Apan Desh | আপন দেশ

আজ আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ 

প্রকাশিত: ১০:১৪, ২৬ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১০:১৬, ২৬ জুলাই ২০২৬

আজ আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস

ছবি : আপন দেশ

আজ ২৬ জুলাই (রোববার), আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস। ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় প্রতি বছর এদিনে দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়ে আসছে। সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশেও পালন করা হয় এ দিবস। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ম্যানগ্রোভ বন আজ শুধু জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল নয় বরং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা। কার্বন সংরক্ষণ এবং টেকসই জীবিকার এক অনন্য ভিত্তি। বাংলাদেশ যার প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা রয়েছে, সে দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ আমাদের বাংলাদেশ ।

ম্যানগ্রোভ এক বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ যা সাধারণত সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের নোনা পানিতে জন্মায়। এগুলো হচ্ছে শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদ। জোয়ারের সময় শ্বাসমূলের সাহায্যে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ শ্বসন কাজ চালায়। এদের মূল থেকে একটা ডালের মতো চিকন অংশ মাটি ভেদ করে উপরে উঠে আসে। জোয়ারের সময় যখন মাটির উপরে পানি জমে যায়, তখন এই শ্বাসমূলগুলো পানির উপরে ভেসে থাকে। এই শ্বাসমূলগুলোর মাথায় এক ধরনের শ্বাসছিদ্র থাকে, যাদের বলে নিউমাটাপো। এদের সাহায্যেই ম্যানগ্রোভ গাছেরা শ্বাস নেয়। ম্যানগ্রোভ বা বাদাবনের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখা এবং এর প্রতিবেশ সুরক্ষার আহ্বান জানিয়ে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস পালিত হয়। 

গাছকাটা, বন্যপ্রাণী শিকার আর বিষ দিয়ে মাছ নিধন থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের দূষণসহ মানুষের তৈরি নানা পদক্ষেপে ধুঁকছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞরা এ বন ধ্বংসে নানা হুমকির কথা তুলে ধরে এটিকে রক্ষায় সচেতনতার বার্তা দিয়ে আসছেন। তবুও ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের’ এ প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার উদ্যোগ যৎসামান্যই।

সে তুলনায় দিনের পর দিন বন বিনষ্টের কারণ হিসেবে চিহ্নিত আগ্রাসনগুলো বন্ধের তোড়জোড় খুব কমই বলে তুলে ধরছেন পরিবেশ কর্মী ও বিশেষজ্ঞরা।

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন ম্যানগ্রোভ বন, যা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিস্তৃত। বাংলাদেশ অংশটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। এ বন শুধু বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল নয়, বরং শত শত প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ, মাছ ও উদ্ভিদের জন্য একটি জীববৈচিত্র্যের হটস্পট।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবন আজ নানা ঝুঁকির মুখে—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং মানবসৃষ্ট চাপ (অবৈধ বন উজাড়, দূষণ ইত্যাদি) এর মধ্যে অন্যতম। গবেষণায় দেখা গেছে, যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ ১ মিটার বৃদ্ধি পায়, তবে সুন্দরবনের প্রায় ৭৫% অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবুও সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে, যা ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পানসহ বিভিন্ন দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলকে সুরক্ষা দিয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি বন নয়, বরং একটি জীবনরক্ষাকারী প্রাকৃতিক অবকাঠামো।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, গত ১০ বছরে সুন্দরবনের কাছেই গড়ে উঠেছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, এলপি গ্যাস প্লান্ট, অয়েল রিফাইনারিসহ প্রায় ৫০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বনের খুব কাছে বিশালাকৃতির গুদাম নির্মাণ করেছে খোদ খাদ্য বিভাগ।

কারখানাগুলোর অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি ফেলা হয় নদীতে, যা ছোট ছোট খালের মাধ্যমে সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে পানি ও মাটিকে দূষিত করছে। এতে বনের অনেক স্থানে আগের মতো চারা গজাচ্ছে না। নদীর পানিতে তেলের পরিমাণ বাড়ায় হুমকিতে পড়েছে জলজ প্রাণী।

আরও পড়ুন<<>>আজ বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস

দেশে ১১ হাজারের বেশি প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ২ হাজারেরও বেশি প্রজাতির দেখা মেলে সুন্দরবনে। ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে সেখানে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের প্রত্যক্ষ দূষণে ঝুঁকি বাড়ছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতির ওপর।

আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশ্ব ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে সুন্দরবন থেকে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ ধরনের স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে মাছ ও গাছও রয়েছে।

জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের কাছেই গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রিসোর্টগুলো হয়ে উঠেছে বড় ক্ষতির কারণ। নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, প্লাস্টিকের দূষণ, বনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল ও পণ্যবাহী জাহাজডুবির ভয়াবহ প্রভাবও পড়ছে। থেমে নেই বিষ দিয়ে মাছ ধরা, মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, গাছ কাটা, আগুন দেয়া ও বন্যপ্রাণী শিকার। সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বনের নদী, মাটি, গাছপালা ও প্রাণীর ওপর।

সরকার সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ এলাকা ‘অভয়ারণ্য’ ও চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকা ‘প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ম্যানগ্রোভ বন শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, বরং মানব জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সুন্দরবন ও সোনাদিয়া—এ দুইটি অঞ্চল বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

যদি আমরা এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তবে ভবিষ্যতে এ অমূল্য সম্পদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। তাই প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং জনসচেতনতা—যার মাধ্যমে আমরা একটি টেকসই ও নিরাপদ উপকূলীয় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি।

ম্যানগ্রোভ বাঁচলে উপকূল বাঁচবে, আর উপকূল বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়

শীর্ষ সংবাদ:

এইচএসসি দিতে না পারা পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের আহবান শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন ভারতে সরকার পতনের ডাক দিলেন রাহুল গান্ধী চুপ্পুর বিরুদ্ধে শেয়ার কেলেঙ্কারির তদন্তের নির্দেশ আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা ককরোচ জনতা পার্টির নরেন্দ মোদীর নতিস্বীকার, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ধামরাইয়ে চার গাড়ির সংঘর্ষে প্রাণ গেল দুই শিক্ষার্থীর সব বাধা অতিক্রম করে দেশকে এগিয়ে নিতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী সেপ্টেম্বরে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে: আইনমন্ত্রী শাপলা চত্বর হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু ২৭ জুলাই : চিফ প্রসিকিউটর রেল ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে রাভনীত সিংয়ের পদত্যাগ বিট্টু আলোচনায় আন্তরিকতা দেখাচ্ছে ইরান, দাবি ট্রাম্পের