Apan Desh | আপন দেশ

জেলের খাতায় বন্দি, হাসপাতালে ‘ঘাতক-দুর্নীতিবাজ’দের রাজকীয় জীবন

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৪:৪৬, ৭ জুন ২০২৬

আপডেট: ১৪:৫২, ৭ জুন ২০২৬

জেলের খাতায় বন্দি, হাসপাতালে ‘ঘাতক-দুর্নীতিবাজ’দের রাজকীয় জীবন

১) কামরুল ইসলাম, ২) গোলাম দস্তগীর গাজী, ৩) কামাল হোসেন মজুমদার ৪) মোরশেদ আলম ৫) কাজী জাফরউল্যাহ, ৬) ফজলে করিম চৌধুরী ৭) আমিরুল আলম মিলন। ফাইল ছবি।

প্রিজনভ্যান থেকে  নামানোর সময় খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলেন। বিধ্বস্ত অবয়ব আর করুণ চাহনিতে ফুটিয়ে তোলেন নিষ্পাপ ভাব। ‘মুমূর্ষু প্রায়’ অবস্থার ফিরিস্তি তুলে ধরেন জামিন আবেদনে। যেন ‘সরকার তাদের নির্দয়ভাবে অহেতুক,অকারণ কারাবন্দি করে রেখেছে।

ফ্যাসিবাদের ১৭টি বছর তারা যেন ভাজা মাছটিও উল্টিয়ে খেতেন না! চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থাকালে ১৪শ’রও বেশি মানুষকে হত্যার সঙ্গে তাদের দূরতম সংশ্লেষ নেই!ঋণের নামে ব্যাংক লুট করেননি! পাচার করেননি একটি টাকাও! ‘অবৈধ সম্পদ’ বলেও যেন তাদের কিছু নেই! বিচারের জন্য আদালতে তোলা হলে অসুস্থতার নাটক, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি, বক্তব্য ও আচার-আচরণের ফুটেজ নিপূণদক্ষতায় তুলে আনা হয় টিভি ক্যামেরায়। স্বৈরশাসকের সুবিধাভোগী মিডিয়াগুলো সেসব প্রচার করছে অহর্নিশ। উদ্দেশ্য-ফ্যাসিবাদের দোসর,আওয়ামী লুটেরা ও গণহত্যাকারীদের পক্ষে সহমর্মিতা উৎপাদন। বিচারের মুখোমুখি রাজনৈতিক পরিচয়ধারী এসব অপরাধীদের বাস্তবচিত্র এড়িয়ে যাচ্ছে এসব মিডিয়া। ডেইলি আপন দেশ ডটকমের বিশেষ প্রতিবেদকের নিজস্ব অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বিচারের মুখোমুখি অপরাধীদের বাস্তব হাল-হকিকত। 

কামরুল ইসলাম
২০১৪ সাল। ভোটারবিহীন নির্বাচনে হাসিনার তখন দ্বিতীয় মেয়াদ। ‘বটতলার উকিল’খ্যাত অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামকে করা হয়েছিলো খাদ্যমন্ত্রী। দায়িত্বপাওয়ার এক বছরের মাথায় তিনি ব্রাজিল থেকে আমদানি করেন ৪শ’ কোটি টাকার (২ লাখ টন) নিম্নমানের পচা গম। বহুল আলোচিত এ দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করেনি তৎকালিন হাসিনা-অনুগত দুদক। তবে এ ঘটনায় অ্যাডভোকেট কামরুল মানুষের কাছে ‘গমরুল’ নামে সমধিক পরিচিতি পান। দুর্নীতিবাজ, ফ্যাসিস্ট কামরুলের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক দুর্নীতির মামলা। চব্বিশের মানবতাবিরোধী মামলাও চলমান। তদন্তাধীন রয়েছে বেশ কয়েকটি চাঁদাবাজি মামলা। খাদ্যমন্ত্রী থাকাকালে পচা গম ক্রয়সহ নানা দুর্নীতির মাধ্যমে নামে- বেনামে শত কোটি টাকা অবৈধ উপায়ে অর্জন করেন তিনি। এর আগে আইন প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে জামিন বাণিজ্য, সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ-বদলির মাধ্যমেও হাতিয়ে নেন বহু অর্থ। দুইহাজার চব্বিশের জুলাই গণহত্যার মামলা, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা এবং চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার হয়ে দাফতরিকভাবে তিনি ‘কারাগারে’ রয়েছেন। মাঝে তিনি ‘অসুস্থতা’র ভান করে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে পারবেন না-মর্মে গো ধরেন। 

