ছবি: আপন দেশ
গল্পটা কিন্তু শেষ করি নাই
জানাজায় ভালোই লোক হলো। তার মাঝে একটা বড় অংশকেই দেখা গেল কবর দিতেও চলে এসেছে।
কবরে নামার পর বাইরে দাঁড়ানো কয়জন আত্মীয় লম্বা সময় ধরে চিৎকার করল তার উদ্দেশে, অভিজ্ঞতা ও ধর্মীয় বিধানের সূত্র টেনে জানান দিল কীভাবে লাশ নামাতে হবে। অথচ লাশ শুইয়ে দিয়ে কবর থেকে উঠে আসার পর মঞ্জু আবিষ্কার করল কে কী বলেছে, তেমন কোনো স্মৃতিই তার মাথায় নেই। আবার পাশেই দেখা গেল বেঁচে যাওয়া দুটো বাঁশের টুকরো কবরে দিয়ে দেবে কি না, তা নিয়ে কারা যেন তর্ক শুরু করেছে। প্রচণ্ড রাগ হওয়ার মতো ব্যাপার, কিন্তু মঞ্জুর তাও হলো না। ভোঁতা একটা নিস্পৃহ চোখজোড়া নিয়ে সে কেবল দেখে গেল সব।
কবরে গোঁজা আগরবাতির সুঘ্রাণের মাঝে আল্লাহর পাক-কালাম আওড়ে মরহুমার জন্য হুজুর দোয়া পড়লেন দীর্ঘক্ষণ। আর মৃত মরিয়মকে বেহেশত নসিবের জন্য প্রার্থনা করে ইলিয়াস যখন মোনাজাত শেষ করলেন, ঠিক তার মিনিটখানেক আগে শুরু হলো বৃষ্টি। বৃষ্টি বলতে ভারী বর্ষণ নয়, টুপটাপ ফোঁটা। তবু অক্টোবরের বৃষ্টি গায়ে পড়লে হালকা শীতের অনুভূতি হয়। টুপটাপ পানি পড়তেই তাই আত্মীয়রা বাদে বাকি লোকজন দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা গেল কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইলিয়াস একাই। দুই সহোদর শহিদুজ্জামান আর নুরুজ্জামানও আছে কাছাকাছি, তবে তারা নিজের মতো আড়াল খুঁজে নিয়ে কাঁদছে। যে মায়ের উপস্থিতি তাদের সবাইকে ধরে রেখেছিল, সেই মাকে আর দেখা যাবে না, চিন্তাটা মাথায় আসতেই টিপটিপ বৃষ্টির নিচে দাঁড়ানো ইলিয়াস হঠাৎ অকারণে শিউরে ওঠে। সঙ্গে ভয় হয়, জননীর চেহারা বোধহয় সে এরই মধ্যে ভুলে গেছে।
‘১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টায় আমাদের প্রথম সন্তান মঞ্জুর জন্ম হইল। মঞ্জুর জন্মের আগে মরিয়মের স্বাস্থ্যের অত্যধিক অবনতি ঘটিয়াছিল বলে চিন্তাযুক্ত ছিলাম।’ বাবার ডায়েরিতে লেখা ছিল এ কথাগুলো। মলাট উড়ে যাওয়া সে ডায়েরিটার লাইনহীন পাতায় কালো কালির কলমে লিখতে গিয়ে বাবা কিছু ওভার-রাইট করেছিলেন ‘চিন্তাযুক্ত’ শব্দটায়। বাবা কি এখন মায়ের জন্য আর চিন্তা করবে? উত্তর পাওয়া যায় না। তাই বলে মঞ্জু নিজে মায়ের জন্য চিন্তা থামাতে পারে না। বৃষ্টির ছাঁটে আগরবাতি ফোঁস শব্দে নিভে গেলে সে খেয়াল করে, পানি জমছে কবরের চারধারে।
এলাকার এ কবরস্থানে বাদ জুমা কবর জিয়ারতের সময় কে যেন বলছিল এক দিন বৃষ্টি হলেই এদিকটায় পানি জমে। চারদিকে শক্ত বাঁধ দেওয়া দরকার। মায়ের কবরের গোড়ার দিকটা প্লাবিত হতে দেখে ইলিয়াসের সে কথা স্মরণ হয়, কিন্তু চোখে উঠে আসে অষ্টাশির বন্যা। ল্যাট্রিন থেকে নোংরা পানি উঠে এক দিন যখন উঠান ভাসিয়ে দিল, তুতুল তখন বজলু মিয়াকে ডেকে ইট, সিমেন্ট আর বালি দিয়ে উঠানের কয়েক জায়গায় বাঁধ দিয়ে দিল। অথচ রাতে খোদ আম্মার ঘরেই মেঝে ফুঁড়ে পানি বেরোনো শুরু করল।
মা সেদিন উদ্বেগ নিয়ে পার্থকে বলছিল, আজ হয়তো তাদের ডুবেই যেতে হবে। কিন্তু কাণ্ড দেখো, উনিশশ অষ্টাশির কেএম দাশ লেনের বাড়িতে নয়, মাকে ডুবে যেতে হচ্ছে এই উনিশশ পঁচানব্বইয়ের বগুড়ায়। বন্যার বদলে এখন তাকে নিমজ্জিত করছে বৃষ্টির শান্ত পাত। প্রকৃতির প্রতি কি এখন তার কৃতজ্ঞ হওয়া দরকার?
