Apan Desh | আপন দেশ

দ্বিতীয় যমুনা সেতু: উত্তরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন করিডোর

শাহিদুর রহমান শাহিদ

প্রকাশিত: ১৬:৪৬, ১৩ মে ২০২৬

দ্বিতীয় যমুনা সেতু: উত্তরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন করিডোর

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে যমুনা নদী এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে এ নদী যেমন উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে ভৌগোলিক বিভাজন তৈরি করেছে, তেমনি যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণেও উত্তরাঞ্চল উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল।

১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সে বাস্তবতায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসে। দেশের প্রথম বহুমুখী সড়ক-রেল সেতু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে সরাসরি রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, শিল্প, রপ্তানি, পরিবহন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যাপক গতি সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, যমুনা সেতু চালুর পর উত্তরাঞ্চলে শিল্প বিনিয়োগ, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং আন্তঃজেলা বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এ সেতু ব্যবহার করছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব মৌসুমে যানবাহনের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিকল্প যমুনা সেতু এখন সময়ের দাবি।

এম গোলাম মোস্তফার লেখা<<>> ধানের শীষ: মওলানা ভাসানী, যাদু মিয়া ও জিয়াউর রহমান

২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানান, দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কার্যক্রম চলছে। দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য রুট হিসেবে বগুড়ার সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ করিডোরের পাশাপাশি গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট, গুঠাইলবাজার অথবা দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত করিডোরও বিবেচনায় রয়েছে। বর্তমান বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ, ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক চাহিদা এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের বিষয়গুলোই মূলত বিকল্প সেতুর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এ আলোচনায় নতুন করে সামনে এসেছে ঐতিহাসিক বাহাদুরাবাদ ঘাট। বাংলাদেশের যোগাযোগ ইতিহাসে বাহাদুরাবাদ শুধু একটি ঘাট নয়; এটি ছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। যমুনা সেতু নির্মাণের আগে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় যেতে হলে ট্রেনযোগে যাত্রীরা বাহাদুরাবাদ ঘাটে এসে নামতেন। এরপর স্টিমার বা ফেরিতে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে অপর প্রান্তের তিস্তামুখ ঘাটে পৌঁছে পুনরায় ট্রেনে উঠতে হতো। এ বাহাদুরাবাদ-তিস্তামুখ নৌ-রেল যোগাযোগ ছিল একসময় উত্তরবঙ্গের প্রধান পরিবহন করিডোর।

বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলে বাহাদুরাবাদ ঘাট উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। উত্তরাঞ্চলের ধান, পাট, গম, আলু, ভুট্টা, তামাকসহ কৃষিপণ্য এবং বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী এ রুট হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন হতো। ঘাটকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিশাল ব্যবসায়িক কার্যক্রম, গুদাম, শ্রমবাজার, হোটেল, নৌ ও রেল পরিবহন কেন্দ্র। সে সময়ে বাহাদুরাবাদ ঘাটকে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বারও বলা হতো।

১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু চালুর পর কুলকান্দি ইউনিয়নে অবস্থিত বাহাদুরাবাদ ঘাটের গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। রেল ও সড়ক যোগাযোগ নতুন রুটে স্থানান্তরিত হওয়ায় এখানকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমও ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমানে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য রুট নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর আবারও নতুন সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় মানুষ।

এ প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইলবাজার এলাকা। এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যমুনা নদীর তীরবর্তী এ এলাকা উত্তরাঞ্চল, ময়মনসিংহ অঞ্চল এবং ঢাকার সঙ্গে সংযোগের দিক থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে ইসলামপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট বা গুঠাইলবাজার এলাকা দিয়ে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ করা হলে এটি উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

এ করিডোর বাস্তবায়িত হলে জামালপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানী ও অন্যান্য বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে। পরিবহন ব্যয় কমবে, শিল্পায়নের সুযোগ বাড়বে এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল, গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ ও লজিস্টিক হাব গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অবহেলিত নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

গুঠাইলবাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি ঐতিহাসিক বাহাদুরাবাদ করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে নতুন সেতু নির্মিত হলে পুরোনো উত্তরবঙ্গ-ঢাকা যোগাযোগ রুট নতুনভাবে অর্থনৈতিক প্রাণ ফিরে পেতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সড়ক ও রেল যোগাযোগ সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও এ করিডোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারে। বর্তমানে যমুনা রেল সেতু চালুর মাধ্যমে রেল যোগাযোগে নতুন গতি এসেছে। ভবিষ্যতে মালবাহী পরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় একটি আধুনিক সড়ক-রেল সমন্বিত সেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ বা গুঠাইলবাজার পর্যন্ত সেতু নির্মাণের দাবিতে স্থানীয় পর্যায়ে মানববন্ধন, মতবিনিময় সভা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের দাবি—দ্বিতীয় যমুনা সেতুটি যেন ইসলামপুর উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট বা গুঠাইলবাজার এলাকা দিয়েই নির্মাণ করা হয়। তাদের মতে, এ রুট বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।

তবে এর মধ্যেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনও দৃশ্যমান হচ্ছে। কে কোন রুটের পক্ষে, কোন উপজেলার মধ্য দিয়ে সেতু গেলে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা বেশি হবে—এ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা প্রকল্পটিকে বিতর্কিত করে তুলতে পারে। অথচ একটি জাতীয় মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে আবেগ বা রাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

বাস্তবতা হলো, দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেবল আরেকটি সেতু নয়; এটি হবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই এর স্থান নির্ধারণে ট্রাফিক বিশ্লেষণ, রেল-সড়ক সমন্বয়, নদীর ভাঙন ও প্রবাহ, পরিবেশগত প্রভাব, শিল্পায়নের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক করিডোরের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনায় বাহাদুরাবাদ-গুঠাইলবাজার করিডোরকে কাজে লাগানো গেলে উত্তরবঙ্গের কৃষি ও শিল্প অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু কোথায় হবে- এ সিদ্ধান্ত কেবল একটি জেলার উন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। তাই রাজনৈতিক টানাটানি নয়, বরং তথ্যভিত্তিক গবেষণা, ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই নিতে হবে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্ত উত্তরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি গতিশীল করবে, সে সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত জাতীয় সিদ্ধান্ত।

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement