Apan Desh | আপন দেশ

বিশ্বকাপে খেলে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল, আবেগে মরে বাংলাদেশিরা

এম জাফিউল ইসলাম

প্রকাশিত: ১৩:১৫, ২০ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ২১:১৬, ২০ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপে খেলে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল, আবেগে মরে বাংলাদেশিরা

ছবি : আপন দেশ

বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, কোটি মানুষের আবেগ, আনন্দ আর স্বপ্নের নাম। চার বছর পরপর যখন বিশ্বকাপের বাঁশি বাজে, তখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের মতো বাংলাদেশেও শুরু হয় এক অন্যরকম উৎসব। প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে কেউ বানান বিশাল পতাকা, কেউ রাঙিয়ে তোলেন নিজের বাড়ি, আবার কেউ সাজান গাড়ি। পছন্দের দল হেরে গেলে কেউ কেউ আত্মহত্যার মত পথ বেছে নেন। অথচ নিজের বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না। 

এদেশের বেশির ফুটবল প্রেমী লাতিন আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও ভিনদেশিদের সমর্থনে এ দেশের মানুষের উন্মাদনা আকাশচুম্বী। আর এ উন্মাদনা কখনো কখনো শুধু খেলায় সীমাবদ্ধ থাকে না, রূপ নেয় চরম ট্র্যাজেডিতে। অন্যের খেলায় আবেগের বশে প্রাণ হারান অনেক বাংলাদেশি। 

বিশ্বকাপ ঘিরে ঘটা বিভিন্ন ধরনের মৃত্যুর প্রধান কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:

সমর্থকদের অনাকাঙ্খিত মৃত্যু
সদ্য সমাপ্ত উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশে অন্তত ১৪ জনের প্রাণহানি এবং শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মূলত সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা, পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া এবং সড়ক দুর্ঘটনার মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোতে এ প্রাণহানিগুলো ঘটেছে। তবে কিছু মৃত্যু ঘটছে অসাবধানতা থেকে। পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছেন মানুষ, প্রধানত কিশোর ও তরুণ। 

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে আমগাছে উঠে ব্রাজিলের পতাকা লাগাতে গিয়ে প্রাণ হারায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মাহিন শেখ, যার পতাকার বাঁশ হেলে পড়ে ছুঁয়ে যায় পল্লী বিদ্যুতের তার। মানিকগঞ্জে একই কারণে মারা যান তরুণ ফয়সাল হোসেন, চট্টগ্রামে রামহরি বৈষ্ণব, টাঙ্গাইলে ছাদ থেকে পড়ে রায়হান মিয়া। এই তালিকায় এখন যুক্ত হয়েছে আরেকটি নাম, নেত্রকোনার দীপ্ত চৌধুরী। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ের পর শহরের শহীদ মিনার মোড় এলাকায় বিজয় মিছিলের ভিডিও ধারণ করতে একটি ভবনের ছাদে উঠেছিলেন তিনি, সেখানেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছাদ থেকে নিচে পড়ে মারা যান। 

ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আর যারাই দেখেছেন, প্রায় সবাই একবাক্যে বলেছেন, এমন মৃত্যু সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত, প্রতিরোধযোগ্য ছিল। প্রতিটি বাড়ির কাছ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তার আর তার নিচে থাকা উঁচু গাছ কিংবা পাশের ছাদ, এ বিপজ্জনক নৈকট্য বছরের পর বছর ধরে থেকে গেছে, অথচ কোনও নিয়মিত সতর্কীকরণ প্রচারণা চোখে পড়ে না বিশ্বকাপ মৌসুম এলে।

বেশি উদ্বেগজনক হলো সরাসরি সহিংসতা—যা এবার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। খেলা দেখার সময় বাঁশি বাজানো বা চিৎকার করা কিংবা ম্যাচ নিয়ে সামান্য কথা কাটাকাটির জের ধরে কোথাও রাজনৈতিক নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, কোথাও আবার আপন চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন যুবক। এমনকি কিশোরদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধে বৃদ্ধকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা কিংবা এক কিশোরকে মেরে বালুচাপা দেয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। পতাকা টানানো বা খেলা দেখা নিয়ে তুচ্ছ তর্কে মাথা ফাটানো থেকে শুরু করে এবার আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের দেশীয় সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের খবরও সামনে এসেছে, যেখানে প্রতিপক্ষ দলের সমর্থক চিহ্নিত করেই তার ঘরে চড়াও হওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন<<>>বিশ্বকাপে বিব্রতকর রেকর্ড আর্জেন্টিনার

