ছবি: সংগৃহীত
ভারতের ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি)–উগ্র হিন্দু কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো বড়দিন পালনের অনুষ্ঠান বন্ধের ডাক দিয়েছিল। খ্রিস্টানদের দ্বারা ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তর’-এর অভিযোগ তুলে উগ্র হিন্দুপন্থীরা এ কর্মসূচি ঘোষণা দেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা এমন দাবি নিয়মিয়ত তুলছে বলে জানায় কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি।
বড়দিনের আগের দিন কাঠের লাঠি হাতে একদল লোক রায়পুরের একটি শপিং মলে হামলা চালায়। তারা বড়দিনের সাজসজ্জা ভাঙচুর করে এবং অনুষ্ঠান উদযাপনে বাঁধা দেয়।
পুলিশ এ ঘটনায় ৩০-৪০ জন অজ্ঞাতনামা হামলাকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। যদিও সে মামলায় মাত্র ছয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সবচেয়ে হতাশার খবর, কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রেফতারকৃত আসামিরা জামিনে মুক্তি পায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হলো, মুক্তি পর তাদের ফুলের মালা পরিয়ে ও স্লোগান দিয়ে উগ্র হিন্দুপন্থিরা স্বাগত জানায়। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বড়দিনের সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নয়াদিল্লির একটি ক্যাথলিক গির্জা পরিদর্শন করেন। তবে তিনি এ সহিংসতার কোনো নিন্দা জানানোর প্রয়োজন মনে করেন না।
আল-জাজিরা বলছে, এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। ভারতে ধর্মীয় ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। উগ্র হিন্দুদের বক্তব্যের কারণে মুসলমানদের পাশাপাশি দেশের খ্রিস্টান সংখ্যালঘুরাও ক্রমবর্ধমানভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
ওয়াশিংটন ডিসি–ভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট (CSOH)-এর একটি প্রকল্প ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ভারতে মোট ১৩১৮টি ঘৃণাত্মক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন তিনটিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে।
আরও পড়ুন<<>>ইরানে ২৪০০’র বেশি নিহত, দাবি মার্কিন সংস্থার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী ও ক্ষমতাসীন বিজেপির দ্বারা আয়োজিত ও পরিচালিত এসব অনুষ্ঠানে মূলত মুসলিম ও খ্রিস্টানদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ঘৃণাত্মক বক্তব্যের ঘটনা ৯৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩ শতাংশ।
যদিও মুসলিমরা প্রধান লক্ষ্যবস্তু, তবে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক বক্তব্যের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে যেখানে খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে ১১৫টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬২টিতে—যা ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি।
গত মাসে বড়দিন উদযাপনকে কেন্দ্র করে হিন্দু আধিপত্যবাদীদের সহিংসতা ও ভয় দেখানোর ঘটনায় স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। রাজধানী দিল্লিসহ মধ্যপ্রদেশ, আসাম, কেরালা, উত্তরপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও ছত্তিশগড়—ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এমন ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশে মোদীর বিজেপির একজন নেতা এমন একটি জনতার নেতৃত্ব দেন, যারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আয়োজিত একটি ক্রিসমাস মধ্যাহ্নভোজে হামলা চালায়। এবং দিল্লিতে উগ্র হিন্দুবাদীরা সান্তা টুপি পরা নারীদের ভয় দেখায়।
কেরালায় কয়েকটি স্কুলে বিজেপি ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ক্রিসমাস উদযাপনের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়া হয়।
এ ছাড়া একই রাজ্যে একজন আরএসএস কর্মী কিশোর ক্যারোলারদের ওপর হামলা চালানোর ঘটনাও ঘটে।
ভারতের মোট জনসংখ্যার মধ্যে খ্রিস্টানদের সংখ্যা মাত্র ২.৩ শতাংশ, মুসলমান ১৪.২ শতাংশ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের অংশ প্রায় ৮০ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা নানা ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা দাবির ওপর ভর করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সন্দেহ, ক্রোধ ও ঘৃণা উসকে দিচ্ছে। যা ভারতের সামাজিক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপন দেশ/এসএস/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