পরে প্রসিকিউশন জানায়, তিনি কারাগারে থেকে সিঙ্গাপুর চিকিৎসা নিয়েছেন! ডায়াগনস্টিক টেস্ট করিয়েছেন নিজ নির্বাচনী এলাকা কেরাণীগঞ্জের একটি ল্যাব থেকে। এসব ভুয়া মেডিকেল রেকর্ড দেখিয়ে ‘উন্নত চিকিৎসা’র জন্য তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তরিত হওয়ার আবদার করেন। এ হেন কামরুল বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বহু কটূক্তি করেছেন। এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে টিভি ক্যামেরার সামনেই করেছেন বহু খিস্তিখেউড়।

সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেটন কামরুল ইসলাম 

হত্যা-দুর্নীতিসহ বহু মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিনি ‘কারাগারে’ রয়েছেন। সেখানে তিনি ‘ডিভিশন’ প্রাপ্ত আসামি। তিনি কারাগারে রয়েছেন-এ কথা সাধারণ মানুষ জানলেও বাস্তবে তিনি থাকছেন ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ হাসপাতালে। এখানকার একটি কেবিনে তিনি যাপন করছেন আয়েশী জীবন। আদালতে হাজিরার প্রয়োজন হলে তাকে ‘কাশিমপুর কারাগার পার্ট-১ এর আসামি’ হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। 

জানাগেছে, দুর্নীতিলব্ধ অর্থের বিনিময়ে তিনি জেলসুপার এবং কারাগারের ডাক্তারদের ম্যানেজ করে চিকিৎসার নামে জেলখানার বাইরে থাকার ‘ব্যবস্থা’ করে নিয়েছেন। মাঝে-মধ্যে তাকে কারাগারে নেয়া হলেও দু-চারদিন বিরতির পর পুনরায় কারাগারের ডাক্তারগণ তাকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ‘ব্যবস্থা’ করে দিচ্ছেন। কারাগারে থাকার কথা থাকলেও কার্যত তিনি থাকছেন কারাগারের বাইরে। কাশিমপুর কারগারের দায়িত্বে রয়েছেন সিনিয়র জেলসুপার মো: নজরুল ইসলাম। ডাক্তার হিসেবে রয়েছেন সহকারি সার্জন ডা: খালেদ মাহমুদ, সহকারি সার্জন ডা: সৈয়দ আবিদুল আরেফীন রেজভি। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের নজরানার বিনিময়ে তারা কামরুলকে বাইরে থাকার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছেন। 

গোলাম দস্তগীর গাজী
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ওই বছর ২৪ আগস্ট রাজধানীর শান্তিনগর একটি বাড়ি গ্রেফতার করা হয় শেখ হাসিনার দোসর, সাবেক পাট ও  বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীকে। পরে তাকে চব্বিশের গণহত্যা, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের একাধিক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

