এবং কারা এর সরবরাহের সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নতুন নয় ‘পেন গান’
অপরাধ জগতের পুরোনো সূত্র বলছে, ঢাকায় পেন গানের উপস্থিতি একেবারে নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকে ফার্মগেট-রাজাবাজার এলাকায় মহসীন বাবু নামে এক যুবককে একাধিক পেন গানসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে সময় ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, পেন গান ব্যবহার করে গুলির ঘটনা এবারই বড় আকারে সামনে এলো।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছদ্মবেশী এ অস্ত্র টার্গেট কিলিং বা ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত অপরাধে ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সহজে বহনযোগ্য এবং সন্দেহের বাইরে থেকে ব্যবহার করা যায় বলেই এ ধরনের অস্ত্র অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।
তার মতে, ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক বিরোধে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড বা গুরুতর হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে পেন গান কতটা ছড়িয়ে পড়েছে এবং কারা এটি আনছে, তা খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে জানা যায়, হামলাকারীদের একজনের হাতে ছোট ও কিছুটা লম্বা আকৃতির একটি বস্তু ছিল। সেখান থেকেই রাসেলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। পরে তদন্তে নেমে গোয়েন্দা পুলিশ কলমের মতো দেখতে পেন গানটি উদ্ধার করে।
বর্তমানে মামলার আসামিরা কারাগারে রয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, পেন গানের উৎস, সরবরাহ চক্র এবং এর বিস্তার নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান চলছে।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































