Apan Desh | আপন দেশ

ঐক্য সরকার নয়-তারেক রহমানের কৌশলী বার্তা

আফজাল বারী

প্রকাশিত: ২০:২৮, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ২০:৪২, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ঐক্য সরকার নয়-তারেক রহমানের কৌশলী বার্তা

ছবি: আপন দেশ

রয়টার্সকে দেয়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারটি নিছক একটি নির্বাচনী বক্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল রাজনীতিতে বিএনপির ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি, কৌশলগত হিসাব এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার একটি সচেতন প্রয়াস। এ সাক্ষাৎকারের প্রতিটি বাক্যে আছে আত্মবিশ্বাস, দূরত্ব তৈরি করার কৌশল এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন করে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তারেক রহমানের সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য- বিএনপি জয়ী হলে কোনো ‘ঐক্য সরকার’ গঠন করবে না। প্রথম দেখায় এটি একটি সরল রাজনৈতিক ঘোষণা মনে হলেও, বাস্তবে এটি একটি কড়া বার্তা। এ বার্তার মূল কথা হলো: বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তারা আপসহীনভাবে এককভাবে শাসন করবে এবং বিরোধী রাজনীতির জায়গা সংসদের ভেতরেই থাকবে।

এ অবস্থানের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছেন- সরকারে সবাই থাকলে বিরোধী দল থাকবে কোথায়? বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে বিরোধী দল প্রায়ই কোণঠাসা বা অকার্যকর হয়ে পড়ে, সেখানে এ বক্তব্য একটি নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে। তিনি যেন বলতে চাইছেন, শক্ত সরকার যেমন দরকার, তেমনি শক্ত বিরোধী দলও দরকার- কিন্তু সেটি সরকারে নয়, সংসদের বিরোধী বেঞ্চে।

তবে এ সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলী অংশ হলো জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গ। অতীতে বিএনপি–জামায়াত জোটের ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্কিত অধ্যায়। সে প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের স্পষ্ট ঘোষণা- জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে কোনো ঐক্য সরকার নয়- একটি হিসেবি রাজনৈতিক দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়। এটি পশ্চিমা বিশ্বকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি দেশের শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের উদ্দেশেও একটি বার্তা: বিএনপি আর আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, তারা নিজেদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চায়।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়- এ দূরত্ব কতটা বাস্তব, আর কতটা কৌশলগত? মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্বাচনী সমীকরণ বিএনপিকে কতটা স্বাধীনভাবে চলতে দেবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত। তবুও, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক সমর্থনের প্রশ্নে বিএনপি যে আপস করতে চায় না, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে তারেক রহমানের বক্তব্যে লক্ষ্য করা যায় এক ধরনের পরিমিত বাস্তববাদ। ভারত বনাম চীন- এ প্রচলিত দ্বৈততার ফাঁদে না পড়ে তিনি সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ যাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে নিশ্চিত হবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করা হবে। এটি কূটনৈতিক ভাষায় বলা হলেও, রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এতে একদিকে ভারতকে সরাসরি দূরে সরানোর বার্তা নেই, অন্যদিকে চীনের দিকে অন্ধ ঝোঁকের আশ্বাসও নেই।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তারেক রহমানের অবস্থান মানবিক হলেও বাস্তববাদী। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কথা বলে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেকে সামঞ্জস্য করেছেন। এটি একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়কসুলভ অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।

শেখ হাসিনার সন্তানদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে একটি তুলনামূলক উদার দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। ‘জনগণ গ্রহণ করলে সবারই রাজনীতি করার অধিকার আছে’- এ বক্তব্য ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সহনশীলতার একটি সম্ভাব্য জানালা খুলে দেয়।

সব মিলিয়ে, রয়টার্সকে দেয়া এ সাক্ষাৎকার বিএনপির জন্য একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র। এটি সরকার পরিবর্তনের সরল গল্প নয়, আবার নিছক নির্বাচনী স্লোগানও নয়। এখানে আছে ক্ষমতায় যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়, বিতর্কিত অতীত থেকে দূরে সরে আসার চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার স্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা। এখন দেখার বিষয়- এ উচ্চকণ্ঠ আত্মবিশ্বাস ভোটের বাক্সে কতটা প্রতিফলিত হয়, আর ক্ষমতার বাস্তবতায় এ অবস্থান কতটা টিকে থাকে।

আ্পন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়