দিনকয়েক পরের কুলখানিতেও মনে হয় না যে কিস্তি টুপি শোভিত ইলিয়াস প্রশ্নটার জবাব খুঁজে পেয়েছে। বরং ভিড়ের মাঝে বসে নিজের মুদ্রাদোষে তাকে সবার চেয়ে একলা লাগে।
ভিড় বলতে কুলখানি উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে মিলাদে আসা জমায়েত। বাইরের ঘরের পুরোনো আমলের চেয়ারগুলো সরিয়ে সেখানে পেতে দেওয়া হয়েছে নীল ও হালকা সবুজ চাদর। সমবেত ৩০-৪০ জন মেহমানের অধিকাংশই স্থানীয়। তবে ঢাকা থেকেও এসেছে কয়েকজন। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ থাকলেও এ ঢাকাবাসীর পাঞ্জাবিগুলোই জেল্লা বেশি দিচ্ছে। ইলিয়াসের সাদা পাঞ্জাবি আবার কয়েক জায়গায় এলোমেলো। তার মাঝেই সে দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখের দৃষ্টি দূরে কোথাও জিইয়ে রেখে উচ্চ স্বরে দরুদ পড়ে।
মসজিদের স্থানীয় হুজুর পরম যত্নে আরবি ভাষায় আয়াত পড়েন।
আগাগোড়া লৌকিক পটভূমি সত্ত্বেও সমবেতদের বেশভূষা, আগরবাতির ধোঁয়া আর গোলাপজলের সুগন্ধ মিলেমিশে সে ধ্বনি যেন কীভাবে সবাইকে অন্য কোনো জগতের কথা স্মরণ করায়। পর্দার আড়াল থেকে মহিলাদের কেউ কেউ নীরবে চোখের জল ফেলে, সে জলীয় বাষ্প জমে ওঠা মেঘ ক্রমে ঘন হয়ে চেপে বসে বসার ঘরের প্রার্থনারত পুরুষদের গলায়। শিশিরের মতো বিন্দু বিন্দু শোক ঝরে সবাইকে ভিজিয়ে দেয়।
মোনাজাত শেষে মিলাদের মিষ্টি হাতে হাতে বিলিয়ে দেওয়া হলো। ঢাকার মেহমানরা রাতে খেয়ে যাবে, তাদের রেখে বিদায় নিতে থাকে স্থানীয়রা। বাড়ির বড় বউ হিসেবে সুরাইয়া তখন পর্দার আড়াল থেকে উকিঝুঁকি মারে। হুজুরের জন্য আলাদা করে একটা মিষ্টির প্যাকেট রাখা আছে, সেটা হুজুরের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করাটা তার দায়িত্ব। অথচ সে দায়িত্ব পালন করার জন্য ইলিয়াসকে খুঁজে পাওয়া যায় না। পার্থ আছে, নুরুজ্জামান কি খালিকুজ্জামানকেও দেখা যায়, কিন্তু ইলিয়াস বসার ঘরে নেই।
খালিকুজ্জামান তখন নতমুখে ঢাকার অতিথিদের উচ্চারিত শোক, উপদেশ কি আক্ষেপবাণী শুনে নিচ্ছিল।
‘... খবরটা তো শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এক মাসও হয় নাই মানুষটাকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখে গেছি!’