অবশ্য এ দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে সহিংসতা ও মৃত্যু  নতুন নয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও একই ধরনের সহিংসতায় দেশে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও পতাকা টানাতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল, আর আবদুল মতিনের ঘটনা তো আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত হয়েছিল, যিনি উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক তারে স্পর্শ পেয়ে হারিয়েছিলেন দুই হাত ও দুই পা। প্রতিটি বিশ্বকাপের পর আমরা একই ধরনের হা-হুতাশ করি, প্রতিবেদন লিখি, তারপর ভুলে যাই, যতক্ষণ না পরবর্তী বিশ্বকাপ আবার একই ট্র্যাজেডি নিয়ে হাজির হয়। এ পুনরাবৃত্তি নিজেই প্রমাণ করে, আমরা সমস্যাটির মূলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি।

সম্প্রতি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, জনদুর্ভোগ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে হাইকোর্টে রিট পর্যন্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বসাধারণের জন্য বিশ্বকাপ প্রদর্শনী ও উদযাপনের সময় নির্ধারণ, আতশবাজি ও লাউড স্পিকারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন এবং রাত ১১টার পর অবৈধ উচ্চ শব্দ ও আতশবাজি বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়। এটি স্বাগত জানানোর মতো একটি পদক্ষেপ, তবে আমার মনে হয় এটি সমস্যার কেবল উপরিভাগ স্পর্শ করে। প্রকৃত সমাধান তিনটি স্তরে হতে হবে।

অতিরিক্ত আবেগ সংবরণ করতে হবে
পরিমিতিবোধ কেবল আবেগ বা আচরণের মধ্যেই নয়, সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের অনেক ম্যাচই গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় তা শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন রুটিনে প্রভাব ফেলতে পারে। পড়াশোনা, কাজের চাপ এবং শারীরিক বিশ্রামের সঙ্গে ভারসাম্য না রাখলে সাময়িক বিনোদন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাত জেগে খেলা দেখা বা উদযাপনের কারণে পরদিনের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। আনন্দকে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন আছে, কিন্তু জীবন ও দায়িত্বের অগ্রাধিকারকে কখনই অগ্রাহ্য করা সমীচীন নয়।

বিশ্বকাপ আমাদের আনন্দের অন্যতম উৎস, বিভেদের নয়। সমর্থন থাকবে, বিতর্ক থাকবে, আবেগ থাকবে। আবার তার সীমারেখাও থাকতে হবে। আনন্দ-উদযাপন হতে হবে সংযত, নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে। মনে রাখা আবশ্যক, বিশ্বকাপকে ঘিরে আমাদের উচ্ছ্বাস যেন কারো জীবনের ক্ষতি, সম্পর্কের ভাঙন বা সামাজিক বিভাজনের কারণ না হয়। বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা মাতব অবশ্যই, কিন্তু এমনভাবে মাতব, যাতে উৎসব শেষে আনন্দের স্মৃতি থাকে; অনুশোচনা, ঋণ বা শোক নয়।

শেষ কথা
বিশ্বকাপ ফুটবল হোক অথবা অন্য টুর্নামেন্ট, এসব নিছকই একটি বিনোদন ও খেলাধুলা, তাই এর জন্য নিজের বা অন্যের জীবন বিপন্ন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। খেলায় হার-জিত থাকবেই, তবে সে আবেগ যেন সহিংসতা বা প্রাণহানির কারণ না হয়, সেদিকে সবার সচেতন হওয়া উচিত। বিশেষ করে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে থাকা দল নিয়ে এ অন্ধ আবেগ ও সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। খেলাকে খেলার জায়গায় রেখে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করাই হোক ফুটবলপ্রেমীদের মূল লক্ষ্য।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement