ছবি: আপন দেশ
বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে হৃদরোগ এখন কেড়ে নিচ্ছে তরতাজা প্রাণ। একসময় হৃদরোগকে বয়স্কদের অসুখ মনে করা হলেও, বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও বাড়ছে এ রোগের ঝুঁকি।
নীরবে বিস্তার ঘটানো এই মরণব্যাধি কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন, বাড়াচ্ছে অকালমৃত্যুর শঙ্কা।
হৃদরোগের এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস।
সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা ও জীবনযাপনে পরিবর্তনই পারে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে। কিন্তু হৃদরোগের এই নীরব বিস্তার ঠেকাতে কতটা প্রস্তুত আমরা?
ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার। খেলতে খেলতেই হঠাৎ মাঠে উপুড় হয়ে পড়ে যান তিনি। বন্ধুরা ছুটে এসে বুকে চাপ দিতে থাকেন। পরে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত আর তাকে বাঁচানো যায়নি।
গত শুক্রবার এমনি এক মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছিল রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি মাঠে আসা আশরাফুল আফসারের বন্ধুদের।
মাত্র ৪৭ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে খেলতে খেলতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মেধাবী এই সরকারি কর্মকর্তা। এই ঘটনা বলে দিচ্ছে, বয়স যেন আর হৃদরোগের জন্য বাধা নয়।
একসময় যেখানে হৃদরোগকে মূলত বয়স্কদের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, সেখানে এখন কর্মক্ষম বয়সি মানুষ, এমনকি তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বায়ুদূষণসহ নানা ঝুঁকি হৃদ্-স্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ক্রমেই বাড়ছে হৃদয়ের হাহাকার। আর অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে দেশে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর ৭০ শতাংশের মধ্যে অর্ধেকের বেশি মৃত্যু হচ্ছে হৃদরোগের কারণে।
আর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিউটের এক গবেষণায় বলা হয়, বছরে দেশে হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন, যার ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এ মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অকালমৃত্যু।
‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে’র এক তথ্য অনুযায়ী ১৮-৩৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘হৃদরোগ অনেক সময় নীরবে এগিয়ে আসে, তাই কোনো ‘বিট’ যেন বাদ না যায়।’
দেশে হৃদরোগে মৃত্যুর বড় বোঝা : দেশে হৃদরোগের সামগ্রিক মৃত্যুচিত্রের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিকভাবে তুলনাযোগ্য তথ্যের বড় অংশ ২০২১ সালের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর দেশে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদ্রক্তনালিজনিত রোগে আনুমানিক ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে উচ্চ সিস্টোলিক রক্তচাপজনিত হৃদ্রোগের সঙ্গে বড় ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। এর কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্ট্রোক ও ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ দেশের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
আরও পড়ুন <> দেউলিয়ার পথে হাঁটছে ইফাদ গ্রুপ
ওই বছরে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে স্ট্রোকে মৃত্যুর হার ছিল ৮০ দশমিক ২ এবং ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে ৫৮ দশমিক ৫। নারী-পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই স্ট্রোক মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। পুরুষদের ক্ষেত্রে ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজও শীর্ষ মৃত্যুঝুঁকির কারণগুলোর একটি।
অর্থাৎ হৃদরোগের বোঝা শুধু হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জাতীয় মৃত্যুহার, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
ভাঙছে বয়সের সীমা : হৃদরোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো অকালমৃত্যু।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকসহ কার্ডিওভাসকুলার রোগের বড় একটি অংশ ৭০ বছরের আগেই ঘটে। অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে বছরে বিশ্বে অন্তত ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ৭০ বছর বয়সের আগেই মারা যান। এর অন্তত ৩৮ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী কার্ডিওভাসকুলার রোগ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অকালমৃত্যুর চিত্র উদ্বেগজনক। ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সের মধ্যে হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগে মৃত্যুর সম্মিলিত সম্ভাবনা ২০১৯ সালে ছিল প্রায় ১৯ দশমিক ২ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— তরুণ বয়সে হৃদরোগের ঝুঁঁকি বেড়েছে বলা হলেও, প্রতিটি তরুণের হৃদরোগ হচ্ছে এমন দাবি করা যায় না। বরং অল্প বয়স থেকেই ঝুঁকির কারণগুলো জমা হওয়া এবং সেগুলো দীর্ঘদিন শনাক্ত বা নিয়ন্ত্রণে না থাকাই পরবর্তী জীবনে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ : হৃদরোগের অন্যতম প্রধান নিয়ামক উচ্চ রক্তচাপ। কিন্তু অনেকেই দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত থাকলেও তা জানেন না। ফলে হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালিতে ক্ষতি চালাতে থাকে।
২০২৫ সালের বাংলাদেশ হাইপারটেনশন প্রোফাইলে দেখা যায়, দেশে হৃদ্রক্তনালিজনিত রোগে মৃত্যুর আনুমানিক ৫২ শতাংশের সঙ্গে উচ্চ সিস্টোলিক রক্তচাপের সম্পর্ক ছিল। একই প্রোফাইলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার মাত্র ১৬ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা এবং শনাক্ত হওয়ার পর নিয়মিত চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ— দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
বদলে যাচ্ছে জীবনযাপন : বিশেষজ্ঞদের কাছে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির বড় কারণগুলোর একটি হলো জীবনযাপনের পরিবর্তন।
দীর্ঘ সময় বসে থাকা, হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস কমে যাওয়া, অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, তামাক ব্যবহার এবং ওজন বেড়ে যাওয়া— সব মিলিয়ে হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়ছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের প্রধান আচরণগত ঝুঁকি।
এসবের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ রক্তশর্করা, অস্বাভাবিক রক্তের চর্বি ও স্থূলতার মতো বিপাকীয় ঝুঁকিও যুক্ত হয়। বায়ুদূষণও গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ঝুঁঁকি। বাংলাদেশে তামাক বিশেষভাবে বড় উদ্বেগের বিষয়।
এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর তামাক ব্যবহারের কারণে প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এবং এটি হৃদরোগ, ক্যান্সার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের বড় ঝুঁকিকারক।
আরও পড়ুন <> বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়ল
লবণও হয়ে উঠছে বিপদের কারণ : দেশের খাদ্যাভ্যাসেও হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, দেশে প্রতিদিন বাড়ছে লবণ গ্রহণের হার। ২৫ বছর ও তার বেশি বয়সিদের গড় লবণ গ্রহণ ছিল দিনে প্রায় ৯ গ্রাম— পুরুষদের ক্ষেত্রে ৯ গ্রাম এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৮ গ্রাম। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। আর দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
শুধু হাসপাতাল দিয়ে সামলানো সম্ভব নয় : হৃদরোগের চিকিৎসায় উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ চিকিৎসক ও হাসপাতালের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হৃদরোগের মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রধান ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করা গেলে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।
এর অর্থ হলো— হৃদরোগের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হওয়া উচিত হাসপাতালের আইসিইউতে নয়; বরং বাড়ি, স্কুল, কর্মক্ষেত্র, খাদ্যব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেই।
চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন আগাম শনাক্তকরণ : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই হৃদ্রোগের লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই ঝুঁকি তৈরি হয়। রক্তনালির অন্তর্নিহিত রোগ অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকই প্রথম প্রকাশ হতে পারে।
এ কারণে নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, ওজন ও অন্যান্য ঝুঁকি মূল্যায়নের গুরুত্ব রয়েছে। ধূমপান বন্ধ করা, খাবারে লবণ কমানো, পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড, ফল ও সবজি বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
