Apan Desh | আপন দেশ

মেসির বিদায়ে নীল সাদায় শূন্যতা

ক্রীড়া ডেস্ক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১০:৪৪, ৭ অক্টোবর ২০২৬

মেসির বিদায়ে নীল সাদায় শূন্যতা

ছবি : সংগৃহীত

আর্জেন্টিনায় গেল রাতটা শেষ পর্যন্ত আগের রাতগুলোর মতো থাকেনি! আলো ছিল, মানুষ ছিল, গর্জন ছিল-কিন্তু সবকিছুর ভেতর লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত হাহাকার। মনুমেন্তালের ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক সেদিন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে আসেননি। তারা এসেছিলেন ইতিহাসের শেষ দৃশ্যটির সাক্ষী হতে।

বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়েছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ও! নীল-সাদা জার্সিতে যে মানুষটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে কোটি কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন, সে মানুষটিই শেষবারের মতো মাঠ ছেড়েছিলেন জাতীয় দলের হয়ে। ম্যাচের ফল সংগত ভাবেই আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩-০ গোলে। কিন্তু সে ফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠল মেসির বিদায়! মেসির কান্না ভেজা বিদায়!

একসময় এলোমেলো চুলের, লাজুক চোখের এক কিশোর নেমেছিলেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে। ২০০৫ সালের সে শুরু থেকে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত পেরিয়ে গিয়েছিল ২১ বছর। এ দীর্ঘ সময়ে মেসি শুধু ম্যাচ খেলেননি, তিনি একটি জাতির ফুটবল-অনুভূতির সঙ্গে নিজের নামটিকে এমনভাবে জড়িয়ে দিয়েছিলেন যে তার বিদায় যেন শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় হয়ে থাকেনি।

২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, ৬৮ অ্যাসিস্ট-পরিসংখ্যানের খাতায় সংখ্যাগুলো হয়তো এমনই লেখা থাকবে। কিন্তু সে সংখ্যাগুলো কখনোই বোঝাতে পারবে না, মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনার মানুষের আবেগ কতটা গভীর ছিল। কারণ এ গল্পের শুরুটা মোটেও রূপকথার মতো ছিল না!

বরং একটা সময় আর্জেন্টিনার জার্সিই হয়ে উঠেছিল মেসির সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, পরপর দুই কোপা আমেরিকায় ব্যর্থতা-প্রতিটি হারের পর প্রশ্ন উঠেছিল তাকে ঘিরে। ২০১৬ সালে তো সে চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু মহাকাব্য তখনও শেষ হয়নি!

২০২১ সালে সে মারাকানাতেই বদলে গিয়েছিল গল্প। কোপা আমেরিকার ট্রফি হাতে নিয়ে মেসি যেন বহু বছরের অপেক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এরপর ফিনালিসিমা, কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা-একটির পর একটি শিরোপা এসে সাজিয়েছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

যে মানুষটিকে একসময় ব্যর্থতার প্রতীক বানিয়ে সমালোচনা করা হয়েছিল, তিনিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে আপন মানুষ। কাতারের মরুভূমিতে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে মেসির সে রাজকীয় পদচারণা যেন বহু বছরের আক্ষেপের চূড়ান্ত উত্তর হয়ে এসেছিল।

আরও পড়ুন<<>>গোল-অ্যাসিস্টে বিদায় রাঙালেন মেসি

২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসি ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান ভরসা। স্পেনের কাছে ফাইনালে হেরে শিরোপা ছুঁতে না পারলেও ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্টে তিনি আবারও দেখিয়েছিলেন, বয়স তার পায়ের জাদুকে পুরোপুরি থামাতে পারেনি।

তবু সব গল্পেরই তো শেষ থাকে! ৩১ আগস্ট অবসরের ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই অপেক্ষা ছিল শেষ রাতটির। অবশেষে সে রাত এসেছিল নিজের শহরে, নিজের মানুষের সামনে। মনুমেন্তালের গ্যালারি পরিণত হয়েছিল সাদা-আকাশী সমুদ্রে। সতীর্থরা দাঁড়িয়েছিলেন অধিনায়কের পাশে। রদ্রিগো দে পল, লো সেলসো, ক্রিস্তিয়ান রোমেরোদের জন্যও মুহূর্তটি ছিল আবেগের। তারপর এসেছিল ম্যাচের শেষ বাঁশি!

একটি শব্দের সঙ্গে শেষ হয়েছিল ২১ বছরের আন্তর্জাতিক যাত্রা। ম্যাচের ফলাফল হয়তো সময়ের সঙ্গে পরিসংখ্যানের পাতায় হারিয়ে যাবে। কিন্তু মেসির শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে দাঁড়ানোর দৃশ্যটি হারাবে না। শেষবার বল পায়ে নেয়া, শেষবার সতীর্থদের সঙ্গে ছুটে যাওয়া, শেষবার মনুমেন্তালের গর্জনের মধ্যে মাঠ ছাড়ার মুহূর্ত-সবকিছুই হয়ে থাকবে স্মৃতির অংশ।

আর বেনিনও পেয়েছিল ইতিহাসে নিজের একটি বিশেষ জায়গা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আগে কখনো খেলেনি দলটি। ফলে আফ্রিকার দলটির নামও চিরতরে জড়িয়ে গেল মেসির বিদায়ী ম্যাচের সঙ্গে।

মেসি বিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু তার গল্প শেষ হয়নি! কারণ কিছু খেলোয়াড় মাঠ ছাড়েন, আর কিছু খেলোয়াড় মাঠ ছাড়ার পরও থেকে যান। রেকর্ডে, ছবিতে, স্মৃতিতে এবং কোটি মানুষের ভালোবাসায়। মেসি ছিলেন সে দ্বিতীয় দলের।

নীল-সাদা জার্সিতে তার শেষ রাত পেরিয়ে গিয়েছিল। মনুমেন্তালের আলোও একসময় নিভে গিয়েছিল। দর্শকের গর্জন থেমে গিয়েছিল। মাঠ খালি হয়েছিল। শুধু আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিটি যেন তখনও বলে যাচ্ছিল-একজন মেসি চলে গেছেন, কিন্তু মেসির গল্প কখনো শেষ হওয়ার নয়!

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়