Apan Desh | আপন দেশ

নির্বাচিত সরকারের ১০০ দিন, প্রত্যাশা-প্রাপ্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২০:৩৫, ২৭ মে ২০২৬

আপডেট: ২০:৩৬, ২৭ মে ২০২৬

নির্বাচিত সরকারের ১০০ দিন, প্রত্যাশা-প্রাপ্তি

ফাইল ছবি, আপন দেশ

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। যার নেতৃত্বে ছিলেন তারেক রহমান। পতিত স্বৈরাচার সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও জনগণের প্রত্যাশার চ্যালেঞ্জ  নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান। ঘোষণা করেন ১৮০ দিনের পথনকশার।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সেই সরকার ক্ষমতায় থাকার ১৮০ দিনের পথনকশার ১০০ দিন পূর্ণ করলেন তিনি। মন্ত্রিসভা কিছু ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা নিয়ে যাত্রা করলেও শুরুটা ছিল আশা ব্যঞ্জক।

সরকারের ১০০ দিনের মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণ, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক ভাতা-বোনাস, গ্রাম পর্যায়ে খাল খনন, তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, সংসদ সদস্যদের করমুক্ত গাড়ির সুবিধা না নেয়া ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মিতব্যয়িতা। 

সব মিলিয়ে দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বেশিরভাগ কাজই ছিল ইতিবাচক। তবে এতো অর্জনের মঝেও কিছু বিষয়ের সাফল্য এখনও অধরা রয়েছে। তবে সেগুলোও এক সময় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছবে বলে মনে করে সরকার সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে দীর্ঘ দুঃশাসন, অব্যবস্থাপনা ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছে। তারপরও ১০০ দিনে প্রত্যাশার বাইরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে। কিছু সীমাবদ্ধ আছে। সেগুলো কাটিয়ে আশা করি, সামনে পথচলা আরও বাস্তবভিত্তিক হবে। এ জন্য সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।

সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন তারেক রহমান। এর মধ্যে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে এ তিন ক্ষেত্রেই অগ্রগতি পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। এর বাইরে হামসহ বেশকিছু বিষয় মোকাবিলায় সরকারকে বেগ পোহাতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার বেশকিছু পরিকল্পনাও নিয়েছে।

সরকারের দাবি, তাদের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার ছিল ভয়াবহ। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং বিনিয়োগ খরা নিয়েই যাত্রা করে সরকার। ২০২৫ সালের বেশিরভাগ সময় মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে থাকলেও মার্চে তা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু এপ্রিলে আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়, ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ ও নির্দিষ্ট আয়ের জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হয়। 

আরও পড়ুন<<>>ঈদকে ঘিরে ঢাকায় থাকছে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার

এরপর আসে বৈশ্বিক ধাক্কা। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মাথায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায়। আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে সরকার তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। অফিসের সময়ে পরিবর্তন আনা হয়। মার্কেট ও বিপণিবতান চালু রাখার সময়সীমা বেধে দেয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে। আন্তরিকতার ঘাটতি না থাকলেও এ সেক্টরে এক ধরনের হতাশা রয়েছে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও খুনের হার বাড়তে থাকায় এ আলোচনা আরও জোরালো হয়। তবে সরকার এক্ষেত্রে হাল ছাড়েনি।

যদিও এখনও খুন, চাঁদাবাজি, গণপিটুনি, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা কমেনি, এতে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা নতুন করে বাড়ছে। গত তিন মাসে কর্তৃপক্ষ কয়েকটি অপরাধবিরোধী অভিযান পরিচালনা করলেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এখনও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ গত ১৯ মে মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ঘটনায় এ পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে আসছে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরকার পুলিশ সংস্কার এবং বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছে। তারমতে, এখন পরিস্থিতি জনপ্রত্যাশার সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দ্রবমূল্যের পাগলা ঘোড়া নিয়ে সরকারের মধ্যেও এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে ইতোমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করে অতিরিক্ত মূল্য আদায়, ওজনে কারচুপি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির বিরুদ্ধে জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। অন্যদিকে সিন্ডিকেট দমনে কোনও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ জোরদার করা হয়েছে। শুল্ক হ্রাস ও আমদানি সুবিধা নিশ্চিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য- চাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজ আমদানিতে সরকার শুল্ক ও ভ্যাট হ্রাস করেছে।

এছাড়াও বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসকদের সহায়তা চেয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকদের কাছে আমরা একটি জিনিস চেয়েছি, তা হলো আগামী দিনে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য তারা যেন নজরদারি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখেন।

গত দুই মাসেরও বেশি সময়ে চলা হামের প্রাদুর্ভাব কবে শেষ হবে এ নিয়ে কোনও সুখবর নেই। সরকার নানা পদক্ষেপের কথা জানালেও থামছে না শিশুমৃত্যুর মিছিল। এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫৫৫ জন।

সস্প্রতি ইউনিসেফ জানিয়েছে, তারা বারবার অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকার সম্ভাব্য সংকট এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। তবে সে সতর্কবার্তাগুলো মূলত উপেক্ষিতই ছিল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানান, বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে ৯০ লাখ ডোজ হামের টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে সিরিঞ্জের যে সংকটের কথা জানা যাচ্ছিল, সেটিরও সমাধান করা হয়েছে।

এছাড়া হামসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা কেনার জন্য জন্য নতুন করে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

রাজনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ

সরকারের ১০০ দিনকে সংকট, সীমাবদ্ধতা ও পদক্ষেপ নিয়ে অনেকে অনেকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অনেক পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। তাই এখনই তাদের কাছে সবকিছু প্রত্যাশা করা কঠিন। তবে এ সময়ে একেবারেই সবকিছু খারাপ করেছে, সেটাও বলা যাবে না।

জানতে চাইলে, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন,  জনস্বার্থের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কিছু সিদ্ধান্তকে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক মনে হয়। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খননসহ কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য উল্লেখযোগ্য। তবে কতিপয় দায়িত্বশীল ব্যক্তির কর্মকাণ্ড এক্ষেত্রে কিছুটা বিতর্ক তৈরি করেছে। অনেকে নিজের দায়িত্বের বাইরে ভিন্ন বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। যার কারণে অনেক সময় সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি করেছে। 

তিনি বলেন, হামের যথাযথ চিকিৎসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শ্রমখাতে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। আর খুন ও ধর্ষণ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সময়ের দাবি।

অবশ্য ভিন্ন কথা বলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম। তিনি বলেন, সরকার শুরুতেই চটকদার অনেক কথা বললেও বাস্তবতা যোজন যোজন পার্থক্য। কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও হামে শিশুর মৃত্যু নিয়ে তাদের পদক্ষেপ তেমন ফলপ্রসূ দেখা যাচ্ছে না। আর বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়েও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারেনি। আমরা চাই, সরকার জনগণের সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিক।

আপন দেশ/এসআর

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়