গোলাম দস্তগীর গাজী নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ স্কুলছাত্র রোমান মিয়া হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ১০৫ জনকে আসামি করা হয়। এ মামলায় এজহারভুক্ত আসামি গোলাম দস্তগীর গাজী। একই এলাকায় তিনি আইয়ুব আলী হত্যাচেষ্টা মামলারও এজাহারভুক্ত আসামি। তার নামে ৪শ’ ৪৮ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছর মার্চে মামলা করে দুদক। যদিও এজাহারে অবৈধ সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ২৩ কোটি ৫১ লাখ ৩৩  হাজার টাকা। গতবছর ১১ ডিসেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গোলাম দস্তগীর গাজী এবং তার এপিএস এমদাদুল হকসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের পৃথক মামলা করে। ভুয়া নথি সৃষ্টি করে ২৪০১.৪৬ শতাংশ জমি (মূল্য প্রায় ৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা) অবৈধ জবরদখল ও আত্মসাতের মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অবৈধ সম্পদের মামলায় গোলাম দস্তগীর গাজীর দখলে থাকা রূপগঞ্জের খাদুন এলাকায় ৬৯ দলিলে ৪ হাজার ৮৮০ শতাংশ সম্পত্তি ক্রোক করেছেন আদালত। ৪শ’ কোটি টাকা মূল্যমানের এই সম্পত্তির ওপর তার ‘গাজী টায়ারর্স’ কারখানা অবস্থিত। এটিতে এখন প্রশাসক বসানো হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় তাকে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজির করা হয়।

সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। ছবি-সংগৃহীত

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অফিসিয়ালি তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু কার্যত তিনিও থাকছেন কারাগারের বাইরে।  ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল’ এ। ‘অসুস্থতা’র ছুতোয় জেল সুপার এবং ডাক্তারদের সহযোগিতায় গোলাম দস্তগীর গাজী এ ‘ব্যবস্থা’ বাতলে নিয়েছেন।  নারায়ণগঞ্জ কারাগারের জেলসুপার মো: ফোরকান ওয়াহিদ। নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে স্থায়ী কোনো ডাক্তার নেই। একটি সহকারি সার্জন ( মেডিকেল) অফিসারের পদ থাকলেও এখানে অল্পকিছুদিনের জন্য প্রেষণে ডাক্তার আনা হয়। যখন যিনি দায়িত্বে থাকেন, গোলাম দস্তগীর গাজীর লোক তাকে দিয়েই কারাগারের বাইরে ‘চিকিৎসা’ গ্রহণের প্রেসক্রিপশন লেখান। গোলাম দস্তগীর গাজীও ডিভিশনপ্রাপ্ত আসামি।

মোরশেদ আলম

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের দোসর ও অর্থের অন্যতম যোগানদাতা নোয়াখালি-২ আসনের (সেনবাগ-সোনাইমুড়ি) আওয়ামী এমপি মোরশেদ আলম। তার বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানে ধামন্ডিতে মো: শামীমকে (১৩) হত্যার অভিযোগে মামলা রয়েছে। এ ছাড়া নিজ এলাকায় রয়েছে হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং ভাঙচুরের তিনটি মামলা। 

২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর সেনবাগ উপজেলা বিএনপি’র কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় মোরশেদ আলম এবং তার পুত্র সাইফুল ইসলাম আসামি। একইবছর ২৩ জানুয়ারি তার নির্বাচনী এলাকা নবীপুর ইউনিয়নের শ্রীপদ্দি গ্রামে বিএনপি’র কর্মীর বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের মামলায় মোরশেদ আলম আসামি। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকালে ৩ আগস্ট ছমির মুন্সির হাটে এক ব্যবসায়ীর দোকানে হামলা ও লুটপাটের মামলার আসামি মোরশেদ আলম। এ ছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ৪শ’৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় একটি মামলা রয়েছে। এ মামলায় তার ভাই এফবিসিসিআই’র তৎকালিন সভাপতি মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন, পুত্র সাইফুল ইসলামও আসামি। ২ কোটি ৮৬ লাখ ৬ হাজার টাকা আত্মসাতের মামলাও রয়েছে দুদকে। এ মামলায়ও তিনি উচ্চ আদালতের জামিনে রয়েছেন।

বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি মোরশেদ আলম। ফাইল ছবি

চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন এই সহযোগী ফ্যাসিস্ট। পরে গতবছর ৮ এপ্রিল রাতে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। পরে পর্যায়ক্রমে তাকে ৪টি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এর মধ্যে দুদকের মামলায় জামিন পেলেও বাহ্যত: রয়েছেন কেরাণীগঞ্জস্থ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এখানকার জেল সুপার এবং ডাক্তারদের ম্যানেজ করে তিনিও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এখানকার সিনিয়র জেলসুপার ফারুক আহমেদ। সহকারি সার্জন ডা: সোহেল হাসান, মো: শাহীনুর রেজা, ডা: মেহেদী হাসান, ডা: ইশতিয়াক উজ জামান চৌধুরী ও ডা: বিনীতা কর পর্যায়ক্রমে কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।   

