Apan Desh | আপন দেশ

কাজী নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ শতবর্ষ পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

প্রকাশিত: ১৭:০৬, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬

কাজী নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ শতবর্ষ পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক

ফাইল ছবি

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এক অনন্য, অদ্বিতীয় ও যুগান্তকারী সৃষ্টি। মাত্র ২২ বছর বয়সে রচিত এই কবিতাটি শুধু সাহিত্যকর্ম হিসেবেই নয়, বরং পরাধীন জাতির আত্মজাগরণের এক বজ্রনিনাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কলকাতার ৩/৪সি, তালতলা লেনের একটি বাড়িতে বসে নজরুল কাঠের পেন্সিলে রচনা করেছিলেন এই কালজয়ী কবিতা। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি শুক্রবার সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশের মধ্য দিয়েই ‘বিদ্রোহী’ বাংলা সমাজ, সাহিত্য ও রাজনীতিতে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।

কমরেড মুজফফর আহমদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রথমে মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রকাশের জন্য দেওয়া হয়েছিল। তবে পত্রিকাটির অনিয়মিত প্রকাশনার কারণে কবিতাটি আগে ছাপা হয় বিজলী পত্রিকায়। পরে মোসলেম ভারত, প্রবাসী, বসুমতী ও সাধনাসহ একাধিক পত্রিকায় এটি পুনঃপ্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর পাঠকমহলে এমন তীব্র সাড়া পড়ে যে, বৃষ্টির মধ্যেও বিজলী পত্রিকাটি একই সপ্তাহে দু’বার মুদ্রণ করতে বাধ্য হয়—যা সে সময়ের জন্য ছিল বিরল ঘটনা।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার মূল শক্তি এর ভাষা, ছন্দ, উপমা ও বিপুল আত্মঘোষণায়।
“বল বীর— বল উন্নত মম শির!..............”

এই আহবান ছিল মূলত ভীরু, পরাধীন ও আত্মসম্মানহীন করে রাখা বাঙালির উদ্দেশে। কবিতাটিতে ১৪টি স্তবক, প্রায় ১৪১টি পঙক্তি এবং ১৪৫ বার ‘আমি’ শব্দের ব্যবহার নজরুলের আত্মচেতনার প্রকাশ নয়; বরং তা ছিল পরাধীন ভারতের স্বাধীনতাকামী মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। ‘আমি’ এখানে ব্যক্তি নয়—একটি জাতির প্রতিনিধি।

তৎকালীন বাংলাসাহিত্য ছিল মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাববলয়ের মধ্যে আবদ্ধ। অনেক প্রতিভাবান কবি সেই বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি সফল হননি। এমন সময় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে নজরুলের আবির্ভাব বাংলা কবিতায় এক নতুন ধারার সূচনা করে। বুদ্ধদেব বসু যথার্থই বলেছেন, বিদ্রোহী কবিতার আগমনেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙতে শুরু করে।

এই কবিতার পেছনে ছিল সময়ের গভীর রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, রুশ বিপ্লব, ভারতে গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন, ব্রিটিশ শাসনের দীর্ঘ শোষণ ও নিপীড়ন—সবকিছু মিলেই নজরুলের মনে সৃষ্টি করেছিল এক প্রবল বিদ্রোহী চেতনা। সেই চেতনাই রূপ নিয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়।

আরও পড়ুন<<>> জিয়ার দর্শন: ন্যায়ের শাসন। গ্রামই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু

কবিতাটিতে নজরুল হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও পৌরাণিক অনুষঙ্গ একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন। রুদ্র, মহাদেব, বাসুকী, ঈশান যেমন আছে—তেমনি আছে ইস্রাফিল, জিব্রাইল, আরশ, বোরাক। এই সমন্বয়ের ফলে কবিতাটিকে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি রাজদ্রোহ বা রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে ঘোষণা করতে পারেনি। তবে বাস্তবে কবিতাটি ছিল কার্যত নিষিদ্ধের মতোই। যেখানে পাওয়া যেত, সেখানেই পত্রিকা জব্দ করা হতো এবং নজরদারিতে রাখা হতো কবি ও প্রকাশকদের।

কবিতাটি রচনার পরদিন সকালে নজরুল প্রথম এটি পড়ে শোনান তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কমরেড মুজফফর আহমদকে। তিনিই ছিলেন ‘বিদ্রোহী’র প্রথম শ্রোতা। পরে আফজালুল হক ও অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য কবিতাটি শুনে দ্রুত প্রকাশের উদ্যোগ নেন। মুজফফর আহমদের বর্ণনায় জানা যায়, নজরুল এত দ্রুত কবিতাটি পড়ে শোনাতে পেরেছিলেন বলেই ধারণা করা হয়—তিনি এটি গভীর রাতেই লিখেছিলেন।

‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের পর নজরুলের খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তরুণ সমাজ কবিতাটিকে স্বাধীনতার মন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে। রাজনৈতিক সভা, মিছিল, আড্ডা—সবখানেই উচ্চারিত হতে থাকে বিদ্রোহীর ভাষা। কেউ কেউ ব্যঙ্গও করেছিলেন। সজনীকান্ত দাস ‘ব্যাঙ’ নামে একটি প্যারোডি কবিতা লেখেন। কিন্তু এই ব্যঙ্গ বিদ্রোহীর প্রভাব কমাতে পারেনি—বরং বিতর্কের মধ্য দিয়ে কবিতাটির জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।

১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার অ্যালবার্ট হলে কাজী নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী কবি ও জাতীয় কবি হিসেবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং প্রধান অতিথি ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। সংবর্ধনার জবাবে নজরুল স্পষ্ট করে বলেন—তিনি বিদ্রোহ করেছেন অন্যায়, অত্যাচার, কুসংস্কার ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে। মানুষের মুক্তির জন্যই তাঁর এই বিদ্রোহ; কোনো ব্যক্তি বা ধর্মের বিরুদ্ধে নয়।

নজরুল নিজেই বলেছেন, ‘বিদ্রোহী’ শব্দটি কেউ কেউ ভুলভাবে কলঙ্ক হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু তিনি এটিকে মনে করেছেন গৌরবের তিলক। সমাজের পুরাতন, পচা, মিথ্যা ও অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি অকুতোভয়ে দাঁড়িয়েছেন—এই কারণেই তিনি বিদ্রোহী।

বাংলা সাহিত্যের বহু বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মনে করেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতাই নজরুলের প্রথম পূর্ণ আত্মোপলব্ধিজাত রচনা। প্রেমেন্দ্র মিত্র, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, রফিকুল ইসলামসহ অনেকেই একে বাংলা সাহিত্যের যুগ-প্রবর্তক কবিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

আজ কবিতাটি রচনার ১০৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও এর আবেদন একটুও ম্লান হয়নি। অন্যায়, নিপীড়ন, সাম্রাজ্যবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম যতদিন থাকবে, ততদিন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাও প্রাসঙ্গিক থাকবে। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক কবিতা নয়—এটি এক চিরন্তন মানবিক ঘোষণাপত্র।

জাতিসত্তার কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অমর সৃষ্টি বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে চিরকাল অম্লান থাকবে।

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, E-mail : [email protected]

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়