জনস্বাস্থ্যে বড় অর্থনৈতিক চাপ : হৃদরোগ শুধু মৃত্যুর কারণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার কারণে পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপরও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। দেশে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার বড় অংশ রোগীকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে আসে। ফলে একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই নয়, তার কর্মক্ষমতা হারানো এবং পরিবারের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। তবে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ খুবই কম।
এই পরিস্থিতিতে বর্ধিত স্বাস্থ্য বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হলে হৃদরোগজনিত অকালমৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) ও প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা) এক ওয়েবিনারে দাবি করেছে, বিশ্বে প্রতিবছর হৃদরোগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করেন, যার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। বাংলাদেশেও হৃদরোগজনিত মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশই হৃদরোগের কারণে ঘটে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মারুফ হক খান বলেন, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের ধারাবাহিক পরিচর্যার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয় এবং স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশ এখনো চিকিৎসামুখী।
বিশ্ব হার্ট দিবসের বার্তা তাই কেবল হৃদরোগের চিকিৎসা নয়— ঝুঁকি কমানো, দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান।
কারণ হৃদরোগ অনেক সময় হঠাৎ করে প্রাণ কেড়ে নেয় বলে মনে হলেও তার ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি হয় দীর্ঘদিন ধরে।
উচ্চ রক্তচাপ, তামাক, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও বায়ুদূষণের মতো কারণগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হৃদরোগের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য।
তাই বিশ্ব হার্ট দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর কতজনকে বাঁচানো যাবে, তা নয়। বরং হার্ট অ্যাটাকের আগেই কতজনের ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা যাবে।
প্রয়োজন পরিমিত জীবন-যাপন : বিশ্ববাসীকে হৃদযন্ত্রসহ, সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা ও সুস্থ জীবনযাপন শেখানোর উদ্দেশ্যে ২০০০ সালে বিশ্ব হৃৎযন্ত্র দিবস পালন শুরু হয়।
২০১২ সালে বিশ্বনেতারা ঠিক করেন, তারা ২০২৫ সালের মধ্যে হৃদরোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধি কমাতে ভূমিকা রাখবেন। হার্টের রোগের লক্ষণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, বুকে চাপ চাপ ব্যথা, বুকের এক পাশে বা পুরো বুকজুড়ে অসহ্য ব্যথা।
বেশির ভাগ সময় বুকে ব্যথার তীব্রতার জন্য শরীরের অন্য অংশে ব্যথা টের পাওয়া যায় না, অনেক সময় ব্যথা শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে চলে যেতে পারে যেমন— বুক থেকে হাতে ব্যথা হতে পারে।
সাধারণত বাঁ হাতে ব্যথা হলেও দুই হাতেই ব্যথা হতে পারে, মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম করা ও বমি ভাব, ঘাম হওয়া, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, বুক ধড়ফড় করা বা বিনা কারণে অস্থির লাগা, সর্দি বা কাশি হওয়া।
হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতে করণীয় হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে। যেসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ আছে, সেসব খাবার খেতে হবে বেশি করে। এসব খাবারের কারণে শরীরে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, যা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। শিম, মটরশুঁটি, ডালজাতীয় শস্য এবং ফলমূল, আলু, মুলা, গাজর, আটা ও ব্রাউন রাইসে প্রচুর আঁশ রয়েছে। স্যাচুরেটেড ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট-বাঁধা চর্বিযুক্ত খাবার কম খেতে হবে। এতে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ার ভয় থাকবে না। ফলে কমবে হৃদরোগের ঝুঁকি। চিজ, দই, লাল মাংস, মাখন, কেক, বিস্কুট ও নারকেল তেলে প্রচুর পরিমাণ স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। তাই এগুলো খাওয়া নিয়ন্ত্রণে করতে হবে।
স্যাচুরেটেড ফ্যাট নেই যেসব খাবারে— তার মধ্যে রয়েছে তেলসমৃদ্ধ মাছ, বাদাম ও বীজ। আর রান্নায় জলপাই বা সূর্যমুখির তেল ব্যবহারে উপকার পাবেন। চিকিৎসকরা লবণ ও চিনি খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
লবণ বেশি খেলে রক্তচাপ বেড়ে যায়, যার ফলে বাড়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি। একজন ব্যক্তি দিনে ছয় গ্রাম বা এক চা চামচ লবণ খেতে পারবেন। সেই সঙ্গে কমাতে হবে চিনি বা মিষ্টি খাওয়ার পরিমাণও।
আপন দেশ/এমটিআই





