কামাল মজুমদার
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যা এবং দুর্নীতি মামলার অন্যতম আসামি হাসিনার শিল্পপ্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার। রাজধানীর কাফরুল এলাকায় ছাত্র ইকরামুল হক হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি তিনি।  মিরপুর মডেল থানা ও শাহ আলী থানাসহ কয়েকটি থানায় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েটি পৃথক হত্যা মামলা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব মামলার বিচার চলছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে বনানী থানায় অস্ত্র আইনে মামলা রয়েছে। মামলা রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনেও। ১৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২শ’ ৯৬ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে মামলায়। দুদকের এ মামলায় তার পুত্র শাহেদ আহমেদ মজুমদারও ২ কোটি ৪০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ‘সহযোগী আসামি’। চব্বিশের ১৮ অক্টোবর রাজধানীর গুলশানের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় কামাল আহমেদ মজুমদারকে। পরে উপরোক্ত মামলাগুলোতে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তাকে কখনো কেরাণীগঞ্জস্থ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগার, কখনো বা কাশিরপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। কেরাণীগঞ্জ কারাগারে ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়লে গতবছর ২৭ জুন তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সিসিইউতে নেয়া হয়। বর্তমানে তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ (বিএমইউ) হাসপাতালের কেবিনে এ রয়েছেন বলে জানা গেছে। ডিভিশনপ্রাপ্ত এই আসামি এখানে ‘বন্দী অবস্থা’য় সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন।

কাজী জাফর উল্যাহ
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালাতে না পারা আরেক নীতিনির্ধারণী দোসর কাজী জাফর উল্যাহ। গণহত্যাসহ তার বিরুদ্ধে কয়েকটি হত্যা মামলা এবং দুর্নীতির  মামলা চলমান। চব্বিশের ১৯ জুলাই মহাখালি ফ্লাইওভারের নিচে কারখানার শ্রমিক মো: শাহজাহান হত্যা মামলার আসামি তিনি। ২০২৩ সালে ২৮ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে যুবদল নেতা শামীম মোল্লা হত্যা মামলারও তিনি আসামি। 

এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে এফডিআর জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের মামলা রয়েছে দুদকের। চব্বিশের ১৮ সেপ্টেম্বর গুলশানের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পরপর তিনি ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়লে  ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করানো হয়। আদালতের নির্দেশে তিনি কারাগারে থাকার কথা। কিন্তু শুরু থেকেই তার ‘অসুস্থতা’র কারণে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল) হাসপাতালে রয়েছেন।    

আমিরুল আলম মিলন : 
নিষিদ্ধ আ’লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাগেরহাট-৪ আসনের আওয়ামী এমপি অ্যাডভোকেট আমিরুল আলমের বিরুদ্ধে রয়েছে যুবদল নেতা শামীম হত্যা, সহিংসতা ও দুর্নীতির একাধিক মামলা। গতবছর ৫ মে রাতে ডিবি পুলিশ তাকে রাজধানীর ওয়ারি এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। কাগজ-কলমে তিনি কারাগারে থাকলেও বাস্তবে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের  কেবিনে রয়েছেন।

ফজলে করিম চৌধুরী:
চট্টগ্রাম-৬ আসনের এমপি ছিলেন নিষিদ্ধ আ’লীগ নেতা বহুল আলোচিত এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। হাসিনা ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে পালানোর চেষ্টা করেন ফজলে করিমও। পরে ওই বছর ১২ সেপ্টেম্বর আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারত পালানোর সময় বিজিবি’র হাতে ধরা পড়েন তিনি। তার বিরুদ্ধে চব্বিশের গণহত্যা, পৃথক হত্যা মামলা এবং দুর্নীতির মামলা রয়েছে। রাউজানসহ বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রকিহিংসা, হত্যাচেষ্টা, ভাঙচুর, অস্ত্র মামলা, জমি জবর দখল এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে। 

