ছবি: আপন দেশ
রাজধানীর উত্তরায় তিন থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ‘কিডস হেলথ ক্যাম্প’ হয়েছে। দেশে শিশুদের পুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় চলমান উদ্বেগের মধ্যে এ ক্যাম্পেইং হচ্ছে।
শনিবার (০৮ আগস্ট) সকালে লার্নিস্টিকা ইসলামিক স্কুলে স্বপ্নপুরী কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে এবং হ্যাপি ভেঞ্চারস ও কাগজবাড়ির সহযোগিতায় এ হেলথ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।
শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আয়োজিত এ ক্যাম্পে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরামর্শ ও কাউন্সেলিং সেবা দেয়া হয়।
শিশু স্বাস্থ্যের বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে আয়োজকরা জানান, শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নয়, বরং নিয়মিত হেলথ চেকআপ, সঠিক নিউট্রিশন, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ারের ওপরও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ স্টান্টিং বা খর্বাকৃতিতে ভুগছে, ১২ দশমিক ৯ শতাংশ ওয়েস্টিং এবং ২৩ শতাংশ আন্ডারওয়েট অবস্থায় রয়েছে।
একই জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা পাওয়া গেছে।
এছাড়া ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ মিনিমাম অ্যাকসেপ্টেবল ডায়েট বা ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করতে পারছে।
শিশুদের পুষ্টি বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামীণ মায়েদের মধ্যে মাত্র ৩০ দশমিক ৩ শতাংশের ইনফ্যান্ট অ্যান্ড ইয়াং চাইল্ড ফিডিং বা শিশুদের বয়সভিত্তিক খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে বলে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন <<>> হাম উপসর্গে ৩ শিশুর মৃত্যু
গবেষণায় শিশুদের সঠিক খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করতে পুষ্টি কাউন্সেলিং ও কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
শিশুদের ওরাল হেলথ বা মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশে তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর মধ্যে আর্লি চাইল্ডহুড ক্যারিজ এবং ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুর দৃশ্যমান ডেন্টাল প্লাক পাওয়া গেছে।
গবেষণায় শিশুদের দাঁতের যত্ন ও সঠিক ব্রাশিং পদ্ধতি সম্পর্কে অভিভাবকদের জ্ঞানের ঘাটতিও চিহ্নিত করা হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় আয়োজিত ‘কিডস হেলথ ক্যাম্প’-এ অংশগ্রহণকারী শিশুদের জন্য সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চোখের পরীক্ষা, দাঁতের পরীক্ষা, নিউট্রিশন বিষয়ক পরামর্শ এবং স্বাস্থ্য কাউন্সেলিংসহ বিভিন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিভাবকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
একই সঙ্গে শিশুদের বয়সভিত্তিক পুষ্টি, শারীরিক বিকাশ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, মুখ ও দাঁতের যত্ন এবং নিয়মিত হেলথ চেকআপের গুরুত্ব সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করা হয়। কোনো শিশুর স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা ঝুঁকির লক্ষণ থাকলে প্রাথমিক পর্যায়ে তা শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা বা বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেয়ার বিষয়েও অভিভাবকদের নির্দেশনা দেয়া হয়।
আয়োজকরা জানান, শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সঠিক স্বাস্থ্যজ্ঞান না থাকার কারণে অনেক সমস্যা পরবর্তীতে জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অভিভাবক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা শিশুদের প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ার নিশ্চিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
তারা আরও জানান, একটি হেলথ ক্যাম্পকে শুধু একদিনের চিকিৎসাসেবা হিসেবে না দেখে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সচেতনতা নিয়ে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংযোগ তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখতে হবে।
একই সঙ্গে শিশুস্বাস্থ্য, প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ার এবং স্কুলভিত্তিক হেলথ প্রোগ্রামকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি, বেসরকারি ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পলিসি উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যেও কাজ করার কথা জানিয়েছে আয়োজকরা।
তাদের প্রত্যাশা, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের জন্য স্কুলভিত্তিক হেলথকেয়ার কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত, নিয়মিত ও টেকসই করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী অভিভাবকরা এ ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তারা বলেন, একই স্থানে শিশুদের সাধারণ স্বাস্থ্য, চোখ, দাঁত ও নিউট্রিশন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ অভিভাবকদের জন্য যেমন সহায়ক, তেমনি শিশুদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার ক্ষেত্রেও কার্যকর। ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজন আরও নিয়মিত ও বৃহৎ পরিসরে করা হবে বলে তারা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিশুদের সুস্থ, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এ ধরনের মানবিক ও জনস্বার্থমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। শিশুর অসুস্থতার চিকিৎসার পাশাপাশি অসুস্থতা প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং অভিভাবকদের স্বাস্থ্যজ্ঞান বৃদ্ধি করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
আপন দেশ/মিম/এসএস





































