Apan Desh | আপন দেশ

প্রশাসনও কি অটোপাশের মত অটো বাসের ড্রাইভিং সিটে?

ফিরোজ আলম মিলন

প্রকাশিত: ১৪:৪০, ৯ মার্চ ২০২৬

প্রশাসনও কি অটোপাশের মত অটো বাসের ড্রাইভিং সিটে?

ছবি: আপন দেশ

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের প্রশাসনে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের অপবাদে ঘটেছিল পঁচাত্তরে এক ভয়াবহ পরিণতি। তৎপরবর্তী অনেক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র বা প্রশাসন। বারংবার নানা ষড়যন্ত্রের মুখে হোঁচট খেয়েও ধীরে ধীরে চলছিল দেশের প্রশাসন নামের গাড়িটি।

বহু উত্থান-পতনের পরবর্তী দীর্ঘ সময় শাসনকাল অতিবাহিত করে ফ্যাসিবাদ তকমা নিয়ে গত চব্বিশে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে একটি রাজনৈতিক সরকারকে। জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। উত্তাল আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ। কিন্তু তার ফসল ঘরে তুলেছে মুষ্টি কয়েকজন ব্যক্তি পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্তারা। এতে দেখা গেল প্রশাসনে আদু ভাইরাই ঝাপটি মেরে বসেছে বড় বড় আসনগুলোতে। তাদের এনালগ ভুলভাল সিদ্ধান্তের কারণে দেশ যেন পিছনে হাটছিল। গণদাবির মুখে দিতে হলো নির্বাচন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে গঠিত হলো রাজনৈতিক সরকার। প্রত্যাশা ছিল এবার ফিরে আসবে প্রশাসনে নতুন নেতৃত্ব ও দেশ পরিচালনায় গতিশীলতা। 

কিন্তু না। রোমাঞ্চকরভাবে সাজানো সরকারেরও গতিবিধি দৃশ্যমান হচ্ছে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে আদু ভাইদেরকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনে নিয়মিত দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবীদের বঞ্চিত করে রুদ্ধ করা হচ্ছে তাদের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির পথ। তাতে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, পুরাতন বাদ্যযন্ত্রের ডামাডোলে অতিষ্ঠ গোটা প্রশাসনিক কাঠামো। আধুনিকায়নের যুগে যেখানে পুরাতন হারমোনিয়াম, দোতারার সুরে গান শুনতে অনীহা দর্শক শ্রোতার সেখানে প্রশাসনিক কর্মকান্ড থেকে ২০ বছর দূরে থাকা ব্যক্তিকেও মাজাঘষা করে এনে সুর উঠায়ে সরকার কতটুকু সফলভাবে জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়সহ সর্বত্র।

আরও পড়ুন<<>> বিতর্ক, পক্ষপাত-বিশ্বাস ঘাটতির প্রতিচ্ছবি মাহফুজ আনাম

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে একদিকে যেমন বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনার মুখে নতুনরা তেমনিভাবে প্রমাণিত হচ্ছে নতুনদের মাঝে বিশ্বস্ত, যোগ্য, মেধাবী শূন্যতায় সরকার। চুক্তিভিত্তিক একটি চেয়ার ইজারা দেয়া মানে প্রশাসনের নিজ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়া। প্রত্যেকেরই প্রত্যাশা থাকে কর্মজীবনে দীর্ঘকাল অতিক্রম করে সর্বোচ্চ আসনটিতে নিজেকে আসীন করা। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের তোপে নিয়মিত ব্যাচের যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হলে তখন সরকার তার কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কোনভাবেই ক্ষীণ করে দেখার নয়। 

পূর্বেকার সরকারের রোশানলে বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার পরও তাদের মাঝে থেকে অনেককে চুক্তিভিত্তিক পদায়ন সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না প্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তারাই। তাদের দাবি একটাই তাহলে চাকরির মেয়াদকাল থাকার কি প্রয়োজন? 'যতদিন কর্মক্ষম ততদিন কর্মজীবন'। এই নীতি প্রবর্তন করলেই হয়ে যায় সকলের চাওয়া পাওয়ার সমাপ্তি। সদ্য ধামাকা গতিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বিতর্কের দানা বেঁধেছে সর্বমহলে। উভয় সরকারের শাসন আমলে সুবিধাভোগী ব্যক্তিরাই পুনঃ পুনঃ সুবিধাভোগী থেকেই যাচ্ছে। যেখানে অধঃস্থনরা বঞ্চিতের ধারাবাহিক পাল্লার বাটখারা হয়ে নিরব কান্নায় ধুঁকছে আর ভাবছে সরকার কোন দিকে হাঁটছে। তবে কি সরকার যোগ্য ব্যক্তির অভাবে ভুগছে? নাকি নিয়মিতদের আরেক অগ্নিপরীক্ষা নিচ্ছে।

ধারাবাহিকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হচ্ছে দেখে একজন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ বললেন, অবস্থাদৃষ্টে বুঝা যাচ্ছে গত এক সরকার গেল দাবি দাওয়ার সরকার, বর্তমান সরকার এসে মনে হয় বয়স্ক পুনর্বাসন সরকারে রূপ নিয়েছে যাকে ভিন্ন ভাষায় বলা চলে আবদারের সরকার। না জানি কোন এক সময় এদের জন্য ভ্রাম্যমাণ থেরাপি সেন্টারও ভাড়ায় আমদানি করতে হয়। ২০২৪ এর আগস্ট ৫ তারিখের পরে 'চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম 'চুক্তি বাতিল, চুক্তি নিয়োগ ফলাফল বিয়োগ'। আবার লিখেছিলাম 'সত্তোরোর্ধ্বদের পদচারণায় মুখরিত সচিবালয় হেতু জানতে চাইলে বলতে রাজি নয়'।

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পরবর্তী নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে গঠন করা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ পরবর্তী প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ঢেউয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে যে সত্তোরোর্ধ্বদের পদচারণা দ্বিগুণ বেড়েছে পাশাপাশি নিয়োগও পাচ্ছে। কেউ কেউ আছে এমনও ভাব নিয়ে যে, কাগজে পত্রে নিয়োগ না পেলেও জোর করে কোন এক সচিবের চেয়ারে বসে নিজেকে সচিব হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দেবে। 

আরও পড়ুন<<>> জিয়ার দর্শন: ন্যায়ের শাসন। গ্রামই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু

গত সপ্তাহে তাদেরই একজন কৌতুকের সুরে বলতেছিল আমাদের দেশে মরণোত্তর বিভিন্ন পদক দেয়ার প্রচলন যেহেতু আছে সেহেতু মরণোত্তর সচিব বানানোর প্রচলনও চালু হতে পারে। ২০ বছর কর্মজীবন থেকে বাইরে থেকেও এখনো পূর্বের সেই দম্ভ কাটেনি তাই এই দম্ভের ভারে কখন সে যায় মরে। তাই শেষ প্রাপ্তির আক্ষেপ মিটানোর জন্য তাদেরকে মরণোত্তর হলেও স্বীকৃতিতো দিতে হবে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মকর্তা চুক্তিতে উল্লেখিত শুধু ওই দফতরেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। তাদের বদলি বা ওএসডি করা বিধিসম্মত নয়। কিন্তু সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার অতীতের সেই রীতি-নীতিও ভঙ্গ করেছে। চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের দফতর বদল পাশাপাশি ওএসডি করে নজিরের স্থলে বেনজির সৃষ্টি করেছে। এভাবে ভঙ্গুর একটি দেশের চালিকাশক্তি প্রশাসন বেশিদিন টিকতে পারে না।

তাই সরকারকে অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে জাতিকে সুখী সমৃদ্ধশালী করার স্বপ্ন বাস্তবায়নে পিছনে হাঁটা নীতি পরিবারের মধ্য দিয়ে বৃদ্ধাশ্রম না বানিয়ে ৭০ থেকে ৮০ বছরের পুরনো ঘুনে ধরা বয়স বৃদ্ধদের ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করে। প্রয়োজন প্রশাসনের গতিতে আরো দ্রুততা সাধনের লক্ষে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, বদলি সম্পূর্ণ পরিহার করে নতুনদের মাঝ থেকে যোগ্যতা, দক্ষতা, বিশ্বস্ততা ও সততার মানদণ্ডে বিচার করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পদায়নের পথ অনুসরণ করে বৈষম্যহীন প্রশাসন উপহার দেয়ার পথে হাঁটা। এক কথায় কয়লার ইঞ্জিনের রেলগাড়িতে না চড়ে আধুনিক যুগের মেট্রোরেল বা বুলেট ট্রেনের যাত্রী হওয়া উচিত।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়