‘এখন ভাই একটাই কাজ। দোয়া পড়া। চাচির আত্মাকে আল্লাহ যাতে শান্তি দেয়, সে জন্য খাস দিলে দোয়া করা!’
‘এত দ্রুত ডেট্রয়েট করবে বুঝি নাই। কী যেন হইছিল?’
‘ক্যানসার। প্যানক্রিয়াসের ক্যানসার।’ জবাব দেওয়ার জন্য খালিকুজ্জামান মাথা তুলেই দেখতে পায় পর্দার আড়াল থেকে তুতুল ভাবি তাকে ইশারায় ডাকছে। ‘আপনারা বসেন একটু, আসছি আমি!’
ভেতর ঘরে যাওয়ামাত্র সুরাইয়া মিষ্টির প্যাকেটটা খালিকুজ্জামানের হাতে দিয়ে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়। ‘তোমার ভাই কই?’
‘এখানেই তো ছিল!’ বলে পর্দা সরিয়ে বসার ঘরে চোখ বুলিয়ে অগ্রজের অনুপস্থিতিতে খালিকুজ্জামানও অবাক হয়। ‘লাগবে?-আচ্ছা, দেখলে পাঠায়ে দিচ্ছি।’
সুরাইয়া ভেতর বাড়িতে ঢোকে। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে চেংটুর মাকে কয়েকটা নির্দেশ দিয়ে সে নিজেই বেরোয় স্বামীকে খুঁজতে। মানুষটা খুব এলোমেলো হয়ে আছে। ঘুমের মাঝেও যে লোক বকবক করায় ওস্তাদ, সে এখন প্রায় সারা দিনই চুপ হয়ে থাকে। নীরবে কাঁদে, তারপর আবার সবার অলক্ষে হাত দিয়ে চোখের পানি মুছেও নেয়। গত কয়েক দিনে এমন বেশ কয়েকবার হয়েছে যে ভেতরের ঘরে গিয়ে সুরাইয়া আবিষ্কার করেছে মানুষটা একদৃষ্টিতে মায়ের ব্যবহার করা বালিশগুলো দেখে যাচ্ছে। এখনো হয়তো সে সবার চোখের আড়ালে মায়ের ঘরেই বসে আছে।
কিন্তু না, মায়ের ঘরে মঞ্জুকে পাওয়া যায় না। তার পরের ঘরটায়ও না। তবে খিড়কির ঘরে গেলে জানালা দিয়ে দৃশ্যমান হয় বাড়ির পেছনের পুকুরের নির্জন ঘাটে বসে আছে মানুষটা।
সুরাইয়া জানালা পথেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে। বাড়ির এ ঘরটা মূলত ব্যবহার হয় পুরোনো আসবাব আর রান্নাঘরের তৈজসপত্র ডাই করে রাখার কাজে। সামনের দিকটায় মিলাদজনিত যে ব্যস্ততা, এদিকে সেটা একদম অনুপস্থিত। তাই সুরাইয়া একটু ইতস্তত করে ভেজিয়ে রাখা দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে আসে।
মাঝে মাঝে পানি তোলা বাদে পুরোনো এ পুকুরটা বাড়ির কেউ আর ব্যবহার করে না। হেজে-মজে যাওয়া জলাশয়টার তিনদিক ভরে আছে কচুরিপানায়, আট ধাপের বাঁধানো সিঁড়িটাও জায়গায় জায়গায় দখল করে নিয়েছে শ্যাওলারা। সুরাইয়া এদিকে আসে না বহুদিন। তবে আজ সে শাড়ি ধরে পিচ্ছিল ধাপগুলো সাবধানে পেরিয়ে নীরবে এসে বসে স্বামীর পাশে। মঞ্জু নির্লিপ্ত চোখ তুলে স্ত্রীকে দেখে কিছুক্ষণ, তারপর ফের দৃষ্টি ছুড়ে দেয় পুকুরে।
নিষ্কম্প সেই পুকুরে খাটো হয়ে আসা বিকালের ছায়া এ মুহূর্তে শালগাছের মতো থির। শীতের হিম বাতাসে এখন স্পষ্ট। কয়েকটি নীরব মুহূর্তের পর কী এক অনিশ্চিত জীবনের মায়া গলায় মেখে মঞ্জু বলে, ‘মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে কোনো লাভ হয় না তুতুল, না? বাবার সময় সেকেন্ড স্ট্রোকের পর থেকেই মনে মনে প্রিপারেশন নিছিলাম, কিন্তু ঠিকই অসহায় হয়ে গেছি।’
সুরাইয়া নীরব থাকে। তার শ্বশুরের ইন্তেকালের সময় ঘোর বর্ষা, দেশে বন্যা হচ্ছে। তার মাঝেই সন্ধ্যার দিকে যখন মৃত্যু সংবাদটা এলো, ওদের ঢাকার বাড়ির সামনে তখন এক হাঁটু পানি। সে পানির মাঝেই ওরা দুজন একটা রিকশা দিয়ে মূল গলিতে উঠল, সেখান থেকে মিশুক চেপে বাসস্ট্যান্ড। সে বাসযাত্রাও পানিতে ভেসে যায় একটু পরপর। সারাটা রাত পথের দুদিকে যত চোখ যায়, দেখা যায় কেবল বন্যার জলস্রোত। ফাঁকে ফাঁকে স্বামীর মুখের দিকে তুতুল যতবার তাকায়, দেখা যায় কেবল ক্লান্তি।
‘এইসব অসুখ-বিসুখ, পেইন, মৃত্যু আমাকে এরা খুব হন্ট করে তুতুল।’ মঞ্জুর গলা এখনো ক্লান্ত। ‘সময়ে সময়ে ভাবছি যে এসব নিয়ে লেখালেখি করে আমার হয়তো এক রকম সাইকোলজিক্যাল প্রিপারেশন হবে। হয়তো আমি লিখেই প্রস্তুত হচ্ছি শোক ঠেকাতে।’
খানিক সব চুপ। ‘কিন্তু সব মিথ্যা তুতুল! শোক হয়তো কমে যায়, কিন্তু দৈবের সামনে অসহায় লাগে নিজেকে খুব!’
স্বামীর কণ্ঠ খাদে নেমে গেলে সুরাইয়ার গলার কাছেও কী একটা ভারী হয়ে ওঠে। কথা না বলে সে মঞ্জুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুধু। কোমল সেই স্পর্শে, কিংবা সুড়সুড়ি দেওয়া শীতের বাতাসে ইলিয়াস খানিক কেঁপে ওঠে এবার।
সুরাইয়া তখন ভারী হয়ে আসা গলায় জানায় যে মায়ের শূন্য ঘরটায় পা রাখা তার জন্য কতটা কঠিন হয়ে উঠবে ঢাকায় ফিরে। বলে, মঞ্জু তো ঘুরত বাইরে বাইরে, কিন্তু পার্থ আর তার দিনের কতটা অংশজুড়ে থাকতেন মৃত মানুষটা, তা শুধু তারাই জানে।
কথাগুলো ইলিয়াস শোনে, কিন্তু মাথার ভেতরে কী যেন ঠিক কাজ করে না। একটা বেদনা, তার চাইতেও হেরে যাওয়ার মতো একটা অসহায়ত্বে তার চোখের শিরাগুলো কেমন ব্যথা করতে থাকে। তেত্রিশ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন যিশুখ্রিস্ট। মৃত্যু-মুহূর্তে বলেছিলেন, ‘হে আমার ঈশ্বর, আমি বেদনা অনুভব করছি, আপনি চেয়েছেন বলেই।’ সেটা দুই হাজার বছর আগের কথা। পৃথিবী কত পুরোনো, অথচ মানুষের মৌলিক বেদনাগুলো আজও নতুনত্বহীন। মৃত্যু-মন্থর এ দুনিয়ায় আরেকজনের বিষাদকে আমরা কি চাইলেই সহনীয় করে তুলতে পারি? ইভেন দ্যাট গাই অ্যাবাভ, ক্যান হি হেল্প?
সাহায্যের নিশ্চয়তা না পেয়ে লেখক তাই গল্প শুরু করে। ‘আচ্ছা, রঞ্জুর ওই গল্পটা তোমাকে আগে বলেছি না?’