জুলাই অভ্যুত্থানকালিন গণহত্যার ঘটনায় লালদিঘী ময়দানে মাদরাসা ছাত্র শহীদ নিজামউদ্দিনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে মামলা রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম চকবাজার থানায় হত্যা মামলা রয়েছে। চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে তারপক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটরকে ঘুষ প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুদক এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৪ কোটি ৮ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে। এর মধ্যে ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৯২ হাজার টাকার বৈধ কোনো উৎস নেই। ১২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০৮ কোটি ৬৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকার বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের ঘটনায় মানিলন্ডারিং মামলার তদন্ত করছে দুদক।  এ হেন ফজলে করিম চৌধুরী কাগজ-কলমে কারাগারে ‘বন্দী’ থাকলেও চিকিৎসার ছুতোয় তিনি বেশিরভাগ সময় অবস্থান করছেন হাসপাতালে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত পালানোকালে গ্রেফতার, চট্টগ্রামে হেলিকপ্টারে আনা হয় ফজলে করিম চৌধুরীকে। ছবি-সংগৃহীত 

শুধু কামরুল, কামাল মুজমদার, মোরশেদ আলম কিংবা ফজলে করিম নন-‘ভিআইপি’ ট্রিটমেন্টে রয়েছেন এমন বহু আসামি। যারা গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেফতার রয়েছেন। হাসিনার ফ্যাসিবাদের পুরো সময় জুড়ে তারা দু-হাতে লুটেছেন অর্থ। সে অর্থে এখন কিনছেন কারাগারের আয়েশী জীবন। কারা অধিদফতরের সহকারি মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল-ফরহাদের দেয়া তথ্য মতে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১৬০ জন ‘ভিআইপি আসামি’ রয়েছেন। তারা ডিভিশন পাচ্ছেন। এদের মধ্যে ৭৫ জন রয়েছেন কেরাণীগঞ্জ এবং কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। এদের মধ্যে কিছু রয়েছেন প্রিজন সেলে ‘চিকিৎসাধীন’।

কেবিনরক্ষীরা যা দেখেন

বাংলাদেশ মেডিকেলে প্রিজন সেলের একজন রক্ষী ও পুলিশ সদস্য (নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না) বলেন, ওনারা ভালোই আছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা দেখা করেন। ঈদের তিনদিনই বাসায় করা রান্না খেয়েছেন। এছাড়াও কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন সময় তাদের বিভিন্ন লোকজন দেখাও করেন। কারা কর্তৃপক্ষ থেকে স্যারেরা দেখতে আসেন। বন্দিদের সেলে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এ সংযোগ কারামহাপরিদর্শক থেকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্দরে নিয়স্ত্রণে। ওই দুজনের একজন ব্যঙ্গ করেই বলেন, ভাই-ওনাদের নিয়ে তো খেলা হয় ওপর লেভেলে। আমরা শুধু পাহারাদার। চাকরি করি, সব কথা বলাও যায়না।

কারাকর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বর্ণিত বিষয়গুলো শুনে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) ও মুখপাত্র মো. জান্নত-উল ফরহাদ প্রতিবেদককে বলেন, এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই। কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পেশালকারাগার, গাজীপুরের কাশিমপুর ও চট্টগ্রাম কারাগারতো নয়-ই। তিনি বলেন, বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে হলে কেন্দ্রীয় কারাকর্তৃপক্ষের অনুমোতির পর সাক্ষাতের সুযোগ রয়েছে। 

মুখপাত্র বলেন, কোনো বন্দি যদি হাসপাতালের সাধারণ ওয়াডে ভর্তি থাকে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের ম্যানেজ করে সাক্ষাত করলেও করতে পারে। সেটা কর্তৃপক্ষের অগোচরে।    

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়