ছবি সংগৃহীত
রোববার (০৭ জুন) ছিল বাংলাদেশের বিচারঙ্গণের এক ঐতিহাসিক দিন। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আট বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয় এদিন। স্বাভাবিক ভাবেই এদিন আদালত চত্তরে ছিল প্রচণ্ড ভির। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা খবর সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। ঠিক সে সময় ঘটেছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড মামলার রায়ের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন এক নারী সাংবাদিক।
শিউলি বাহার নামের সে নারী কাজ করেন রাজনীতি ডটকম নামের একটি অনলাইন পোর্টালে। কোনো মাধ্যমে কাজ না করা সাংবাদিক নামধারী এক ব্যাক্তি তাকে প্রচণ্ড গতিতে কয়েক দফা ধাক্কা দেন। তবে অভিযুক্ত জুবায়ের আলম এ ঘটনাকেও খুব স্বাভাবিক হিসেবে বর্ণনা করছেন।
ঘটনাটি ঘটে রোববার দুপুরে। এ দিন রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা এ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি যখন আদালত ভবন থেকে বেরিয়ে আদালত চত্বরে রাখা প্রিজন ভ্যান পেরিয়ে মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই হেনস্তার শিকার হন এ নারী সাংবাদিক।
হেনস্তার শিকার শিউলি বাহার বলেন, রামিসার বাবার ফুটেজ সংগ্রহের জন্য আমি তার সঙ্গে সঙ্গে আদালত চত্বরের মূল ফটকের দিকে যাচ্ছিলাম। আরও অনেক সাংবাদিকই সেখানে ছিলেন। এ ধরনের ঘটনায় যেমন হয়, সাংবাদিক ছাড়াও সাধারণ মানুষের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। কিছুটা ধাক্কাধাক্কি ঘটেও। কিন্তু আজ যেটি ঘটেছে, ভিড়ের মধ্যে আমাকে বারবার ধাক্কা দিচ্ছিলেন একজন ব্যক্তি।
তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পরে খেয়ালি করি, তিনি আমার হাতে থাকা বুম ও স্ট্যান্ড বারবার সরিয়ে ফেলতে বলছেন। আমি না সরালে দেখি তিনি প্রথমে আমাকে একাধিকবার ধাক্কা দেন, এরপর আমার হাতে থাকা স্ট্যান্ডে সজোরে ধাক্কা দেন। তার ধাক্কায় আমি অনেকটা পিছিয়ে পড়ি। আবার বুমে অফিসের নাম লেখা আছে। সেটা দেখে তিনি বারবার বলছিলেন, রাজনীতি ডটকমকে সরাও। পরে ওই ব্যক্তি তুই-তোকারিও করেছেন বলে জানান শিউলি।
এ ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেসব ভিডিওতেও দেখা যায়, ঘটনাস্থলে শিউলি বাহার ছাড়া আর কোনো নারী সাংবাদিক ছিলেন না। সেখানে সাদা ট্রাউজার ও সাদা টি-শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি শিউলিকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার কাছ থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করছেন। তিনি শিউলির বুমে আঘাত করলে সেই স্ট্যান্ড থেকে শিউলির মোবাইল ফোনটিও নিচে পড়ে যায়।
শিউলি বলেন, আমার স্ট্যান্ড থেকে যে মোবাইল ফোনটি পড়ে গেছে, সেটিও আমি খেয়াল করিনি। আমাদের আরেক সাংবাদিক ভাইয়ের হাতে গিয়ে মোবাইলটি পড়েছে। তিনি হাতে ব্যথাও পেয়েছেন। তিনি আমাকে ফোনটি ফেরত দেন। সব মিলিয়ে ঘটনাটিতে শারীরিকভাবে তো বটেই, মানসিকভাবেও প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছি। তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়েছেন। একজন সাংবাদিক হয়ে আরেক সাংবাদিককে কেন এভাবে আঘাত করতে হবে, সেটি বুঝতে পারছি না।
আরও পড়ুন<<>>রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: সোহেল-স্বপ্না খাতুনের মৃত্যুদণ্ড
