Apan Desh | আপন দেশ

ইরান কি মাথা নোয়াবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ০৮:৪৯, ২ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ০৮:৫৭, ২ মার্চ ২০২৬

ইরান কি মাথা নোয়াবে?

ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। ওই হামলায় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীপ্রধানসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাও প্রাণ হারিয়েছেন। এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ‘বড় ভুল’ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। 

খামেনির হত্যাকাণ্ড ইসলামি শাসনব্যবস্থার জন্য বড় আঘাত হলেও, এটি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব কিছু নয়। অতীতেও ইরানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হয়েছেন। ২০২০ সালে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারী কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সে ক্ষতি তেহরান অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই কাটিয়ে ওঠে। স্থলাভিষিক্তের প্রক্রিয়া সুশৃঙ্খল হওয়ায় ইসলামি শাসনব্যবস্থাও টিকে যায়।

ইরানের ইসলামি সরকারের নেতারা এখন আর নতি স্বীকার করবেন না। তারা প্রতিশোধের বিষয়ে আর কোনো ছাড় দেবেন না। এমন সতর্কবার্তাই উচ্চারণ করেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের উপদেষ্টা হারলান উলম্যান।

আটলান্টিক কাউন্সিলের উপদেষ্টা এবং কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কিলোওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আল জাজিরাকে বলেছেন, তিনি মনে করেন খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘বড় ভুল’ করেছে। উলম্যান বলেন, তিনি এখন একজন শহীদ এবং আলী লারিজানি যদি এখনো জীবিত থাকেন, তবে তিনি অত্যন্ত দক্ষ একজন ব্যক্তি। তিনি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং এটি (ইরান) একটি দুর্ধর্ষ শত্রু।

উলম্যানের মতে, জানুয়ারির শুরুতে মার্কিন বাহিনীর হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলা যেভাবে আলোচনায় বসেছিল, ইরানের নেতৃত্বের কাছ থেকে তেমনটি আশা করা ওয়াশিংটনের উচিত হবে না। উলম্যান বলেন, আমি তেমনটি মনে করি না।

উলম্যান আরও যোগ করেন, আমি নিশ্চিত নই যে ইরানের পুরো নেতৃত্বকে হত্যা করলেই তারা আলোচনার জন্য আরও নমনীয় হবে। আমার মনে হয়, আমরা লারিজানিকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছি এবং এটি ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, শীর্ষ নেতৃত্ব নির্মূল করার কৌশল (ডিক্যাপিটেশন) তখনই কার্যকর হয়, যখন আপনি সব নেতাকে কবজা করতে পারেন, কিন্তু আমার মনে হয় না যে আমরা সব নেতাকে ধরতে পেরেছি।

ইরানের সব থেকে বড় শক্তি সামরিক অস্ত্র নয়। বরং ভৌগোলিকভাবে পাওয়া একটি সমুদ্র পথ। যার নাম হরমুজ প্রণালি। ইরানের দক্ষিণ সীমান্ত ঘেঁষে এ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত জলপথ। মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এ জলপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্লেষকরা এটিকে পৃথিবীর রক্তনালি বলে অভিহিত করেন। এ প্রণালির আশপাশের সাতটি দ্বীপ ইরানের নিয়ন্ত্রণে, যা সে দেশের অনন্য ভূ-রাজনৈতিক শক্তি। ইতোমধ্যে ইরান এ জলপথ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে আতঙ্কিত পশ্চিমারা।

খামেনিও তার পরিণতি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। এজন্য নিজেই উত্তরসূরি বাছাই করে দিয়ে গেছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, খামেনি একাধারে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন। কেবল ইরানের শিয়াদের মধ্যেই নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের অনেক মুসলিমের ওপরও তার প্রভাব আছে। ফলে এ হত্যাকাণ্ড অনেককে প্রতিশোধ নিতে উৎসাহিত করবে। এ চেষ্টাটাই মধ্যপ্রাচ্য কিংবা এর বাইরে সহিংসতার জোয়ার সৃষ্টি করতে পারে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সংবিধান অনুযায়ী, ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা একটি বিশেষজ্ঞ পরিষদ সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ ও অপসারণের কাজ করে। এই পরিষদ এখন বৈঠক করে নিজেদের মধ্য থেকে অথবা বাইরে থেকে কাউকে অন্তর্বর্তী বা দীর্ঘমেয়াদী নেতা হিসেবে নিয়োগ দেবে। খামেনির সম্ভাব্য উত্তরসূরির মধ্যে আলোচনায় আছেন- বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মহসেনি-এজেই, খামেনির চিফ অব স্টাফ আলি আসগর হেজাজি এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি।  

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এতে আছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান মহসেনি-এজেই এবং সাংবিধানিক পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলি রেজা আরাফি। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস স্থায়ী নেতা নির্বাচন না করা পর্যন্ত এই পরিষদ রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।

আরও পড়ুন<<<>>>ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিন সেনা নিহত

১৯৭৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়। তখন গঠিত সরকারে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী। ১৯৮৯ সালে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ (ধর্মীয় নেতাদের একটি পর্ষদ) আলি খামেনিকে ওই পদে বসায়। সংবিধান অনুযায়ী ইরানে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার সর্বজনীন ভোটের মাধ্যমে গঠিত হলেও মূল ক্ষমতা থাকে ওই সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তির হাতে। তাই বলতে গেলে খামেনিই বর্তমান ইরানকে গড়ে তুলেছেন। কারণ পূর্বসূরি খোমেনি ক্ষমতা গ্রহণের পর বেঁচেছিলেন মাত্র ১০ বছর। তদুপরি, প্রায় পুরো সময়টাই তাকে ব্যয় করতে হয়েছে বিপ্লবের সহযোগী এবং বিরোধী বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর প্রতিরোধ দমনে। ফলে আলি খামেনির শূন্যস্থান পূরণ ইরানের ক্ষমতাসীনদের জন্য যতটুকু চ্যালেঞ্জ, ততধিক চ্যালেঞ্চ হলো ওই হত্যার যথোচিত জবাবদান।

