ছবি: সংগৃহীত
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, ত্যাগ আর আপসহীন নেতৃত্বের এক দীর্ঘ অধ্যায় শেষে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। শারীরিকভাবে তিনি আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর জীবন, আদর্শ ও সংগ্রাম বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনভাবে মিশে আছে, যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
সময় যত যাবে, রাজনীতির ভাষা যত বদলাবে, বেগম খালেদা জিয়ার নাম ততই উচ্চারিত হবে একজন দৃঢ়চেতা, সাহসী, বিচক্ষণ ও মানবিক নেত্রী হিসেবে। রাজনীতির মাঠে তিনি ছিলেন আপসহীন। ব্যক্তিত্বে ছিলেন দৃঢ়। সিদ্ধান্তে ছিলেন নির্ভীক। আবার মানুষ হিসেবে ছিলেন গভীরভাবে মানবিক। রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট ভুলে যাননি। ক্ষমতায় থাকুন বা বিরোধী দলে, দেশের মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি কখনো পিছু হটেননি।
আমি দীর্ঘ সময় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। কাছ থেকে দেখেছি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর মানবিক দিক। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, আমার কাছে তিনি ছিলেন মায়ের মতো স্নেহশীল, আশ্রয়দাত্রী, অনুপ্রেরণার উৎস। রাজনৈতিক জীবনে বহু সংকটে, বহু কঠিন মুহূর্তে তিনি ছিলেন আমার সাহসের জায়গা, শ্রদ্ধার ঠিকানা। এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন এ দেশের মাটি ও মানুষের জন্য। তাঁকে মানুষ কতটা ভালোবাসত, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে তাঁর জানাজায়। লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, অশ্রুসিক্ত চোখ, নীরব প্রার্থনা, সব মিলিয়ে সেদিন একটি কফিন ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল পুরো বাংলাদেশ। মানুষ শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নয়, বিদায় জানিয়েছে তাদের প্রিয় দেশনেত্রীকে। আমার জীবনে বেগম খালেদা জিয়া শুধুই একটি স্মৃতি নয়, তিনি শক্তি, সাহস ও প্রেরণার প্রতীক।
ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল-এর লেখা >> ‘চির ভাস্বর : জনতার জিয়া’
আজ বিএনপির প্রতিটি নেতা-কর্মীর জন্য এটি একটি বড় দায়িত্বের সময়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ধারণ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাঁকে যেন জীবনের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে কোনো নেত্রীর মৃত্যু ঘিরে বিশ্বজুড়ে এমন শোক ও প্রতিক্রিয়া সত্যিই বিরল। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন-এটাই আমাদের প্রার্থনা।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি। একজন সাধারণ বাঙালি গৃহবধূ হিসেবে রাজনীতিতে পা রেখে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এই চার দশকের পথচলায় তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রায় সব উত্থানপতনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশীজন ছিলেন। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণমানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে জেলজুলুম, নির্যাতন ও অবিচার।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যার পর তাঁকে ক্যান্টনমেন্টে বসবাসের জন্য একটি বাড়ি দেওয়া হয়েছিল। সেই বাড়ি থেকেও তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়। বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে তিনি এক সন্তানকে ভোটের অধিকারহারিয়েছেন। আরেক সন্তানকে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। নিজে ছিলেন গৃহবন্দি। কিন্তু এত কষ্ট, এত শোক, এত নিপীড়নের পরও তিনি থেমে যাননি। মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে গেছেন অবিচলভাবে, এই ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
জিয়াউর রহমান হত্যার পর বিচারপতি আবদুস সাত্তারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় দলের একটি অংশ তাঁকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার প্রস্তাব দিয়েছিল। সে সময় তিনি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন হয়তো অন্যভাবে এগোতে পারত। এই বিষয়টি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তাঁর গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া হার মানার মানুষ নন। ষড়যন্ত্রের ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার উঠে দাঁড়িয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন বলেই অনেকে তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ফিনিক্স পাখি’ বলে অভিহিত করেন। স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে টানা ৯ বছরের আপসহীন আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। কোনো দেশবিরোধী শক্তির সঙ্গে তিনি কখনো আপস করেননি। তবে জনগণের মতামতকে তিনি সব সময় গুরুত্ব দিয়েছেন। জীবনে কোনো নির্বাচনে তিনি পরাজিত হননি, এটিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
এএইচএম ফারুকের লেখা >> আপসহীনতার অবিনাশী প্রতীক: বেগম খালেদা জিয়া ও গণতন্ত্রের চার দশক
রাজনীতিতে না এলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন হয়তো অনেক বেশি স্বস্তির হতো। একজন সেনাপ্রধানের স্ত্রী, একজন বীরউত্তমের স্ত্রী, একজন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে তিনি সম্মান ও নিরাপত্তার অভাব অনুভব করতেন না। কিন্তু দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে তিনি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যেন ‘কঠিনকেই ভালোবাসলেন’। ৩০ বছর আগে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে একজন মুসলিম নারীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াই সহজ ছিল না। একজন বিধবা নারী সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন-এই ইতিহাস সাহস ও দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি সেই লড়াইয়ে জয় নিয়েই ঘরে ফিরেছেন। তাঁর শাসনামলে নারীশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ফিরে পেয়েছে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা।
৮০ বছরের জীবনে ৪০ বছরের বেশি সময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা সহজ কথা নয়। তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বহুবার সংসদে ও রাজপথে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আধুনিক বিশ্বে তাঁর মতো একজন জনপ্রিয় নেত্রীকে দীর্ঘদিন গৃহবন্দি রাখার নজির খুবই বিরল। ক্ষমতায় থাকুন বা বিরোধী দলে, বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা কখনো কমেনি, বরং শেষ দিন পর্যন্ত বেড়েছে। তিনি কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁর আরেক নাম হয়ে উঠেছে-আপসহীন সংগ্রাম।
মিয়ানমারের অং সান সু চি যে সংগ্রামের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন, তার তুলনায় বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন প্রতীক। জুলাই গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার অভিভাবক। বেগম খালেদা জিয়ার মতো নেতা যুগে যুগে জন্মান না। তিনি কী ছিলেন, তা এখন আরও স্পষ্ট-যখন তিনি নেই। তাঁর মুক্তির দাবিতে প্রতিদিন রাজপথ কেঁপেছে। আজও রাজপথে তাঁর নামেই স্লোগান ওঠে। ‘প্রিয় দেশবাসী’, এই ডাক শোনার অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই যেন তাঁর জন্ম। তিনি হারেন না, থেমে যান না, বারবার ঘুরে দাঁড়ান। শতবার। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো তিনিও তাঁর দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর লড়াই ছিল মানুষের মুক্তির লড়াই। মৃত্যু তাঁর জীবনকে পৃথিবীর সামনে এমনভাবে তুলে ধরেছে, যা সত্যিই বিরল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েরা সাহস, আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার মতো হতে চাইবে-এই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। অমর দেশপ্রেম, আপসহীন সংগ্রাম আর অসীম ত্যাগের প্রতীক হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের গভীরে। তাঁর আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণ করাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।
লেখক : সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী ও সমন্বয়ক, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, কেন্দ্রীয় কমিটি। সৌজন্যে-বাংলাদেশ প্রতিদিন
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