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিউলিকে হেনস্তাকারী তরুণের নাম জুবায়ের আলম। তিনি সোনালী নিউজের কর্মী হিসেবে পরিচিত। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সোনালী নিউজ কর্তৃপক্ষ রাতে রাজনীতি ডটকমকে জানিয়েছেন, বিভিন্ন অভিযোগে জুবায়েরকে মাস দুয়েক আগে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জুবায়ের আলম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, অ্যাসাইনমেন্ট গেলে এ রকম একটু ধাক্কাধাক্কি হয়ই। এগুলো এমন কিছু না। উনি রামিসার বাবার ফুটেজ আগে নিয়েছেন। আবার ওখানেও নিতে গেছেন। এ কারণে তাকে বলা হচ্ছিল অন্যদের একটু জায়গা দিতে। উনি না শোনার কারণে একটু সরিয়ে দেয়া হয়েছে। একে এমন বড় ঘটনা মনে করার কোনো কারণ নেই।
জুবায়ের নিজেও স্বীকার করে নেন, তিনি আর সোনালী নিউজে কাজ করছেন না। এ মুহূর্তে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত নন তিনি। তাহলে কেন তিনি সেখানে গিয়েছিলেন— সে প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে এ প্রতিবেদককে তার নিজের ফেসবুক পেজের লিংক পাঠান, যেখানে কিছু ভিডিও আপলোড ও শেয়ার করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে রাজনীতি ডটকমের বার্তা সম্পাদক তরিকুর রহমান সজীব বলেন, অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক একটি ঘটনা ঘটেছে আমাদের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টারের সঙ্গে। আমরা পুরো ঘটনাটি দেখেছি। বিশেষ করে একজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, সেটি পর্যালোচনা করে দেখছি।
বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহনাজ পারভীন এলিস রাজনীতি ডটকমকে বলেন, কর্মস্থলে নারী সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনা আমরা অনেক আগে থেকেই ঘটতে দেখছি। এসব ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। শিউলি বাহারের ঘটনাটি আরও বেশি দুর্ভাগ্যজনক এ কারণে যে এখানে তাকে হেনস্তার সঙ্গে যে ব্যক্তিটি জড়িত, তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও কোনো গণমাধ্যমে কাজ করেন না। মোজো বা ইউটিউবার যারা আছেন, তাদের কেউ কেউ যে কোনো ধরনের শৃঙ্খলা ধার ধারেন না, এ ঘটনায় সেটি স্পষ্ট। একজন নারী সংবাদ কর্মীর সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, সেটি সম্পর্কেও তাদের ন্যূনতম ধারণা নেই।
এ ধরনের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার তাগিদ দিয়ে শাহনাজ পারভীন বলেন, এ ধরনের ঘটনার জন্য আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। ফলে ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। তাহলে নারীদের হেনস্তা করতে যাওয়ার সময় আরও দুইবার ভাবতে হবে।
পুরুষ সহকর্মী যারা আছেন তাদের দায়বদ্ধতার দিকেও মনোযোগ আকর্ষণ করলেন বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের এ সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি বলেন, শিউলির পাশে পুরুষ সহকর্মী যারা ছিলেন, তাদের এগিয়ে গিয়ে ঘটনাটি প্রতিহত করা উচিত ছিল। আমাদের দেশে নারীদের যে এখনো দুর্বল মনে করা হয়, তাদের পদে পদে বাধা দেয়া হয়, সেটি তো পুরুষ সহকর্মীরা ভালো করেই জানেন। আমরাও কর্মস্থলে পুরুষ সহকর্মীদের এমন সমর্থন-সহায়তা পেয়েছি। শুধু নারী হিসেবে বিবেচনা না করলেও সহকর্মী হিসেবেই সবাইকে সবার পাশে দাঁড়ানো উচিত।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