সুরাইয়া একবার পেছন ফিরে খিড়কি দরজাটা দেখে, তারপর স্বামীর কাঁধে ঘাড় এলিয়ে বলে, ‘কোন গল্পটা?’
ছায়াচ্ছন্ন পুকুরের জল থেকে চোখ সরিয়ে ইলিয়াস এবার সাহস করে আকাশ দেখে। আকাশ পরিষ্কার, একটু আধটু নীল মেঘ সেখানে শিশুর অপটু হাতে আঁকা সূর্যপানে উড়ে যাওয়া পাখির মতো ঝুলছে। নিকট ভবিষ্যতে তারা বৃষ্টি হয়ে ঝরতে পারে, তেমনটা কিছুতেই মনে হয় না। অথচ ইলিয়াসের থেকে থেকে মনে পড়ে একটা বৃষ্টিবিঘ্নিত দিনের কথা।
‘অনেক ছোটবেলার কথা, বুঝলা? রঞ্জুর বয়স তখন ধরো এই সাত-আট হবে। সেদিন খুব বৃষ্টি। বিকাল থেকে শুরু, কিন্তু দেখতে দেখতে রাত এগারোটা-সাড়ে এগারোটা বেজে গেল, বৃষ্টি আর থামেই না।
তো খেয়ে দেয়ে আমরা সবাই শুয়ে পড়েছি, তখনই কারেন্ট চলে গেল। ডিলু তখনো মায়ের কাছে শোয়, আর আমরা তিন ভাই অন্য ঘরে। সেই অন্ধকারের মাঝেই আমরা শুয়ে শুয়ে গল্প করছি। রাস্তা দিয়ে হয়তো হঠাৎ কোনো গাড়ি যাচ্ছে, সেটার লাইট এসে জানালার ওপর আলো-ছায়া তৈরি করলেই আমাদের অনেক ফুর্তি হচ্ছে। আমরা ছায়া দিয়ে বইতে দেখা আইফেল টাওয়ার আঁকছি, শব্দ দিয়ে সুর করে গাইছি ছেলেবেলায় পড়া হাট্টিমাটিম-টিম। ঠিক তখন না, মিন্টু হঠাৎ করে কাজলা দিদি আবৃত্তি করা শুরু করল!’
বলতে বলতে গল্পকথক নিজেই দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখতে পায়। হু হু হাওয়া এসে মাঝে মাঝে ঠুমরি দিচ্ছে জানালার কপাটে, জানালার শিকে জমে ওঠা বৃষ্টির শিশির ঝরছে ফোঁটায় ফোঁটায়। তার মাঝে মিন্টু খুব আবেগ নিয়ে বলে যাচ্ছে, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই।
কিন্তু যে-ই না সে বলল ‘মা গো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই!’, তখনই রঞ্জ একেবারে শব্দ করে কেঁদে দিল! কবিতাটা শুনে আসলে রঞ্জুর দারুণ মন খারাপ হয়েছিল তখন। কিন্তু তার ওভাবে কেঁদে ফেলায় মঞ্জুরা সবাই খুব অবাক। তার মাঝেই রঞ্জু করল কী, ওদের ঘর থেকে একছুটে বেরিয়ে চলে গেল আব্বা-আম্মার ঘরের সামনে। ওরাও তখন শুয়ে গেছে। কিন্তু রঞ্জু সেই বন্ধ দরজায়ই ধাক্কা মেরে বারবার বলতে লাগল ‘আম্মা, দরজা খোলো! ও আম্মা, দরজা খোলো!’ শুনতে শুনতে সুরাইয়ার খুব মন খারাপ লাগছিল, কিন্তু তার মাঝেই কোমর-সমান দেয়াল দিয়ে আলাদা করা পাশের বাড়ি থেকে কে যেন উচ্চ স্বরে কথা বলে উঠলে মঞ্জু গল্প থামায়। উচ্চ স্বরের জবাবে এবার আরেকটি মহিলা কণ্ঠও চিৎকার করে কী যেন বলে। তারপর সব আবার চুপ, আর কোনো উত্তর-প্রত্যুত্তর শোনা যায় না। সুরাইয়া আলতো করে স্বামীর হাতের আঙুলের ভেতর নিজের আঙুল প্রবিষ্ট করায়। ‘এই গল্প তুমি আমাকে আগে বলো নাই কখনো।’
‘শেষ করি নাই কিন্তু গল্পটা।’
স্ত্রীর জিজ্ঞাসাবোধক দৃষ্টি গায়ে মেখে মঞ্জু কিছুক্ষণ পর ফের বলে, ‘তারপর তো আম্মা দরজা খুলল। দরজা খুলে রঞ্জুকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগল যে কী ব্যাপার। কিন্তু রঞ্জু তো ততক্ষণে নরমাল। কাজলা দিদি মরে যাওয়ায় যে ওর খুব খারাপ লেগেছে, সেটা বলতে ওর লজ্জা লাগছে। ও তখন করল কী, প্রশ্নের জবাবে মরিয়া হয়ে বলল, আম্মা, তোমার ঘরে কী যেন ফেলে আসছি!’