এ কারণেই রোববার ইরানের আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং ইসরায়েলে হামলা চালাবে। তারা বলেছে, কিছুক্ষণের মধ্যে দখলকৃত অঞ্চল ও মার্কিন সন্ত্রাসী ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অভিযান শুরু হবে। এমনও হুমকি দেয়া হয়েছে, এ জবাব দিতে গিয়ে ইরান আগে কখনোই ব্যবহার করেনি এমন কিছু অস্ত্র ব্যবহার করবে, যা সবাইকে চমকে দেবে।

অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে ট্রাম্প তার মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে লিখেছেন, ইরান মাত্রই বলেছে যে, তারা আজ অত্যন্ত কঠোরভাবে আক্রমণ চালাবে, তারা এত জোরালো হামলা চালাবে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। তবে তাদের এমনটা না করাই ভালো। কারণ, যদি তারা এটা করে, তাহলে আমরা এমন শক্তি ব্যবহার করে তাদের আঘাত করব, যা আগে কখনও দেখা যায়নি!’

ইরান ও ট্রাম্পের এ পাল্টাপাল্টি হুমকির ফল কী হতে পারে?
কিছুদিন ধরে ট্রাম্প সরাসরি ইরানে শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের আহবান জানিয়ে আসছেন। গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ইরানে হঠাৎ করেই ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়ৈলের প্রভাব ছিল, তা প্রায় সব নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকই স্বীকার করেছেন। তবে খামেনির কঠোর পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত অনেক প্রাণ ঝরিয়ে সে বিক্ষোভ প্রশমিত হয়। তখন বিক্ষোভকারীদের অনেককে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ করতে দেখা যায়। এবারের হামলা শুরু করেও ইরানিদের উদ্দেশে উস্কানি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, আমার কাজ শেষ হলে আপনারাই আপনাদের সরকার দখল করুন। সেটি আপনাদেরই হবে। 

তবে খামেনির হত্যা মানেই ইরানে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন, এ কথা কোনো পর্যবেক্ষকই বিশ্বাস করছেন না। এখনও সেখানে খামেনির উত্তরসূরিরাই ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছেন। অনেকের মত, শেষ অবধি যদি ট্রাম্প তার মিশন সফল করতে পারেন, তাহলেও ইরান হতে পারে লিবিয়া ও সিরিয়ার নতুন সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে দেশ দুটোতে দির্ঘদিন পর সরকার পরিবর্তন হয়, এতে শুধু সরকারই ভেঙে পড়েনি, খোদ রাষ্ট্রও কয়েক খণ্ডে বিভক্ত হয়। কিন্তু ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি, সভ্যতা ও ঐতিহ্যের বিচারেও ওই অঞ্চলের অন্য কোনো রাষ্ট্রের এর সঙ্গে তুলনা হয় না। ফলে ইরান ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত হলে শুধু বিশ্ব তেল বাণিজ্যেই নেতিবাচক প্রভব পড়বে না, আঞ্চলিক শান্তিও হবে সুদূরপরাহত। এর প্রভাবে অন্য আরব রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে যেগুলোতে দির্ঘদিন ধরে রাজতন্ত্র চলছে, সেগুলোও অস্থিরতার মধ্যে পড়তে পারে। আর এ অস্থিরতার প্রভাব বিশ্বের অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পও কি শান্তি পাবেন? ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকা প্রথম) স্লোগান তুলে বিদেশে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন তিনিই বিদেশে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। ২০১৬ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে লড়াইয়ের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন একটি প্রমাণিত, সম্পূর্ণ ব্যর্থ নীতি। তিনি বলেছিলেন, বিদেশি সরকার উৎখাতে ছুটে বেড়ানো আমরা বন্ধ করব।

২০২৪ সালের নির্বাচনেও ট্রাম্প গর্ব করে বলেছিলেন, তার আমলে কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু হয়নি। এমনকি কয়েক মাস আগেও নোবেল শান্তি পুরস্কার দাবি করে তিনি বিশ্বে কয়টি যুদ্ধ বন্ধ করেছেন তার হিসেব দিতেন। ওই হিসাবে গত বছরের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধও রেখেছিলেন। আর এখন তিনি শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনে চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছেন। ইতোপূর্বে ভেনেজুয়েলায় যেভাবে রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে সেনা পাঠিয়ে নিউইয়র্কে ধরে এনেছেন, তা বিশ্বব্যাপী নিন্দা কুড়িয়েছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে তিনি খোদ তার ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় বন্ধুদেরই চটিয়েছেন। এখন উঠেপড়ে লেগেছেন ইরান দখলে।

এ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে তা এখনই বলা কঠিন। তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মঞ্চ তৈরি হয়ে গেছে। এটি এক-দুদিনের বিষয় নয়, সপ্তাহজুড়েও টিকতে পারে। কারণ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত সন্তুষ্ট হবে না। অন্যদিকে ইরানের শাসকরাও যেকোনো মূল্যে টিকে থাকতে বদ্ধপরিকর।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়