মঞ্জু আবার চুপ করে যায়। সুরাইয়া এবার স্বামীর কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে তার চোখের দিকে মনোযোগ দেয়।
‘ওই কথাটা না, আমি কখনই ভুলতে পারি নাই তুতুল। কথাটা মনে হলেই বুকের ভেতর কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে আম্মার কাছে কী যেন ফেলে এসেছি। কী যে অদ্ভুত একটা কথা!’
লোকটা এবার বোধহয় নিজের অজান্তেই হাতের মাঝে সঙ্গীর হাতটাকে শক্ত করে ধরে। ‘ইদানীং মনে হয়, ওই শৈশবে কী ফেলে এসেছি, সেটা খুঁজতে খুঁজতেই আমাদের সারাটা জীবন কেটে যাচ্ছে তুতুল। খালি খুঁজছি আর খুঁজছি। কিন্তু কী যে ফেলে এসেছি, কিছুতেই ছাই মনে করতে পারি না।’
পাশে পাশে আজ তারা কতদিন, তবু মানুষটার গলার এই কম্পাঙ্ক সুরাইয়ার অচেনা। ইলিয়াস কোথায়, তার গলায় তো আজ কথা বলে শৈশবের মঞ্জু, কিংবা মিন্টু, কিংবা রঞ্জু। সুরাইয়ার শোক হয় ঠিকই, কিন্তু তার চেয়ে বেশি হয় ভয়। মানুষটা পাগল হয়ে যাবে না তো?
সে ক্ষেত্রে তার করণীয় কী হবে, তা বুঝে না পেয়ে সুরাইয়া চেষ্টা করে একেবারে স্বাভাবিক গলায় কথা বলতে, ‘ভেতরে চলো তো! তোমার এই পাঞ্জাবিতে শীত মানবে না। পরে ঠান্ডা লেগে যাবে।’
‘আরেকটু বসি।’ মঞ্জু উঠতে চায় না।
‘নাহ, আর বসতে হবে না। ঢাকার গেস্টরা আছে, ডিলু একা একা কতক্ষণ বসে থাকবে ওখানে?’ প্রসঙ্গ বদলে সুরাইয়া হাত ধরে টানে।
‘ওঠো তুমি। ভেতরে চলো।’
সুরাইয়া উঠে দাঁড়াতে চাইলে মঞ্জু তাকে জোর করে ফের বসিয়ে দেয়। ‘যাচ্ছি দাঁড়াও। আর একটা মিনিট। একটা মিনিট চুপ করে বসে থাকব। এখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে।’
বাধা দিতে গিয়েও সুরাইয়া স্বামীর চোখ দেখে থেমে যায়। তারপর শরীরে ঢিল দিয়ে তারা দুজনেই চেয়ে থাকে পুকুরের দিকে।
আকাশ তখনো হেজে-মজে যাওয়া পুকুরের জলে উল্কি এঁকে যাচ্ছে। দূরের বিকালটা ক্লদ মোনের পেইন্টিং হয়ে কেমন যেন ঝাপসা, হিম বাতাসের স্পর্শকে মনে হচ্ছে হোমিওপ্যাথির মতো অকারণ মিষ্টি।
আরেকটু আয়ু কেটে নিয়ে বিকালটা ফুরিয়ে যাচ্ছে ব্যর্থ বিপ্লবের মতো।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































